চুপ হয়ে গেলেন এক ফোঁটা জলের মতোই

সহোদর-সন্ধানের ছদ্মাবেশে/আসলে কি আমি নিজেই নিজের লাশ/বয়ে নিয়ে যাচ্ছি মর্গে? ’ কবি মাশুক চৌধুরী এমন প্রশ্ন করে ছিলেন তার এক কবিতায়। মৃত্যু চিন্তা থেকেই হয়তো কবি নিজেই নিজের লাশ মর্গে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যকল্প আঁকতেন হৃদয়ের গভীরে। অনেকটা নীরবেই অন্তিম ঠিকানায় পাড়ি জমালেন নিভৃতচারী কবি ও সাংবাদিক মাশুক চৌধুরী।

‘হিমালয়  থেকে সুন্দরবন/অকস্মাৎ বাংলাদেশ যেন এক ফোঁটা জলের মতো চুপ হয়ে গেছে/শোক-দুঃখে হতাশায় পাথর শরীর আর ধারণ করে না জাগরণ।’ হ্যাঁ, এক ফোঁটা জলের মতোই চুপ হয়ে গেলেন কবি মাশুক চৌধুরী। অথচ হিমালয় থেকে সুন্দরবনকে এমন চুপ হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন কবিতায়। সত্তর দশকের তুমুল পাঠক প্রিয় কবি ও সাংবাদিক মাশুক চৌধুরী মঙ্গলবার রাতে ৭৩ বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নয়, নিউমোনিয়ায়। স্ত্রী আর এক কন্যাসহ অগণিত গুণগ্রাহী  রেখে গেছেনে তিনি।

১৯৪৯ সালের ১৬ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাছিহাতা ইউনিয়নের চানপুর গ্রামে মাতুতালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈত্রিকা ভিটা আখাউড়ার মনিঅন্ধ গ্রামে। মাশুক চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগে পড়াশোনা শেষ করে সাংবাদিকতা পেশাকে বেছে নেন। দৈনিক সংবাদ, দৈনিক খবরপত্র, দৈনিক দেশসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। বাংলাদেশ প্রতিদিন তার সর্বশেষ কর্মস্থল। পত্রিকাটির প্রধান বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন জীবনের দিন পর্যন্ত। সাংবাদিক পরিচয় ছাপিয়ে মাশুক চৌধুরীর কবি পরিচিতিটাই মুখ্য হয়ে উঠে। তিনি ছিলেন স্বল্পবাক ও নিভৃতচারী। শিশুর মতো সরল। খুব আস্তে আস্তে কথা বলতেন।

মাশুক চৌধুরী ছিলেন আমার অভিভাবক। আমাদের অভিভাবক। সাংবাদিকতার নানা তালিম দিয়েছেন।  বহু বছর আগেই মাশুক ভাইয়ের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়। ২০০৩ সালে আমি একটি জাতীয় দৈনিকে কাজ করতে শুরু করি। এর পরপরই পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন মাশুক ভাই। কবিতা পছন্দ করতাম বলেই তার সাথে আমার হৃদয়ের তলায় একটা সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আমি তখন বিউটির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। প্রায় প্রতিদিনই টেলিফোনে মাশুক ভাই জিজ্ঞেস করতেন ‘তোমার প্রেমিকাটার খবর কী?’ একবার তো ভাবিকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের বাড়িতে চলেই এলেন মাশুক ভাই। বিউটি আমি মাশুক ভাই আর ভাবি সারাদিন ঘুরে বেড়িয়েছি (তখনও বিউটির সাথে আমার বিয়ে হয়নি)।

যাপিত জীবনের নানা গল্প শুনিয়েছেন তিনি। জাতীয় প্রেসক্লাবে তার সঙ্গে কতবার যে আড্ডায় মেতেছি, তার আর হিসাব নেই। এই  তো সপ্তাহ তিন আগেও তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা  হলো। বললেন, পৃথিবী আবার তার আসল রুপে ফিরে আসুক, তোমার বাড়িতে যাবো। তোমার বউ বিউটির হাতের রান্না খাবো।

