বিতর্কিতদের হাতে নৌকা তুলে দিচ্ছে কারা?

দ্বিতীয় ধাপের আসন্ন ৮৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চান ৪ হাজার ৪৫৮ জন প্রার্থী। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীর পুত্র ও নাতি, বিএনপি নেতা, খুনের আসামি, নারী নির্যাতন মামলার আাসামিও রয়েছে। রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, বিধবা ভাতার কার্ড নিয়ে প্রতারণা এবং গরিবের চাল বিক্রি করে সমালোচিত চেয়ারম্যানরাও আছে।

ইউপি নির্বাচনে অভিযোগ প্রমাণ হলে প্রার্থী বদলাবে আওয়ামী লীগ। নৌকা প্রতীক পাওয়া কোনও প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেলে মনোনয়ন পুনর্বিবেচনা করবে আওয়ামী লীগ। এজন্য ধানমন্ডির কার্যালয়ে অভিযোগ জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে।

গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে সমালোচনার ঝড়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসছে নানা খবর। দুই একটা ঘটনায় দৃষ্টি দেওয়া যাক –

 

আশরাফুল হক নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সেই আশরাফুল হককেই আসন্ন ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তার বাবা সিরাজুল হক উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন। এদিকে, সাবেক ছাত্রদল নেতাকে নৌকার মনোনয়ন দেওয়া ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। তাদের দাবি, স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের মাধ্যমে ছাত্রদলের পদে থেকেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আশরাফুল হক।

ইউরোপে বসেই নৌকা বাগিয়ে নিলেন শাহ আলম। শরীয়তপুর জেলার সদর উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেলেন শাহ আলম মুন্সি। তিনি বর্তমানে ইউরোপের দেশ ইতালিতে বসবাস করছেন। পাশাপাশি তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ রয়েছে। এতে করে ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ইতালি প্রবাসী শাহ আলম মুন্সি গত ৪ বছর ধরে স্থায়ীভাবে ইতালিতে বসবাস করলেও রহস্যজনক কারণে নৌকার মনোনয়ন পেয়ে যান। এই মনোনয়নের পেছনে ঘুরেফিরে এসেছে এক কেন্দ্রীয় নেতার নাম।

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চান্দাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শাহনাজ পারভীনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। শাহনাজ পারভীন তার স্বামী আতাউর রহমানকে বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে তার স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী নৌকার মনোনয়ন পাওয়ায় নাটোরে বিক্ষোভ ও অবরোধ চলছে।

মনোনয়ন পেতে জেলা সাধারণ সম্পাদক আবদুল হাকিম হাওলাদারের স্বাক্ষর জাল করে কেন্দ্রে তালিকা পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম আউয়ালের বিরুদ্ধে। অন্যদিকে ‘ঝামেলা’ এড়াতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা চান না মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলার এমপি-নেতারা। তারা লিখিতভাবে বিষয়টি দলীয় সভাপতিকে জানিয়েছেন।

পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ মো. কাজী আলমগীর ও সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা ভিপি আব্দুল মান্নান যৌথ স্বাক্ষরে শনিবার ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে একটি চিঠি জমা দিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মো. আসাদুল ইসলাম আসাদ পটুয়াখালী সদর উপজেলাধীন মরিচবুনিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। তার আপন বড় ভাই মো. রফিকুল ইসলাম মুন্সি মরিচবুনিয়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম-আহ্বায়ক। এছাড়া আসাদের আপন মামাশ্বশুর মরিচবুনিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক। আসাদের পরিবার ও আত্মীয়স্বজন সবাই বিএনপি মতাদর্শে বিশ্বাসী। তাকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিলে নৌকার বিজয় অনিশ্চিত।

কিন্তু শনিবার রাতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ঘোষিত দল মনোনীত একক প্রার্থীর তালিকায় ছিল মো. আসাদুল ইসলাম আসাদের নাম। এতে জেলা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা হতাশ। বরিশাল জেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগ এবার এমন একজনকে মনোনয়ন দিয়েছে, যিনি অতীতে উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম-আহ্বায়ক এবং সাবেক সহসভাপতি ছিলেন।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য বেশ স্পষ্ট। তারা বলছেন, ইউনিয়ন, থানা/উপজেলা এবং জেলা আওয়ামী লীগের রেজুলেশন এবং বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টে ইতিবাচক পর্যবেক্ষণ থাকলেই নৌকা প্রতীক দেওয়া হবে।

কোনো বিতর্কিত, দাগী সন্ত্রাসী এবং জনপ্রিয়তা নেই এমন ব্যক্তিকে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দেবে না। যারা দুঃসময়ে ছিলেন তারাই বঙ্গবন্ধুর নৌকা পাবেন।

বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন কথা বলে। দল মনোনীত চূড়ান্ত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। গত তিন দিনে তৃণমূল নেতারা এসব অভিযোগ আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন।
লিখিত এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—অর্থের বিনিময়ে বিএনপির নেতা, রাজাকারের সন্তান-নাতি, ইয়াবা ব্যবসায়ী, হত্যা মামলার আসামিসহ বিতর্কিত বিত্তশালীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এতে বঞ্চিত হয়েছেন সৎ, নিবেদিত ও ত্যাগী নেতারা। কেন্দ্রে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার না পাওয়ায় গত রবিবার সকালে ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে পটুয়াখালী জেলার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একটি গ্রুপ বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় তারা প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ‘বিএনপির হাতে নৌকা কেন’ স্লোগান দিতে থাকে।

বগুড়ায় ২০ ইউপি নির্বাচনে নৌকার মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্যে কেউ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত, কারো বিরুদ্ধে হত্যা মামলা, কেউ মানবিক সহায়তার অর্থ আত্মসাত্কারী। আবার কারো বিরুদ্ধে সরকারি গাছ কাটা, মাদক ব্যবসা, বিরোধী দলের সঙ্গে ব্যবসা করাসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। এতে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

রাজাকার পরিবারের সদস্য, বিএনপি নেতা, খুনের আসামিসহ নানা অপকর্মে জড়িতরাও ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে। ‌অনেক জায়গায় তারা সফলও হয়েছে। অনিয়ম করে ‘অভিযুক্ত’ বা ‘অজনপ্রিয়’ ব্যক্তিদের নাম কেন্দ্রে পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে বিস্তর। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জন্য বঞ্চিত হচ্ছে দলের ত্যাগী নেতারা। এইসব বিতর্কিতদের হাতে কিভাবে নৌকা যাচ্ছে, কারা নৌকা তুলে দিচ্ছে তাদের হাতে? বিতর্কিত প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার পাশাপাশি যারা এইসব বিতর্কিতদের নাম কেন্দ্রে সুপারিশ করে পাঠালো তাদেরকে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হোক।

লেখক: সম্পাদক, বিবার্তা২৪ডটনেট।

 

আরও পড়ুন