জিয়া বীরউত্তম মুক্তিযোদ্ধা, খালেদা জিয়া নন

করোনার মহাপ্রাদুর্ভাবের মধ্যেই ২০২১ পার করে এলাম। সবাই আশা করব করোনার ২০২১-এর চেয়ে ২০২২ সাল নিশ্চয়ই স্বস্তির ও আনন্দের হবে, হবে গণতন্ত্রের, মানুষের কল্যাণের। করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের হুমকিতে আবার সারা পৃথিবী নড়েচড়ে উঠেছে। আমাদের দেশে ওমিক্রনের প্রভাব পড়বে কি না সে শুধু জগৎস্রষ্টা আল্লাহ রব্বুল আলামিনই জানেন। একজন মানুষ হিসেবে আশা করব আমরা ভালো থাকব, স্বস্তিতে থাকব। যদিও রাজনৈতিকভাবে দেশ তেমন স্বস্তিতে নেই, শান্তিতে নেই। কেন যেন সবাই লাগামহীন কথাবার্তা বলেন। কারও প্রতি কারও খুব একটা সমীহ বা সৌজন্য নেই। যে যেভাবে পারেন, যার মুখে যা আসে তা-ই বলেন। সবই কেমন যেন ফ্রিস্টাইল। আমি আন্তরিকভাবেই লিখেছিলাম, বেগম খালেদা জিয়া সত্যিই কি মুক্তিযোদ্ধা? নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলার তার কি কোনো সুযোগ আছে? তিনি নিশ্চয়ই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী। কিন্তু তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন, মুক্তিযোদ্ধা বলে তাঁকে সম্মানিত নয় নতুন প্রশ্নের মুখে ফেলা হচ্ছে। খুব সম্ভবত ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপির এক মস্তবড় জনসভায় আমাকে অনেকটা ব্যঙ্গ করেই ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া ১ নম্বর নারী মুক্তিযোদ্ধা’। বিস্মিত না হয়ে পারিনি, আজকের ফখরুল ইসলাম আর মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ফখরুল ইসলাম এক নন, এক অবস্থানেও নন। তাই কিছুদিন যাবৎ বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর তার চেষ্টা বা উদ্দেশ্য পুরোপুরি বুঝতে পারছি না। বেগম খালেদা জিয়া এক দিনের জন্যও পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিলেন না। হ্যাঁ এটা ঠিক, বেগম খালেদা জিয়াকে জিয়াউর রহমানের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুবার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি যাননি বা যেতে পারেননি এটা ভিন্ন কথা। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে তিনি যদি পা না বাড়িয়ে থাকেন সেটা কোনো দোষের নয়, তিনি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন তাই তাঁর কিছুই করার ছিল না। অত বড় একটা পশুশক্তির হাতে যারা বন্দি ছিলেন তাঁরাই শুধু বলতে পারেন তাঁদের জীবন কতটা দুর্বিষহ। বেগম জিয়ার পাকিস্তান হানাদারদের হাতে বন্দি থাকাই প্রমাণ করে জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে হঠাৎই জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাৎক্ষণিকভাবে পরিবার-পরিজনের কথা, তাদের নিরাপত্তার কথাও ভাবার সুযোগ পাননি। অন্যদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর মা-ভাই-বোনসহ আটক ছিলেন। আটক অবস্থাতেই সন্তান জন্ম দেন। আল্লাহর কি কুদরত, পাকিস্তান হানাদারদের হাতে বন্দি দুজন সম্মানিত মহিলা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। একেই বলে আল্লাহর কুদরত। কিন্তু বিএনপি মহাসচিব হঠাৎ বেগম খালেদা জিয়াকে কেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বানানোর চেষ্টা করছেন, তা-ও আবার ১ নম্বর নারী মুক্তিযোদ্ধা- এর কোনো মানে বুঝতে পারছি না। বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধা এটা ভাবীকালে কী করে প্রমাণ করা হবে বা করা যাবে বুঝতে পারছি না। তবে শত বছর পর বেগম খালেদা জিয়ার নাম যদি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় ওঠে তাহলে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগবে তিনি কোথায় যুদ্ধ করেছেন, কী অস্ত্রে যুদ্ধ করেছেন অথবা অস্ত্রশস্ত্র না নিয়েই যদি মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়ে থাকেন তাহলে সেটা কোথায়- নিশ্চয়ই জায়গাটি খোঁজার চেষ্টা হবে। কিন্তু যখন দেখা যাবে তিনি সব সময় ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন তখন আরও প্রশ্ন উঠবে তাহলে কি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্টগুলো মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প ছিল? হ্যাঁ এটা ঠিক, পাকিস্তানি অফিসাররা কিছু কিছু বইপত্রে লিখেছেন যাতে অনেকটাই তখনকার অবস্থা বেরিয়ে এসেছে। কী এক পাকিস্তানি কর্নেল বা ব্রিগেডিয়ারের বই পড়েছিলাম। তার তিন-চার বছরের ছেলে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিকে ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’ বলে বাড়িঘর মাথায় তুলত। এটা ঠিক, মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’ স্লোগানে পূর্ব পাকিস্তানের আকাশ-বাতাস, নদী-নালা, খাল-বিল উত্তাল ছিল। যে জয় বাংলা ছিল বাঙালির শ্বাস-প্রশ্বাস। সঠিকভাবে চালাতে বা চলতে না পারার কারণে স্লোগানটি সমগ্র জাতির না হয়ে এখন একমাত্র আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগানে পরিণত হয়েছে। সেই স্লোগানও আবার আওয়ামী লীগের ভক্ত-অনুরক্ত-কর্মী বাহিনীর কণ্ঠে বুক উজাড় করা মনে হয় না। স্লোগান তুলতে হয় তাই তোলে। আমরা যে জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে পাকিস্তানিদের পরাজিত করেছিলাম, বর্তমানে সেই জয় বাংলা পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারাই ইদানীং যে দৃঢ়তার সঙ্গে আন্তরিকতার সঙ্গে জয় বাংলা স্লোগান তোলে, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা তার চাইতে হাজার গুণ বেশি হৃদয়ের সব শক্তি একত্রিত করে জয় বাংলা স্লোগান দিতাম। আমাদের উচ্চারিত জয় বাংলা যেমন মাকে মনে করিয়ে দিত, তেমনি দেশ ও দেশের মাটিকে মনে করাত। সে ছিল খাঁটি সোনা। বিন্দুমাত্র খাদ ছিল না। যে সন্তান মাকে ভালোবাসে সে মায়ের জন্য যেমন সবকিছু ত্যাগ করতে পারে তেমনি প্রতিটি বাঙালি যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল তারা ওভাবেই দেশের জন্য ভাবত, অনুভব করত। তাই জয় বাংলায় অত শক্তি লুকিয়ে ছিল। এটা সত্য, সব সময় একই জিনিস একইভাবে থাকে না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় ‘কানমে বিড়ি মুখে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ ছিল পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণের মুখের বুলি, আত্মার চিৎকার। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনসাধারণ ‘কানমে বিড়ি মুখে পান, লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ আত্মার এ চিৎকার ধুলোয় মিলিয়ে গিয়েছিল। কারণ পাকিস্তানিরা বাঙালির মায়ের ভাষা বাংলা কেড়ে নিতে চেয়েছিল। মুখের ভাষা বাংলা কেড়ে নিতে না পারলেও তারা যে বিমাতাসুলভ আচরণ করেছে তাতে বাংলা ভাষাভাষী সবার মনে বিক্ষোভ দানা বেঁধেছিল। যার প্রতিফলন ঘটেছিল ’৫৪-এর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ওভাবে মাত্র ছয়-সাত বছরে পাকিস্তানিদের ভেসে যাওয়ার কথা ছিল না। অথচ ভেসে গিয়েছিল। প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৯টি পেয়েছিল পাকিস্তান সমর্থকরা। বাদবাকি ২৯১টি পেয়েছিল যুক্তফ্রন্ট। সাধারণ মানুষের রায়কে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী কোনো সম্মান দেখায়নি। ভালোভাবে এক মাসও টিকতে পারেনি শেরেবাংলার মন্ত্রিসভা। ৯২(ক) ধারা জারি করে বাংলার বাঘ ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা বাতিল করে দিয়েছিল। ঠিক একই রকম পদক্ষেপ নিয়েছিল ’৭০-এর নির্বাচনের পর। বাংলার সাধারণ মানুষের রায়কে পাকিস্তানিরা পদদলিত করেছিল। ’৭০-এর নির্বাচনের রায় পদদলিত করা বাংলার মানুষ মেনে নেয়নি। বিশেষ করে ছাত্র-যুবক, কৃষক-শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার শেষ ধাপ হচ্ছে অসহযোগ। ব্রিটিশ ভারতে অসহযোগের ডাক দিয়েছিলেন ভারতপিতা মহাত্মা গান্ধী। আর পূর্ব পাকিস্তানে সফল অসহযোগ ডেকেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পৃথিবীর ইতিহাসে অমন অসহযোগ আর কোথাও কখনো হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধু নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে আসেনি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপিত ছিল অনেক গভীরে। সূচনা হয়েছিল বঙ্গভঙ্গেরও কিছুটা আগে। সেটা মহিরুহের রূপ ধারণ করেছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবির মধ্য দিয়ে। এটা আরও শক্তিশালী হয়েছিল ’৫৪-এর তিন নেতা শেরেবাংলা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও হুজুর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ’৫৪-এর নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী সহজভাবে মেনে নেয়নি। নানা