আহা জীবন! ৭০ এর দশকে কবিতা প্রেমিদের কাছে প্রিয় কবি হয়ে উঠেন মাশুক চৌধুরী। কবি শামসুর রাহামান ও কবি আল মাহমুদের সান্নিধ্যে বহু সময় গেছে তার। কবি শামসুর রাহমানের আত্মজীবনী
‘কালের ধুলোয় লেখা’ গ্রন্থে  কবি মাশুক চৌধুরীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথা লিখেছেন। মাশুক চৌধুরীর বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ পাঠক প্রিয়তা লাভ করে। তার মধ্যে ‘নদীর নাম দুঃসময়’, ‘মুক্তিযুদ্ধ প্রিয়তমা আমার’, স্বর্গের রেপ্লিকা’,’অত্যাগসহন’। সর্বশেষ বেরিয়েছে তার ‘নির্বাচিত কবিতা ‘।

এ গ্রন্থের ভূমিকায় ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, মাশুক  চৌধুরী সচেতনভাবে নয়, এক সহজাত আত্মতাড়না থেকে স্বাধীন জন্মভূমিতে আবির্ভূত নতুন সময়ের কবিদের সঙ্গে কণ্ঠ  মেলান। স্বাধীন বাংলাদেশে কবিতায় বিমগ্ন প্রথমগুচ্ছ কবিদের একজন তিনি। তার কবিতায় রয়েছে এক ব্যতিক্রমী সতেজতা, তার উচ্চারণে শোনা যায় আত্মদহনে দগ্ধ ও বিদীর্ণ এক কবির ক্রন্দন। এই রক্তক্ষরা ক্রন্দনে লুকিয়ে থাকে দার্শনিক সুলভ এবং নিরাসক্ত পর্যবেক্ষণজাত উক্তি, যা তার রচনাকে উজ্জ্বল করে রাখে। রাজনীতির মৌলিক গতি-প্রকৃতির প্রতি তার আগ্রহ। সত্তর দশকের আরও কোনো কোনো কবির মতো তিনিও মার্কসবাদের মন্ত্রে নিজেকে উজ্জ্বীবিত রাখেন, ফলে মানুষের সার্বিক কল্যাণ তার আরাধ্য হয়ে ওঠে। একজন খাঁটি মানবপ্রেমিক কবির মতো তিনি সামষ্ঠিক আবেগ এবং অনুভূতিতে জাড়িত করেছেন। তার চোখে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ হয়ে উঠে এক আন্তর্জাতিক এবং সার্বজনীন মুক্তিযুদ্ধ।’

এই দেশটা নিয়ে কবি মাশুক চৌধুরী স্বপ্ন দেখতে, স্বপ্ন দেখাতেন তার কবিতায়। আশাবাদী মানুষ ছিলেন তিনি। কখনো ক্ষোভে দ্রোহে গর্জে উঠতেন কবিতায়। তার এক কাব্যগ্রন্থের নাম ‘নদীর নাম দুঃসময়’। সত্যি দুঃসময় নামক সেই নদীতে ভাসছে গোটা পৃথিবী। তখনই চলে গেলেন তিনি। এক কবিতায় তিনি লিখেছেন- ‘একদিন আমাকে আমার প্রিয় পিতামহ ইশটিশনে এনে/একটা ট্রেনে কামরায় তুলে দিয়ে বললেন : যাও, চীনের মতো কোনো এক প্রাচীন নগর হোক তোমার গন্তব্য’। না, চীনের মতো প্রাচীন কোনো নগরী গন্তব্য হয়নি কবি মাশুক চৌধুরীর। গন্তব্য হলো ‘অন্তিম ঠিকানায়’। ভালো থাকবেন মাশুক ভাই। খুব ভালো। নিশ্চয় বিধাতা আমাদের প্রার্থনা কবুল করবেন।

লেখক: কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন