ছাত্রলীগের হাত ধরেই শাহ মোয়াজ্জেমের রকমারি রাজনীতি

চির অচেনার দেশে চলে গেলেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। মানুষের কাছে আলোচিত-সমালোচিত হলেও বর্ষীয়ান শাহ মোয়াজ্জেম ছিলেন পুরোদস্তুর এক রাজনীতিবিদ।  রাজনীতিটাও ছিলো অনেকটা রকমারি গোছের।

ছাত্রলীগের হাত ধরেই রচনা করেন নিজের রাজনীতির উত্থান-পতনের ইতিকথা। তিনি জীবন সায়াহ্নে বর্ণাঢ্য জীবনের গল্প বলতে গিয়ে এক গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ছাত্রাবস্থায় বাসায় গেলে মুজিব ভাই ভাবীকে বলতেন, ওকে দুই পয়সা দামের চা দিও না। পাঁজিটা হয়তো সারাদিন ভাত না খেয়েই চরকির মতো ঘুরে বেড়াবে- ওকে ভাত খাইয়ে দাও। কখনো কখনো ভাবী বলতেন, এখনো চুলা থেকে তরকারি নামেনি। মুজিব ভাই বলতেন, তাহলে একটা ডিম ভেজে ওকে খাইয়ে দাও, ও কি আর সারাদিনে খাবে!’

ষাটের দশকের শুরুতে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন শাহ মোয়াজ্জেম। যখন পূর্বপাকিস্তান ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুল মমিন তালুকদার (বঙ্গবন্ধুর প্রতিমন্ত্রী) ও সাধারণ সম্পাদক এমএ ওয়াদুদ (শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির পিতা)।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে মোয়াজ্জেমকে পরিচয় করিয়ে দেন আবদুল মমিন তালুকদার। পরের বছর ছাত্রলীগের সম্মেলনে  সভাপতি  রফিকউল্লাহ চৌধুরী (বর্তমান স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীর পিতা) ও সাধারণ সম্পাদক হলেন আজহারউদ্দীন আহমদ। কিন্তু আজহারউদ্দীন ব্যারিস্টারী পড়তে বিলেতে চলে যান। এতে ভাগ্য খুলে যায় শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বক্তৃতাগুণ আর ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবের আশীর্বাদে পরবর্তী সম্মেলনেই ছাত্রলীগের সভাপতি হয়ে যান শাহ মোয়াজ্জেম। তার সঙ্গে সাধারণ হন সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মনি। দুই মেয়াদ পার করে তারা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব তুলে দেন কেএম ওবায়দুর রহমান ও সিরাজুল আলম খানের হাতে।

 

এরপর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন অনলবর্ষী বক্তা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। ‘৭০ – এর নির্বাচনে জয়ী হয়ে মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদে চিফ হুইপ করেন মোয়াজ্জেমকে। কিছুটা মনোকষ্টে ছিলো চিফ হুইপের পদটি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা হওয়ায়। নিজেই বলেন, বঙ্গবন্ধুর কাছে আকার ইঙ্গিতে পূর্ণমন্ত্রীর সমমর্যাদাও প্রত্যাশা করি। কিন্তু তা পূরণ না হলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি ছিলাম অবিচল।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর খন্দকার মোশতাকের প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেছেন ঝানু এ রাজনীতিবিদ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের অধিকাংশ মন্ত্রী মোশতাক সরকারে যোগদানের পর তাঁর না বলার কারণ ছিলো না। কিছুটা ভয়ভীতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

উল্লেখ্য বঙ্গবন্ধু হত্যার পর মোশতাক রাষ্ট্রপতি হয়ে শাহ মোয়াজ্জেমকে চিফহুইপ থেকে প্রতিমন্ত্রী করেন।  শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ও  মোশতাকের অপর জাঁদরেল তিন প্রতিমন্ত্রী নূরুল ইসলাম মঞ্জুর, তাহের উদ্দিন ঠাকুর ও কে এম ওবায়েদুর রহমানই জেলে নিক্ষেপ করার আগে জাতীয় চার নেতাকে বঙ্গভবনে মোশতাকের সামনে হাজির করেছিলেন। এ তিন প্রতিমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুরও প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর  রাষ্ট্রপতি মোশতাকের আদেশে বঙ্গবন্ধুর খুনীরাই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নিহত বঙ্গবন্ধুর বাকশাল সরকারের উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, বাকশালের মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রী এম মনসুর আলী ও আওয়ামী লীগের এককালীন সভাপতি ও শিল্পমন্ত্রী এএইচএম কামরুজ্জামানকে। এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগেই বিগ্রেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে কর্নেল শাফায়াত জামিলের ৪৬ বিগ্রেড কমান্ড এক অভ্যুত্থান সংঘটিত করে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে। বঙ্গভবনে অবরুদ্ধ অবস্থায়  রাষ্ট্রপতি মোশতাক খালেদ মোশাররফকে সেনাপ্রধান পদে নিয়োগ দেন। এর মধ্যে বঙ্গভবনে খবর আসে জাতীয় চার নেতা হত্যার। বিক্ষুব্ধ শাফক্বাত জামিলের বাহিনী বঙ্গভবনের মন্ত্রিসভা কক্ষ ভেঙ্গে ঢুকে পড়েন। ২১ মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রী প্রাণে বাঁচার জন্য দিকবিদিকশূন্য হয়ে পড়ে।  চড়াও হয় মোশতাকের ওপর। গুলি করতে উদ্যত হলে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা জেনারেল এম এ জি ওসমানী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। মোশতাক পদত্যাগ করলে জেনারেল খালেদ মোশাররফের পছন্দে প্রধান বিচারপতি এএসএম সায়েম রাষ্ট্রপতি হন। জেলহত্যা বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠিত হয় বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন, বিচারপতি কে এম সোবহান ও বিচারপতি মোহাম্মদ হোসেনের নেতৃত্বে। কিন্তু ফারুক-রশীদ-নূর-হুদা- ডালিমদের অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর ও জাতীয় চার নেতার খুনীদের বিমানে করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। অপরদিকে বঙ্গভবন থেকেই গ্রেফতার করা হয় শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নূরুল ইসলাম মঞ্জুর,তাহের উদ্দিন ঠাকুর ও কে এম ওবায়দুর  রহমানকে।

কিন্তু ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও জাসদের গণবাহিনীর পাল্টা অভ্যুত্থানে জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে সেনাপ্রধানের পদে ফিরেন। নিহত হন খালেদ মোশাররফসহ তাঁর সহযোগীরা। জেনারেল জিয়ার অনুকম্পায় অন্যান্যের ন্যায় কারামুক্ত হন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনও। আওয়ামী লীগে মোশতাকের অধিকাংশ মন্ত্রী ফিরলেও ব্যতিক্রম ছিলেন শাহ মোয়াজ্জেম। তিনি খুনী মোশতাকের ডেমোক্রেটিক লীগে যোগ দেন। ১৯৭৬ সালে মোশতাকের বায়তুল মোকাররমের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ ও সাপ ছেড়ে দেয়ার ঘটনা ঘটে। এতে  দুই সাংবাদিকসহ ৯ জনের মৃত্যু ঘটলে খুনী মোশতাক রাজনীতি থেকে আজীবনের জন্য অবসরেে চলে যান। জিয়া নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষনতায় জেনারেল এরশাদের উত্থান ঘটে। অচিরেই শাহ মোয়াজ্জেম এরশাদের নজর কাড়েন। এরশাদ প্রথমেই তাঁকে  মন্ত্রী করেন। পরবর্তীতে উপপ্রধান মন্ত্রীও করেন। প্রধানমন্ত্রী হতে চাইলেও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বা কাজী জাফর আহমেদকে ডিঙিয়ে সম্ভব হয়নি তবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব হিসাবে রাজনীতিতে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী হয়ে উঠেছিলেন মোয়াজ্জেম। শাহ মোয়াজ্জেম এরশাদের বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে আবির্ভূত হন। কিন্তু পরবর্তীতে এরশাদের জীবদ্দশায়ই পাল্টা জাতীয় পার্টি গঠন করেন এরশাদেরই এককালীন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে। কাজী জাফর আহমেদ ইহলোক ত্যাগ করেছেন।
শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন সর্বশেষ  যোগ দেন বিএনপিতে। তার রাজনৈতিক জীবন বড় ঘটনাবহুল। জেলহত্যা মামলারও আসামি ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদের কাছে ছিলেন বিতর্কিত। বিএনপিতেও বিতর্কিত হয়ে পড়েন, প্রকাশ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্র তারেক রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দেশ পরিচালনার যোগ্যতা সর্বোপরি নেতৃত্ব সম্পর্কে কটাক্ষ করে বিদ্রুপাত্মক সব মন্তব্য করে। যা গণমাধ্যমে প্রচারিত হলে ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে এবং ভাইরাল হয়। অবশ্য তারপরও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদে আসীন ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

রাজনৈতিক জীবন নিয়ে ইতিমধ্যে তিনি যে দুটি গ্রন্থ লিখেছেন, তাতে অবিস্মরণীয় অবদান তুলে ধরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি চিরদিন আস্থাশীল ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন। জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি হওয়া শাহ মোয়াজ্জেম নিজের ওই হত্যাকাণ্ডে কোনপ্রকার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন এবং বলেছেন আওয়ামী লীগ না করাই যেন তার অপরাধ।

