চলে গেলেন আব্দুস সাত্তার খান

এরশাদবিরোধী গণআন্দোলনের, বিশেষত ছাত্র গণআন্দোলনের অন্যতম নেতা, তখন বাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুস সাত্তার খান কানাডার সাস্কাচুয়ান প্রদেশের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। খবরটা শোনার পর থেকেই মনটা ভারি হয়ে আছে।

সাত্তার খান ব্যক্তিগতভাবে আমার এবং আমার সাথে সেই সময়ে যারা রাজনীতিতে ছিলেন তাদের সবার দীর্ঘদিনের সাথী। এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন প্রায় তুঙ্গে তখন ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে একটি মিছিলের উপর ফুলবাড়িয়াতে এরশাদ সাহেবের লোকেরা ট্রাক তুলে দেয় যাতে সেলিম-দেলোয়ারদের মৃত্যু হয়। ঠিক সেই মুহূর্তে কতজন মারা গেছেন তা স্পষ্ট ছিলো না। প্রাণভয়ে অনেকেই দৌড়ে পালান আর যারা মোটেই চলাফেরা করতে পারেননি- ট্রাক যাদেরকে গুড়িয়ে দিয়েছে অথবা মেরে ফেলেছে- তারা রাস্তার পাশে লাশ হয়ে কিংবা লাশের মতো শুয়ে ছিলেন। পুলিশ তাদেরকে চ্যাঙতোলা করে হাত-পা ধরে যেরকম করে দোলাতে দোলাতে ধাক্কা দিয়ে ট্রাকের উপর ছুড়ে ফেলে দেন। তারপরে সিপাহীরা উঠে পড়ে এবং তারা সেই ট্রাক চালিয়ে তাদের গন্তব্যে যায়। ট্রাকের মধ্যে পেতে রাখা বেঞ্চে বসা এক সিপাহী হঠাৎ করে সাত্তার খানকে দেখে চিনতে পারেন, কারণ সাত্তার খান তারই এলাকার মানুষ ছিলেন, এবং তিনি খেয়াল করেন সাত্তার খানের নিঃশ্বাস উঠছে-পড়ছে। তিনি খুবই কাকুতিমিনতি করে ঐ ট্রাকের ড্রাইভারকে এবং তার সঙ্গী-সাথিদের বলেন, ওকে আমি চিনি, উনি আমার এলাকার বড় ভাই, খুবই সম্মান করি, খুবই ভালো মানুষ, লোকটা এখনো বেঁচে আছে, তাকে লাশ মনে করে ফেলে চলে যাবেন না, মেহেরবানি করে হাসপাতালে দিন। এবং তারই অনুরোধে শেষ পর্যন্ত রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে সাত্তার খানকে তারা নিয়ে যায় এবং সেখানে তার চিকিৎসা চলে। জীবন-মৃত্যুর সাথে দীর্ঘদিন লড়াই করে অবশেষে সাত্তার খান বেঁচে উঠেন। অনেকগুলো প্লাস্টিক সার্জারি করবার পরে মুখের চেহারাও ফিরে আসে, তাকে দেখে চেনা যায়। সেই সময়ে পঙ্গু হাসপাতালে ও অন্যান্য জায়গায় আমি তাকে দেখতেও গিয়েছি। সাত্তার খান সুস্থ জীবনে ফিরে আসেন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশে থাকতে পারেননি। দেশ ছেড়ে চলে যান সুদূর কানাডায়, সেখানেই ছিলেন। বিয়ে করেছেন। সংসার আছে। সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এর মধ্যেই কয়েকবার হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে এবং সেখান থেকে চিকিৎসার পর বেরিয়েও আসেন। কিন্তু এইবার ছিলো তার শেষ যাত্রা। হাসপাতালে থাকতে থাকতেই সাত্তার খানের আরেক অনুজপ্রতিম, তখনকার সংগ্রামী ছাত্রনেতা, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা, বর্তমানের নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যআনোয়ার মুকুল তার সাথে যোগাযোগ রাখতেন। তিনি আমাদের ফোরামে আমাদের দলের কাছে, অন্যদের কাছে সাত্তার খান সম্পর্কে নিয়মিত খবর দিতেন। গতকাল তার ফেসবুকে সাত্তার খানের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানিয়ে আমাদেরকে লেখেন, এবং আজ সন্ধ্যার পর আমাদের নাগরিক ঐক্যের আরেক নেতা বাদল যিনি আমেরিকা থাকতেন, সম্প্রতি দেশে আছেন, তিনি ফোন করে আমাকে এই দুঃখজনক সংবাদ জানান- সাত্তার খানের মৃত্যু সংবাদ। জানি না এতোগুলো বছর পরে সাত্তার খান সম্পর্কে কী বলা যায়। কিন্তু যে লড়াইটা তিনি করেছেন, যে লড়াই পরে নিজের বেঁচে থাকার জন্য করেছেন- সবকিছু মিলে সাত্তার খান ছিলেন একজন অনন্য ছাত্রনেতা, অনন্য মানুষ, পরিচ্ছন্ন পরিস্কার নির্লোভ চরিত্রবান। তার এই প্রয়াণ আমার কাছে বেদনাদায়ক। আজকে এতোগুলো বছর পরে হয়তো অনেকের কাছেই তিনি স্মৃতির বাইরে। অনেকে তার নামও জানেন না, ঘটনাও জানেন না। সবার সামনে কথাগুলো তুলে ধরার জন্যেই আমি এই কথার অবতারণা করলাম।

সাত্তার খান ভালো থাকুক। সাত্তার খানের স্মৃতি অমর হোক। আমরা সবাই সাত্তার খান থেকে শিখি যে, এতো বড় কষ্টের পরেও তিনি নির্লোভ আদর্শবাদী লড়াই চালিয়ে গেছেন। তার পরিবার পরিজনের মঙ্গল কামনা করি।

 

লেখক : আহ্বায়ক, নাগরিক ঐক্য

 

আরও পড়ুন