ইউপি নির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত সাতকানিয়া

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের (ইউপি) শেষ বা ৭ম ধাপের নির্বাচন ঘিরে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় উত্তপ্ত হয়ে উঠছে নির্বাচনী মাঠ। প্রতিদিনই কোন না কোন সময় প্রতিটি ইউনিয়নে নৌকা-বিদ্রোহী-স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ লেগেই আছে। গোলাগুলি, হামলা, মারধর, হুমকি, পক্ষে-বিপক্ষে সংবাদ সম্মেলন, স্ব স্ব প্রার্থীদের নির্বাচনী অফিস ভাংচুরসহ বিভিন্ন পোস্টার-ব্যানার-ফেন্টুন ছেড়ার মতো অভিযোগ পরস্পর প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে চলছে। এসব বিষয়ে নির্বাচনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বরাবরে অভিযোগও দেয়া হয়েছে। তাছাড়া দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় উপজেলা থেকে দলীয় নেতাদের দল থেকে বহিষ্কারের সুপারিশও করা হয়েছে। সবমিলে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা মাঠে থাকলেও আতংকে ও নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন সাধারণ ভোটাররা। এসব দেখে অনেকেই নির্বাচনের দিন আদৌ ভোট দিতে যেতে পারবেন কিনা, নাকি ভোট রাতে আন্ধকারে হবে কিনা সেই মন্তব্য করছেন। তবে যোগ্য, ত্যাগী এবং শিক্ষিত চেয়ারম্যান প্রার্থীদেরই নির্বাচিত করার আশা করছেন একাধিক ভোটার।

চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিস, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারী ৭ম ধাপ তথা শেষ ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চট্টগ্রামে শুধুমাত্র একটি উপজেলা সাতকানিয়া উপজেলার ১৭টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। মনোনয়নপত্র জমা, প্রতীক বরাদ্দ ও প্রচার প্রচারণা শুরুর পর থেকেই প্রতিটি ইউপিতে চলছে নানা সহিংসতা, গোলাগুলি, হামলাসহ নানা ঘটনা। নৌকা-বিদ্রোহী-স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামীলীগের হওয়ায় জেলা-উপজেলার শীর্ষ ও স্থানীয় তৃনমূলের নেতা-কর্মীরা নানা কৌশলে নীরবতার পাশাপাশি দুটানায় রয়েছেন। এতে দলীয় প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করার জন্য দলীয় নির্দেশনা থাকলেও ত্যাগী-যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে ভোট দেয়ার কথা ভাবছেন দলীয় কর্মী ও সংশ্লিষ্টরা।

দলীয় নৌকা প্রতীক নিয়ে অংশ নেয়া নলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রার্থী লেয়াকত আলী বলেন, প্রতিপক্ষ প্রার্থী মিজানুর রহমানের সমর্থকরা আমার উপর হামলার বিষয়ে অভিযোগের তদন্ত চলছে। তাদের ভয়ে নিয়মিত আতংকের মধ্যে থাকি। নানাভাবে হুমকি দিয়েই আসছে আমাকে। পোস্টার ছেড়া থেকে শুরু করে সব কিছুই করছেন। তবে চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে তসলিমা আবছার কোন পোস্টার বা প্রচারণায় নেই। তাছাড়া আমার ইউনিয়নসহ উপজেলার সকল বিদ্রোহী প্রার্থীদেরও ইতিমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এতে সাধারণ ভোটাররা এলাকার আগামীর উন্নয়ন, যোগ্যতা বিবেচনা করেই যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দিবেন বলে আশা করছেন বলে জানান তিনি।

 

একই ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক নিয়ে আগের দু’বারের চেয়ারম্যান ও সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হওয়া চেয়ারম্যান নুরুল আবছারের স্ত্রী দক্ষিণ জেলা যুবলীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক তসলিমা আকতার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় আমাকে আগেরবার দল থেকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য। এবার মনোনয়ন ফরম দিলেও আমার পরিবারের সকলেই অসুস্থতার কারণে মানসিক টেনশনে রয়েছি। ফলে প্রত্যাহারের চেষ্টা করেও সময় না থাকায় করতে পারিনি। কোন পোস্টারও করিনি আমি। তবে সাধারণ মানুষের সেবায় আগেও ছিলাম, এখনও কাজ করে যাবেন বলে জানান তিনি।