ছলাকলা করে ’৫৪-এর ভোটকে ধূলিসাৎ-চেষ্টার মধ্য দিয়ে ’৫৮-এর ২৭ অক্টোবর আইয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা কেড়ে নেন। যে ইস্কান্দার মির্জা মার্শাল ল জারি করেছিলেন সেই ইস্কান্দার মির্জাকে আইয়ুব খান ইংল্যান্ডে হোটেলের ম্যানেজারির চাকরি দিয়ে পাকিস্তান থেকে বের করে দেন। আইয়ুব খান নানা ছলাকলা করে ‘বুনিয়াদি গণতন্ত্র’-এর নামে ১০ বছর পাকিস্তানের ক্ষমতা আঁকড়ে রাখেন। ’৬২ সালে সামরিক শাসন তুলে নিলে আবার ধীরে ধীরে মানুষ একত্রিত হতে থাকে, রাজনীতির বাতাস বইতে থাকে। এর মধ্যে ’৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা ঘোষণা করেন। ছয় দফা দাবির সঙ্গে আওয়ামী লীগেরও অনেকে একমত ছিলেন না, বড় বড় নেতারা তো নয়ই। ছাত্র-যুবকরা ছয় দফাকে লতার মতো আঁকড়ে ধরে। পাকিস্তানের লৌহমানব আইয়ুব খানের সহ্যের সীমা পেরিয়ে যায়। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বারবার গ্রেফতার করেন। কয়েক বছর জেলে থাকার পর ’৬৮ সালের ১৮ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হলে সাধারণ পোশাকে আর্মির গাড়ি এসে নেতাকে তুলে নিয়ে যায়। চার-পাঁচ মাস তাঁর কোনো খবর ছিল না। এ সময় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা রুজু করা হয়। প্রথমে বঙ্গবন্ধুর নাম না থাকলেও পরে তাঁকেই ১ নম্বর আসামি করা হয়। মামলা চলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। অন্যদিকে ছাত্র-যুবকরা দল বেঁধে রাস্তায় নামতে থাকে। আইনি লড়াই লড়তে ইংল্যান্ড থেকে আইনবিদ আনার চেষ্টা করা হয়। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও অন্যান্য সংগঠন রাস্তাঘাটে হাত পেতে টাকা তুলে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে পাঠায় আগরতলা মামলার লড়াই করার জন্য। আমরা ছাত্র হিসেবে টাঙ্গাইল ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ৪০০ টাকা এবং জেলা আওয়ামী লীগ ১৭০০ টাকা কেন্দ্রীয় ফান্ডে জমা করে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি বাংলাদেশের সূর্যসন্তান তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলা হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা দাবি পেশ করে। এ ১১ দফা আর আওয়ামী লীগের ছয় দফা একাকার হয়ে যায়। সারা দেশে আকাশে বাতাসে মাঠে ময়দানে খালে বিলে নদীতে সাগরে আওয়াজ ওঠে- ‘শেখ মুজিবের মুক্তি চাই, আগরতলা মামলা মানি না মানব না’। ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে আসাদের মৃত্যুর পর আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ’৯০-এ যেমন ডা. মিলনের মৃত্যু পুরো দেশকে জাগিয়ে দিয়েছিল তেমনি আসাদের মৃত্যুর পর সারা দেশ জ্বলে ওঠে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোল দিয়ে আইয়ুব খান পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক আলোচনার ব্যবস্থা করেন। তত দিনে বাংলার মানুষের হৃদস্পন্দন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্যারোলে গোলটেবিলে যেতে অস্বীকার করেন। পরে ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবসহ সবাইকে মুক্তি দিয়ে আগরতলা মামলা তুলে নেওয়া হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি রমনা রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র-গণ আন্দোলনের মহানায়ক ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক তোফায়েল আহমেদ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকে শেখ মুজিব হলেন বঙ্গবন্ধু। তার কদিন পরই তিনি হন দেশের পিতা। ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁকে বঙ্গবন্ধু ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে এক নবজাগরণের সৃষ্টি হয়। আইয়ুব খান আর বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। উন্নয়নের দশক পালন করতে গিয়ে তীব্র আন্দোলনের মুখে পড়ে ২৪ মার্চ ’৬৯ সেনাপ্রধান ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে বলেন, ‘আমি সৈনিক, আমার ক্ষমতার লোভ নেই। দুই বছরের মধ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে ব্যারাকে ফিরে যাব।’ না, তিনি ব্যারাকে ফিরে যাননি। পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে নিষ্ঠুর হত্যাকান্ড তিনি বাংলার বুকে ঘটিয়েছিলেন।

ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান সরকার ’৭০-এ সাধারণ নির্বাচন করেছিল। সেখানে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। পশ্চিম পাকিস্তানে ৮১ আসন পেয়ে জাতীয় পরিষদে জুলফিকার আলী ভুট্টো হয়েছিলেন প্রধান বিরোধী দল। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ, পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি। জুলফিকার আলী ভুট্টো যেমন পূর্ব পাকিস্তানে একটি আসনও পাননি, তেমনি আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো আসন পায়নি। তাই বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। ইয়াহিয়া খান সংসদ অধিবেশন ডেকেও মাঝপথে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এতে বাংলার মানুষ ফুঁসে ওঠে। শুরু হয় অসহযোগ, ঐতিহাসিক অসহযোগ। এমন অসহযোগ মহাত্মা গান্ধীর আহ্বানে ব্রিটিশ ভারতেও হয়নি। অসহযোগের চাপে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান আসেন। বারবার আলোচনায় বসে সময় ক্ষেপণ করেন। এর মধ্যেই ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এসব মাথায় রেখেই আলোচনা হচ্ছিল। ইয়াহিয়া খান কোনো একসময় এও বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী’। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে যান আর পাকিস্তানি হানাদাররা সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ পর্যন্ত ছোটখাটো অনেক ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বাঙালি সেনা ও অফিসাররা খুব অংশগ্রহণ করেনি। ২৫ মার্চ অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্ট তার উপনেতা বা টুআইসি জিয়াউর রহমানকে চট্টগ্রাম জেটিতে বাঁধা অস্ত্রবোঝাই সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে বলে। জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আদেশ মেনে অস্ত্র খালাস করতে চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে যাচ্ছিলেন। তাঁকে সাধারণ বীর জনতার বাধা ঠেলে যেতে হচ্ছিল। তাই যাওয়ার গতি তেমন ছিল না। এ সময় অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টে খবর পৌঁছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ঢাকায় নির্বিচারে হত্যা চলছে। ইবিআরসি ক্যান্টনমেন্টে প্রশিক্ষণরত ১৫০০ রিক্রুটের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়েছে। এসব শুনে খালেকুজ্জামান আর অলি আহমদ ছুটতে থাকেন জিয়াউর রহমানকে ফিরিয়ে আনতে। তাঁকে ফিরিয়ে আনলে একসময় তাঁর অধীন সেনারা পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘোষণা দেয়। ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারে জিয়াউর রহমানকে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি সেখানে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। সেই থেকে জিয়াউর রহমান এবং তাঁর সঙ্গীরা হন মুক্তিযোদ্ধা, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। তার পরের ইতিহাস খুব একটা ছোট নয়। রক্তক্ষয়ী ২৬৬ দিন ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দিজীবন কাটান। তাই ইচ্ছা করলেই তাঁকে বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১ নম্বর নারী মুক্তিযোদ্ধা বলা যাবে না। পেছনের ঘটনার সঙ্গে তাঁকে মেলাতে হবে। সঠিকভাবে মেলাতে না পারলে মুক্তিযোদ্ধা বলে, ১ নম্বর নারী মুক্তিযোদ্ধা বলে বরং বেগম খালেদা জিয়াকেই ছোট করা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধকে হাস্যকর, খেলো করার চেষ্টা হচ্ছে। কাজটা মোটেই ভালো হচ্ছে না।

 

লেখক : রাজনীতিক।

 

 

আরও পড়ুন