অন্ধকারে করোনার গতিবিধি

করোনাভাইরাসে গতিবিধি সম্পর্কে দেশের জনস্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা অন্ধকারে। এখনও নির্ধারণ হয়নি প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের রি-প্রডাকশন নম্বর বা আরনট (R0)। ফলে বুঝা যাচ্ছে না স্থানীয়ভাবে কোভিড-১৯ মহামারী কোন পর্যায়ে আছে। এর সংক্রমণের হার কতটা তীব্র হতে পারে। কি হারে ছড়াবে, কত প্রাণহানি হবে এবং কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে কিছুই বলা যাচ্ছে না। মহামারী নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আরনট-এর মান নিয়ন্ত্রণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই মান নির্ণয় করতে না পারলে দেশে কোন এলাকা কখন লকডাউন করতে হবে, কখন শিথিল করতে হবে, কখন দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে আসবে তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এখন যেটা হচ্ছে সেটা অনুমান এবং অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থার খুব মিল নেই। ইউরোপ আমেরিকার কিছু দেশে আরনটের রোগতাত্ত্বিক মান বের করেছে।

দেখা গেছে, ওইসব দেশে গড়ে রি-প্রডাকশন নম্বর বা আরনটের মান দুই এর চেয়ে বেশি এবং তিন এর চেয়ে কম। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক গড় রি-প্রডাকশন নম্বরের মান দুই দশমিক ৫। এটি ধরেও বাংলাদেশে গবেষণা করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে যেদিন প্রথম করোনাক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছে (৮ মার্চ) সেদিনই আইইডিসিআরের উচিত ছিল প্রথম রোগীকে ঘিরে নির্দিষ্ট গবেষণার পরিকল্পনা তৈরি করা। সে অনুযায়ী কোভিড-১৯ এর আরনট-এর মান নির্ণয় করা। তাহলে আমরা এতদিনে দেশের কোভিড-১৯ এর গতিবিধি বুঝতে পারতাম। জানতে পারতাম কখন কোন পর্যায়ে সংক্রমণের হার পৌঁছাবে। অর্থাৎ কখন বাড়বে, কখন পিকে উঠবে, কখন নামতে শুরু করবে এবং কোন পর্যায়ে গিয়ে এটি নিয়ন্ত্রণে আসবে তা নির্ধারণ করা সহজ হতো। এ সংক্রান্ত কাজ শুরুও হয়েছিল। কিন্তু তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সমস্যা হওয়ায় এর কাজ এখনও শেষ হয়নি বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খয়ের মোহাম্মদ শামছুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, দেশে করোনা রোগী শনাক্তের পর এই ভাইরাসের আরনট (জ০)-এর মান নির্ণয় করতে পারলে ভালো হতো। তাহলে আমরা বুঝতে পারতাম আমাদের দেশের জন্য কখন লকডাউন করা দরকার, কখন লকডাউন শিথিল হবে অথবা কখন মহামারী নিয়ন্ত্রণে আসবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, রি-প্রডাকশন নম্বর বা আরনট হল, কোন সংক্রামক রোগ কত দিনের মধ্যে মহামারী আকারে ছড়াতে পারে। কতদিনে একজন থেকে আরেকজনে নতুন রোগ তৈরি করতে পারে তার গতিবিধি নির্ধারণ করে। রি-প্রডাকশন নম্বর থেকে বোঝা যাবে কোন নির্দিষ্ট এলাকায় কোন নির্দিষ্ট সময়ে করোনাভাইরাসে প্রতিদিন কতজন রোগী বাড়বে বা কমবে। এই নম্বর নির্ণয় করা থাকলে নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে আগে কমতে থাকলে মহামারী কত তাড়াতাড়ি নিয়ন্ত্রণে আসবে তা জানা যায়। একইভাবে যদি নির্দিষ্ট সময়ে না কমে আরও বাড়তে থাকে তবে মহামারী কত বাড়বে বা সংক্রমণের হার কত উপরে উঠবে তা বোঝা সহজ হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত রি-প্রডাকশন নম্বরের মান ধরা হয় ১। যদি মান ১ এর অধিক হয় তাহলে বুঝতে হবে সংক্রমণের হার আগের দিনের চেয়ে পরের দিন চক্রবৃদ্ধি হারে বা ক্ষেত্রবিশেষ দ্বিগুণ বা তারও বেশি হারে বাড়তে পারে। আর যদি রি-প্রডাকশন নম্বরের মান ১ এর নিচে হয় তাহলে বোঝা যাবে এটি কত দ্রুত কমে আসবে। এর মান যদি দশমিক ৫ এর নিচে থাকে তাহলে বোঝা যাবে মহামারী আর বাড়বে না।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত যতগুলো সংক্রমক রোগের রি-প্রডাকশন নম্বরের ভ্যালু বের করেছেন তার মধ্যে মিজেল ভাইরাসের বা হামের (R0) মান সবচেয়ে বেশি ১৫ শতাংশ। এজন্য হামকে পৃথিবীর সর্বাধিক সংক্রামক ভাইরাস বা রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক গড় রি-প্রডাকশন নম্বরের মান দুই দশমিক ৫।

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর ইউরোপ আমেরিকার কিছু দেশে আরনটের রোগতাত্ত্বিক মান বের করেছে। যেখানে গড়ে দেখা গেছে দেশগুলোতে এর মান দুই-এর চেয়ে বেশি এবং তিন-এর চেয়ে কম। অর্থাৎ কোনো দেশে মান দুই-এর সামান্য বেশি এবং কোনো দেশে তিন-এর সামান্য কম। ইতালি, আমেরিকা, স্পেন বা ফ্রান্সের দিকে তাকালে এর সত্যতা পাওয়া যায়। কারণ এসব দেশে রোগী আক্রান্তের সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় কখনও চক্রবৃদ্ধি হারে কখনও দ্বিগুণ হারে বেড়েছে।

এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং বর্তমান কনসালটেন্ট ডা. মুশতাক হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আইইডিসিআর প্রথম থেকেই তথ্য সংগ্রহ করছিল। তবে এপ্রিল থেকে রোগীর নমুনা সংগ্রহের দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদফতর গ্রহণ করার পর থেকে তথ্যপ্রাপ্তিতে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে যে তথ্য সরসরি পাওয়া যেত এখন তা পেতে একটু সমস্যা হচ্ছে। তবে দেশের স্বার্থে আমাদের রি-প্রডাকশন নম্বরের মান নির্ধারণ করতে হবে। যত দ্রুত রি-প্রডাকশন নম্বরের মান নির্ধারণ করা যাবে তত দ্রুত আমরা বুঝতে পারব আমাদের দেশের করোনাভাইরাসের প্রকৃত পরিস্থিতি।

আরও পড়ুন