শাহ মোয়াজ্জেম লিখেছেন, ১৯৬২ সালের দিকেই শেখ মুজিবুর রহমান নিজহাতে মুসাবিদা করে নিজে প্যাডেল চালিয়ে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার সপক্ষে লিফলেট ছেপে আনতেন, তা গভীর রাতে সাইকেলে চড়ে শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান ও আবদুর রাজ্জাক আর আমি সেগুলো বিলি করতাম। অনেক নেতার ভিড়ে একটি সাহসী কণ্ঠস্বর, তার (বঙ্গবন্ধু) আপসহীন মনোভাব আর দেশপ্রেম ও মানুষের জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা নিয়ে ত্যাগ তিতীক্ষার পথে যখন যাত্রা শুরু করলেন, তখন বিধাতাও তার হাত উজাড় করে তাকে বরমাল্য দিলেন। শেখ সাহেব আওয়ামী লীগের নেতা, একটি দলের নেতা, সেখানে অচিরেই জাতীয় নেতায় রূপান্তরিত হতে। ১৯৬৬ সালের ছয় দফার বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিলো। শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হয়ে গেলেন। তারপর তার স্বপ্নের বাংলাদেশ।

শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন লিখেছেন, আমরা ছিলাম অন্ধভক্ত মুজিবঅন্তপ্রাণ। বঙ্গবন্ধুর কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির মধ্যেও তার তীব্র স্বকীয়তা ও পরনির্ভরহীনতা সবাইকে আকৃষ্ট করতো। দোষে-গুণেই মানুষ। কিন্তু এমন এক একটি গুণ থাকে যার জন্য শতদোষও খণ্ডিত হতে পারে। যে গুণ ছিলো বঙ্গবন্ধুর। তার সান্নিধ্য ভালো লাগতো। তার ছিলো অমোঘ আকর্ষণীয় শক্তি- যা বারবার কাছে টানতো। আমরা ছিলাম অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধ। পারসনাল ক্যারিশমা যাকে বলে, তা ছিলো তুলনাহীন। তিনি মানুষকে খুব সহজে আপন করে নিতে পারতেন। সবসময় ভাবতাম তার স্নেহ আছে, আর আমাকে পায় কে? রাজনীতিতে দরকার Friend, philosopher and guide, আমি যা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছি।

শাহ মোয়াজ্জেম লিখেছেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য এবং গৌরবোজ্জ্বল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশে বাংলাদেশ কখনও কার্পণ্য করে না। কিন্তু সেই সুবাদে নানা অবিমৃষ্যকারিতা নীরবে সহ্য করে যেতে হবে এটাও একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতির কাম্য হয় কি করে? গুজব ছিল দেশ থেকে সোনা, রূপা, তামা, পিতলসহ তৈজসপত্র, গাড়ি ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বিপুলাকারে সীমান্তের ওপারে চলে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু এসব অভিযোগ শুনছিলেন। উভয় সংকটে পড়লেন তিনি। ভারতীয় বাহিনীকে স্বদেশে ফেরানো কোনও সহজ ব্যাপার ছিল না। বাস্তবতার সঙ্গে চক্ষুলজ্জা বলেও তো কথা। সরকারের ও দলের নেতারা বিচলিত, কীভাবে সেনাবাহিনী ফেরাবেন তা বোধগম্য হচ্ছিল না কারোরই। অথচ, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু সরাসরি ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে তাগিদ দিয়ে বসলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ফেরত নিতে হবে। ইন্দিরা গান্ধী বললেন আপনার আগামী জন্মদিনের আগেই ফিরিয়ে নেওয়া হবে। ঠিকই সম্মানের সঙ্গে তাঁরা তাদের মাটিতে চলে গেলো। দেশের মানুষ স্বস্তি পেলো। ইন্দিরা গান্ধী তার এক ঝানু আমলা শ্রী ডিপি ধরকে বাংলাদেশে প্রেরণ করেছিলেন, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসন কাঠামো গঠনে সহায়তা করার জন্য। বিষয়টি স্পর্শকাতর ঠেকলো বঙ্গবন্ধুর কাছে। এখানকার প্রশাসনও ডি পি ধরের খবরদারি মানতে চাচ্ছিল না। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাষ্ট্রদূত ডি পি ধর আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করতে গেলেন এক রাতে সমভিব্যাহারে।

