বর্ষা যেতেই বায়ুদূষণের শীর্ষে ঢাকা

বর্ষা যেতে না যেতেই ফের বায়ুদূষণের শীর্ষে উঠে এসেছে ঢাকার নাম। বিশ্ব বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়ালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল বিকাল ৪টা ৪০ মিনিটে ঢাকার বাতাস ছিল বিশ্বের ৯৪টি বড় শহরের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত। বাতাসে দূষণের মূল উপাদান পিএম ২.৫ (অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা) ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৫.৫ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া সীমার (বার্ষিক গড়) চেয়ে ১৩ গুণ বেশি। একিউআই (বায়ুমান সূচক) স্কোর ছিল ১৫৬, যা অস্বাস্থ্যকর।

এয়ার ভিজ্যুয়ালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গতকাল বিকালে ঢাকার পরপরই একিউআই ১৪৯ স্কোর নিয়ে দূষণে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল চীনের বেইজিং, ১৩৭ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিল ভারতের দিল্লি। তবে এ বছর খুব একটা বর্ষা না হলেও ছিটেফোঁটা বৃষ্টিতেই গত জুনের মাঝামাঝি থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকার বাতাস ছিল অনেকটাই নির্মল। দীর্ঘদিন পর ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথম একিউআই স্কোর ১৫৭   নিয়ে অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে রাজধানীর বাতাস। পরদিন দূষণ আরও বাড়ে। ২৮ সেপ্টেম্বর স্কোর উঠে যায় ১৮৩-এ। প্রতি ঘনমিটার বাতাসে দূষণ উপাদান পিএম-২.৫ ছিল ১১৭.২ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেওয়া নিরাপদ সীমার চেয়ে ২৩ গুণ বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিটনেসহীন লক্কড়ঝক্কড় গাড়ির কালো ধোঁয়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, তদারকির অভাবে নির্মাণবিধি না মেনে কনস্ট্রাকশন কাজ, সড়কে নির্মাণসামগ্রী রাখা, খোলা ট্রাকে ইট-বালু-সিমেন্ট পরিবহন, ইটভাটা, জলাধার কমে যাওয়াসহ নানা কারণে ঢাকায় বায়ুদূষণ বাড়ছে। সন্ধ্যা থেকে দূষণ বাড়তে শুরু করে। রাত যত গভীর হয় ততই বেশি দূষিত হয়ে উঠছে বাতাস। বায়ুদূষণের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ফুসফুসের ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বাতাসে যে পরিমাণ সালফার-ডাই-অক্সাইড থাকে তা পানিতে মিশে চোখে জ্বালাপোড়া করায়। এতে ফুসফুসে প্রদাহ থেকে শুরু করে অনেক ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেয়। ঢাকার দূষণ নিয়ে বারবার উচ্চ আদালতের কঠোর বার্তা সত্ত্বেও নেই কার্যকর ব্যবস্থা। আইনের প্রয়োগ না থাকায় ঢাকার দূষণ এখন অতিমাত্রায় দৃশ্যমান।

 

এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত প্রায়ই দূষিত নগরীর শীর্ষে উঠে আসে ঢাকা। এ সময় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সিটি করপোরেশন কিছুদিন গভীর রাতে সড়কের গাছে পানি ছিটানোর কার্যক্রম হাতে নেয়। এতে দূষণ কিছুটা কমে। অন্যদিকে দূষণ রোধে তখন দুই সিটি করপোরেশন সড়কে নির্মাণসামগ্রী রাখলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেয়। তবে বর্তমানে রাজধানীর প্রতিটি অলিগলিই নির্মাণসামগ্রীর দখলে। এ ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা, ইটভাটা থেকে শুরু করে কোনোটাই নিয়ম মেনে করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বত্র গ্যাস ফিলিং স্টেশন না থাকায় দূরপাল্লার বাস-ট্রাকে তরল জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। প্রতি রাতে এসব বাস-ট্রাক রাজধানীতে ঢুকছে। নির্মাণসামগ্রী, কৃষিপণ্য নিয়ে ঢুকছে হাজার হাজার ট্রাক। ফলে গভীর রাতে রাজধানীর বায়ু সর্বোচ্চ দূষণের কবলে পড়ছে। সেই দূষণ থাকছে দুপুর পর্যন্ত। দুপুরের পর কিছুটা কমে আবার সন্ধ্যা থেকে বাড়ছে। ঢাকার অস্বাস্থ্যকর বাতাস থেকে রক্ষা পেতে গতকাল নগরবাসীকে ঘরের বাইরে শরীরচর্চা না করা, বাড়ির দরজা-জানালা বন্ধ রাখা, বাইরে মাস্ক পরা ও ঘরে বায়ু বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র চালিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছে এয়ার ভিজ্যুয়াল। এয়ার ভিজ্যুয়ালের তথ্যানুযায়ী কোনো এলাকায় বায়ুমান সূচকে (একিউআই) স্কোর ৫০-এর নিচে থাকলে তাকে স্বাস্থ্যকর ধরা হয়। স্কোর ৫১ থেকে ১০০ হলে সহনীয়, ১০১ থেকে ১৫০ বিশেষ শ্রেণির মানুষের জন্য অস্বাস্থ্যকর, ১৫১ থেকে ২০০ হলে অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ খুবই অস্বাস্থ্যকর ও ৩০১ থেকে ৫০০ হলে তা বিপজ্জনক।

আরও পড়ুন