সাতকানিয়ার থানার ওসি মো. আব্দুল জলিল বলেন, উপজেলা নির্বাচন অফিসে অভিযোগের পাশাপাশি থানায়ও অভিযোগ আসছে। এতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও কাজ চলছে। তাছাড়া ভোটাররা সুষ্টুভাবে ভোট দিতে পারবেন, এখানে কেউই বিশৃংখলা করতে চাইলে কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, খাগরিয়ার গুলিবর্ষণের ঘটনা শুনেছি এবং বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত দলের পক্ষ থেকে আমরা বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলাম। অনুরোধ করার পরও প্রত্যাহার করেননি। তাই কেন্দ্রীয় ঘোষণা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ১৮ জন দলের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থীকে বহিষ্কার করার সুপারিশ করা হয়েছে। দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তে তাদের সাময়িক বহিষ্কার করে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের জন্য কেন্দ্রে সুপারিশ পাঠানো হচ্ছে। এছাড়াও নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে যে সকল নেতা কাজ করছেন তাদের বিরুদ্ধেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

সংঘর্ষ, গোলাগুলি, আহত এবং সংবাদ সম্মেলনঃ

প্রতিদিনই ঘটছে সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং হুমকি। সেই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার উপজেলার খাগরিয়া ইউপির স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রার্থী জসিম উদ্দিনের প্রচারণায় হামলা হয়। এতে ৭ জন গুলিবিদ্ধ এবং শিশুসহ আহত হয়েছেন ১৫ জন। আহতরা হলেন- মো. শাহ আলম (৫৫), আহমদ  হোসেন (৫০), মো. মারুফ (১০), মো. মুহিবুল (২০), ইসলাম খাতুন (৬০), মো. রফিক (৫২), মো. ফারুক (৬১), মুন্সি মিয়া (৫৫),আবছার উদ্দীন (৪৫), মো. সায়েদ (২১), আবু সুফিয়ান (২১), মনির আহমদ (৬২), জাফর আহমদ (৫৫)। বাকি দু’জনের নাম পরিচয় পাওয়া যায়নি।

স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, আমাকে কোন ধরনের প্রচারণা করতে দিচ্ছে না নৌকার চেয়ারম্যান প্রার্থী আকতার হোসেন। আমি সকালে যখন নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করি তখন চেয়ারম্যান প্রার্থী আকতার হোসেনের নেতৃত্বে বহিরাগত কিছু সন্ত্রাসী আমার প্রচারণায় গুলি চালায়। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে চার পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদেরকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমি বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করেছি।

হামলা বিষয়টি অস্বীকার করে নৌকার চেয়ারম্যান প্রার্থী আকতার হোসেন বলেন, জসিম উদ্দিন উল্টো আমার বাড়িতে হামলা করার শপথবাক্য পাঠ করিয়েছে এলাকাবাসীকে। সে আজকে খাগরিয়া ভোরবাজারে অফিস উদ্বোধন করতে আসবে বলে এলাকার লোকজন এবং বাহিরাগত সন্ত্রাসী এনে আমার বাড়িতে ৬০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। আমি পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছি।

সোনাকানিয়া ইউপি নির্বাচনে ‘বিদ্রোহী’ চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. সেলিম উদ্দিনের প্রচারণার গাড়িবহরে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী জসিম উদ্দিনের সমর্থকেরা হামলা চালিয়েছেন বলে সাতকানিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এখানে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী জসিম উদ্দিন বলেন, সেলিম উদ্দিনের গাড়িবহরে তাঁর কোনো সমর্থক হামলা চালায়নি। বরং  সেলিম উদ্দিনের সমর্থকেরা তাঁর সমর্থকদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

 

আরও পড়ুন