সৌজন্যমূলক কুশলাদি বিনিময়ের পরে বঙ্গবন্ধু হঠাৎ করেই বলে বসলেন, মি. ধর, কবে দিল্লী ফিরে যাচ্ছেন? এসেছেন মাত্র, কয়েকটা দিন আমাদের এখানে কাটান। বাংলাদেশ মাছের দেশ। এখানকার পদ্মার ইলিশ খুবই উপাদেয় ও মজাদার। কয়েকদিন থেকে মাছ-টাছ খান, তারপর যাবেন। ডি পি ধর হতবাক, প্রথম দিবসেই তাকে ফিরে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হলো, কেন? সরকার প্রশাসন কাঠামো গঠনের কোনও ইঙ্গিতও নেই। তাহলে? রাষ্ট্রদূত ডি পি ধর ওদিনই বার্তা পাঠালেন দিল্লিতে।

ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যা বুঝার বুঝলেন। তিনি দ্রুত ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ দিলেন মি. ধরকে। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সচিব রফিকউল্লাহ চৌধুরীর বরাত দিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন তাঁর একটি গ্রন্থে এ ঘটনার বর্ণনা করে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু ব্যতীত অন্য কারো পক্ষে এভাবে সরাসরি ডি পি ধরকে অপ্রস্তুত করে ফেলে দিল্লিতে ফেরানোর পথনির্দেশ দিতে পারতেন না। শাহ মোয়াজ্জেম আরও লিখেছেন, স্বাধীনতার তেজ ছিল বঙ্গবন্ধুর মজ্জাগত। তিনি মনে করেছেন হ্যাঁ, প্রয়োজনে ওদের সাহায্য নিয়েছি, সেজন্য কৃতজ্ঞচিত্তে সর্বদা স্বীকার করব। কিন্তু তাই বলে, আমরা কারো মাখা তামাক খাই না। তিনি লিখেছেন ‌‌’কেউ অহেতুক অভিভাবক হয়ে দাঁড়াবে এটা বঙ্গবন্ধুর কাছে বাঞ্ছনীয় ছিল না। মি. ধরের প্রস্তাবগুলোও তার মনপুত হয়নি। দেশ শাসনে বঙ্গবন্ধুর মস্তিষ্কের চাইতে হৃদয়ের প্রভাবই কাজ করেছে অধিকতর। কিন্তু একটি বিষয়ে মতান্তর ছিল না যে বঙ্গবন্ধু একজন সত্যিকারের স্বাধীনচেতা মানুষ ছিলেন এবং যতবড় বন্ধুই হোক ভিনদেশের অসিগিরি তাঁর অত্যন্ত অপছন্দীয় ছিল। ‘

শাহ মোয়াজ্জেম আরও লিখেছেন, ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে মুসলিম দেশসমূহের ইসলামিক সম্মেলন এলো। গণভবনে বৈঠক বসলো। বঙ্গবন্ধুর যোগদান প্রশ্নে সরকারের একটি অংশ ‘না’ যাওয়ার পক্ষে মত দিল। ‘না’ এর পক্ষে ছিলেন- অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ এবং আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন প্রমুখ। তারা বলছিলেন, ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসেবে ইসলামি সম্মেলনে যোগদান ঠিক হবে না। যাওয়ার পক্ষে যারা অবস্থান নিলেন- তাদের যুক্তি ছিল যে, দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিম এবং পৃথিবীতে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। ইসলামিক সম্মেলনে না যাওয়া হবে দেশের মানুষের ধর্মানুভূতির প্রতি উপেক্ষা প্রদর্শনেরই নামান্তর। কেউ কেউ এজন্য অনেক খেসারতের আশঙ্কাও করলেন।

বঙ্গবন্ধু যখন যাওয়ার পক্ষে মত দিতে চলছিলেন, তখন না যাওয়ার পক্ষে যারা ছিলেন, তারা প্রস্তাব দিলেন, ঠিক আছে যেতে চান, যান, কিন্তু যাত্রাপথে দিল্লিতে নেমে ওদের সঙ্গে একটু কথা বলে গেলে সবদিক রক্ষা হয়। তৎকালীন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের মতে, বঙ্গবন্ধু টেবিল চাপড়িয়ে রীতিমতো ক্রুদ্ধ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, বললেন, আমি কারো মাখা তামাক খাই না যে, আমাকে মাঝপথে নেমে কারো মত নিতে হবে? তোমরা ভেবেছো কী? আমাদের সার্বভৌম দেশ। কী করব, না করব আমরা সাব্যস্ত করব। কাউকে ট্যাক্স দিয়ে চলার জন্য দেশ স্বাধীন হয়নি। পিন্ডির গুহা থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে আমরা দিল্লির গর্তে ঢুকব- আমার জীবদ্দশায় তা হবে না। তোমরা যে যা মনে কর, কর,আমি ইসলামাবাদ যাব, সরাসরি যাব। এ না হলে নেতা! কেউ আর উচ্চবাচ্য করতে সাহসী হল না। এই ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ইতিহাস গবেষক।

আরও পড়ুন