আসুন, আশায় বুক বাঁধি

১৯৫০ সাল, বঙ্গবন্ধু তদানীন্তন সরকারের বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা দাবির সমর্থনের অপরাধে কারারুদ্ধ হয়ে খুলনার জেলখানায়। সেখানকার পুলিশ সুপার একদিন বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ”শেখ সাহেব, আপনি কেন জেল খাটছেন?” বঙ্গবন্ধু উত্তর দিলেন, “ক্ষমতা দখল করার জন্য।” জেল সুপার আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘ক্ষমতা দখল করে কী করবেন।” এর উত্তর ছিল, “যদি পারি দেশের জনগণের জন্য কিছু করব।”

আজকে বাংলাদেশের জনগণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যখন এই কাজটিই করছেন অর্থাৎ, “যদি পারি দেশের জনগণের জন্য কিছু করব”। সেই সময়েই এই কোভিড-১৯ এর বিশ্ব মন্দার মধ্যেও, দেশটাকে অশান্ত করার জন্য কিছু দুষ্টুচক্র নানা সমাজবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়ে দেশের মধ্যে একটি আস্থার সংকট সৃষ্টির প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। প্রায় ১৮ কোটি লোকের এই দেশে যখনই কোন অধম, কোন সামাজিক অথবা এলাকাভিত্তিক কোন অন্যায় সাধন করে তার পুরো দোষটা রাষ্ট্রপ্রধান-এর উপর দিয়ে সরকারকে অকার্যকর প্রমাণ করার জন্য আদাজল খেয়ে এরা লেগে যায়।

স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স ৫০ বছর ছঁইছুঁই। এই বয়সকালের মধ্যে ২৯টি বছর দেশের শাসনতন্ত্রকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে দেশটিকে যথেচ্ছাচারভাবে লুটপাট চালিয়ে গেছে, পাকিস্তানের অনুদাস ও বিএনপি-জামাত, জাতীয় পার্টি ও মোশতাকের ডেমোক্রেটিক ফোরাম এর রাজনৈতিক নামধারীরা। পাকিস্তান থেকে যেদিন বেরিয়ে এসেছিলাম সেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে দেশটি একটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত ভূখণ্ড ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। সেদিন অনেকেই ভবিষ্যৎবানী করছিলো, এদেশকে বাঁচানো যাবে না, কমপক্ষে তখনকার সাড়ে সাত কোটি লোকের ৩ কোটি লোক অর্ধাহার-অনাহারে মৃত্যুবরণ করবে।

তখন আমাদের না ছিলো যানবাহন, না ছিলো রাস্তাঘাট, না ছিল চিকিৎসার ব্যবস্থা, রেলসংযোগ, সেতু, কালভার্ট এমনকি হার্ডিঞ্জ সেতুসহ প্রত্যেকটি সেতুকে, যুদ্ধবন্দী হওয়ার আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছিল। দেশের মানুষ একাত্তর সালের সেই বছরে ফসল ফলাতে পারেনি, কারণ সারাদেশে যুদ্ধের ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা চলছিল। ফলে দেশ যেদিন স্বাধীন হলো, সেদিন প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের তিন ভাগের এক ভাগও আমাদের মজুদ ছিলো না।

সামরিক বাহিনীর আত্মসমর্পণের আগের দিনগুলোতে অর্থাৎ যখন অক্টোবর, নভেম্বর এবং ডিসেম্বর একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় আসন্ন, পাকিস্তানিরা যখন বুঝতে পারল যে, এই দেশকে আর দখলে রাখা যাবে না, তখন তারা জাহাজ ও উড়োজাহাজ ভর্তি করে দেশের যতো সম্পদ পাকিস্তানে নিয়ে যেতে পারা সম্ভব ছিল তা সবই নিয়ে গেল। যেসব খাদ্য শস্য এবং অন্যান্য সামগ্রী নিতে পারলো না, সেগুলো জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিলো। তারা এই নয় মাসে তিরিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে।

লক্ষ, লক্ষ বাড়ি ঘর ধ্বংস করেছে। হিন্দু, মুসলমান, উপজাতি নির্বিশেষে সকল মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে, দেশ থেকে বিতাড়িত করে ভারতবর্ষে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের একমাত্র বড় শহর ঢাকাকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে, চট্টগ্রাম বন্দরকে আর যখন ব্যবহার করতে পারছিল না, তখন মাইন পুতে পুতে এই সমুদ্রবন্দরটিকে অকার্যকর করে রেখে গিয়েছিল। পরবর্তীকালে রাশিয়ার সাহায্য নিয়ে প্রায় ২ বছর চেষ্টা করে এই সমুদ্র বন্দরটিকে ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব হয়েছিলো।

 

তখন দেশের কোন বৈদেশিক মুদ্রা ছিলো না, যা ব্যবহার করে বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে মানুষের দৈনন্দিন অভাব পূরণ করা যায়। ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, সুইজারল্যান্ড, সুইডেনসহ কিছু বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের জনগণ ও সরকার বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে, সোনার বার এবং হীরা উপহার হিসেবে দিয়েছিল ও বিনা সিকিউরিটিতে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল সরবরাহ করে আমাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কেউ কেউ আমাদের টাকা, যার তখনও কোন আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় নাই সেই টাকাকেও ডিপোজিট রেখে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ কছিলো।

একদিকে যারাই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিচ্ছিলো, তাদের সাথে পাকিস্তান সম্পর্ক ছিন্ন করছিলো, অন্যদিকে পাকিস্তান, চীন, সৌদি আরব ও আমেরিকার নিক্সন সরকার জন্মলগ্ন থেকেই বাংলাদেশকে হত্যা করার প্রচেষ্টা হিসাবে সবরকমের সাহায্য বন্ধ করার জন্য তদবির করে যাচ্ছিলো সারা পৃথিবীব্যাপী।

যদিও আমেরিকার জনগণ ও জাতিসংঘ, আমাদের জীবন বাঁচানোর সংগ্রামকে সাহায্য করছিলো ও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলো। এই অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্য থেকে বঙ্গবন্ধুর সুষ্ঠু পরিকল্পনার ফলে ও জনগণের সার্বিক সমর্থনের মাধ্যমে, এক কোটি দেশত্যাগী মানুষকে ফিরিয়ে এনে, দুই কোটি আশ্রয়হীন মানুষকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে স্বাধীন বাংলাদেশ তার যাত্রা শুরু করে।

বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে আমরা বিশ্বের প্রায় সকল দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হই। সোভিয়েত ই্উনিয়নের সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আমাদের স্কুল, কলেজের ছাত্রদের একটি বিরাট অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নে পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হই। দেশের স্কুল, কলেজ এমনকি প্রাইমারী স্কুল পাকিস্তানী দস্যুরা ধ্বংস করে রেখে যায়।

স্বাধীনতার পরে সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমে সমস্ত স্কুল-কলেজগুলো পুনঃনির্মাণ করে শিক্ষা ও পাঠদান করা সম্ভব হয়। কৃষিক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা দানের জন্য বিশ্বব্যাংকের সাথে বোঝাপড়া যখন হলো না, তারপরও দেশের কৃষকদের অর্থ সাহায্য দিয়ে ফসলের উৎপাদন অনেকগুণ বৃদ্ধি করার ফলে, খাদ্যশস্যের বিশেষ করে ধান-চালের অভাব অনেকাংশে পূরণ করা হয়। যা ছিলো আমাদের কাছে সেই সময় স্বপ্নাতীত।

বঙ্গবন্ধুর যোগ্য নেতৃত্বে দেশে চালের দাম পাঁচ টাকা সেরে নেমে এসেছিলো, প্রবৃদ্ধি ৮.৫% এ উন্নীত হয়েছিল। এ অবস্থার মধ্যেই ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে পাকিস্তানের অনুচরেরা আমেরিকার প্ররোচণায় বাংলাদেশকে অকার্যকর করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়।

২৯ বছর বহু ত্যাগ, লক্ষ, লক্ষ জীবন দান, অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেই পাকিস্তানি দস্যু, অনুদাসদের বিতাড়িত করে জনগণের সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। আজও নানাছলে এবং কৌশলে এই স্বাধীন দেশটিকে অকার্যকর করার প্রচেষ্টায় একশ্রেনির মানুষ লিপ্ত আছে। তারা প্রতিদিন নতুন, নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে দেশকে অশান্ত দেখানোর চেষ্টা করছে।

তাদের সন্ত্রাস, খুন, জ্বালাও-পোড়াও, এমনকি ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষে মানুষে হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানোর স্থানীয় ও সার্বিক প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু “এদের অভ্যাস যায় না মরলে” তাই তারা আজও প্রত্যেকটি ঘটনাকে তিল থেকে তাল করে একটি অশান্ত দেশ হিসাবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে পরিচয় করানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টায় লিপ্ত আছে।

যেভাবে আমরা ধর্মীয় মৌলবাদকে, সন্ত্রাসকে, জ্বালাও-পোড়াওকে ও ধর্মে ধর্মে বিভেদ সৃষ্টিকারীদেরকে সম্মিলিতভাবে পরাভূত করেছি একইভাবে আমাদের মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে আমাদের সন্তান-সন্ততির নিশ্চিত উন্নত ভবিষ্যতের প্রত্যাশাকে বাস্তবায়ন করতে কাজ করে যেতে হবে।

এদেশের মানুষ হাজার, হাজার বছর ধরে যে বঞ্চনা এবং লাঞ্চনার শিকার হয়েছে। এ বঞ্চনা এবং লাঞ্চনা থেকে মুক্তি দিতে আজকে আমাদের মাঝে যে সার্বিক ঐক্য জননেত্রী শেখ হাসিনা নিয়ে এসেছেন তাকে দৃঢ় করতে হবে, তাহলেই আমাদের জীবন শান্তিময় হবে, সুখের দিনের আশায় ভবিষ্যৎ বংশধরকে আমরা অনুপ্রাণিত করতে পারব ও বিশ্ব সমাজে সম্মানের আসন পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে। এই হোক আজকের দিনে আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক : সভাপতি, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ

 

আরও পড়ুন