মানুষ মুখে হয়ত বাহবা দেবে, পেছনে একটা গালিও দেবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দুর্নীতি করে টাকা কামানো এটা কারও কারও রোগে পরিণত হয়েছে। কারণ টাকা পয়সা বানাতে থাকলে বানাতেই থাকে। সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হবে। কারো ভোগ-বিলাসের জন্য না। কেউ অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করবেন। বিলাসবহুল জীবনযাপন করবেন। আর যে সৎভাবে জীবনযাপন করবে, যে সাদাসিধা জীবনযাপন করবে, তার জীবনটাকে নিয়ে সে কষ্ট ভোগ করবে, এটা কিন্তু হতে পারে না। গতকাল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলন উদ্বোধন করে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ কেউ দুর্নীতি করে টাকা-পয়সা বানাতে থাকলে বানাতেই থাকে। কিন্তু ওই টাকার ফলে ছেলে-মেয়ে বিপথে যাবে, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা নষ্ট হবে, মাদকাসক্ত হবে, তা দেখারও সময় নেই। টাকার পেছনে ছুটছে তো ছুটছেই আর নিজের পরিবার ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে। এই ধরণের সামাজিক অবস্থা আমরা চাই না। আমরা চাই, সৎ পথে কামাই করে যে চলবে, সে সম্মানের সঙ্গে চলবে। যে সৎ পথে কামাই করে থাকবে, সে সমাজে সম্মান পাবে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, চোরা টাকা, অবৈধ টাকা দুর্নীতির টাকা অবৈধভাবে উপার্জনের টাকা দিয়ে যতই বিলাসিতা করুক, মানুষ মুখে হয়ত বাহবা দেবে, পেছনে একটা গালিও দেবে-এরা দুর্নীতিবাজ-চোর। সেই গালিটা হয়ত শোনা যাবে না, বোঝা যাবে না। কিন্তু সেই গালিটা খেতে হবে। এই কথাটা মনে রাখতে হবে। তিনি বলেন, জাতির পিতা সারাজীবন সাদাসিধা জীবন যাপন করে গেছেন। কাজেই তার আদর্শের সৈনিক, তাদের সেইভাবেই চলতে হবে। তিনি এ দেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের কথা ভেবেছেন। তাদের কিভাবে সুন্দর জীবন দেবেন, এদেশের মানুষের ভাগ্য কিভাবে গড়ে তুলে প্রত্যেকটা মানুষ যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে সেটার জন্যই সারাটা জীবন সংগ্রাম করেছেন বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি বলেই গত এক দশকে আজকের বাংলাদেশ বিশ্বে সম্মান পাচ্ছে। আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই বাংলাদেশ বিশ্বে সম্মান ফিরে পেয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে পায়নি। আওয়ামী লীগ আসার পরেই পেরেছে। কাজেই এই সম্মানটা ধরে রাখতে হবে।

আওয়ামী লীগ একটা নীতি আদর্শ নিয়ে গড়ে উঠেছে দাবি করে দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দলীয় প্রধান বলেন,জনগণের কথা চিন্তা করেই প্রথম বিরোধী দল হিসাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ গড়ে ওঠে। কাজেই এই আওয়ামী লীগ এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছে। এই আওয়ামী লীগ জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলার জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছে। কাজেই আমাদের নীতি আদর্শ হচ্ছে, জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করা, জনগণের জীবনমান উন্নত করা। জনগণকে একটু উন্নত জীবন দেয়া যায়, এটি জাতির পিতার সবসময় স্বপ্ন ছিল। তিনি নিজের দিকে তাকান নাই। নিজে কি পাবেন, না পাবেন সে চিন্তা করেন নাই। তিনি মন্ত্রিত্বের পদ ছেড়ে দিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ নিয়েছিলেন শুধু দলকে সুসংগঠিত করবার জন্য। দেশের মানুষের জন্য সকল ধরনের আত্মত্যাগে তিনি সবসময় প্রস্তুত ছিলেন। তিনি বলেন, কাজেই তারই আদর্শের সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মীকে সেই আদর্শ বুকে ধারণ করে জনগণের জন্য কতটুকু করতে পারলাম, সেই চিন্তা করতে হবে। জনগণকে কী দিতে পারলাম সেই চিন্তা করতে হবে। জনগণের কল্যাণ কিসে হবে সেই চিন্তা করতে হবে। আজকে আমরা সন্ত্রাস জঙ্গিবাদ মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছি এবং অব্যাহত রাখব। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান আমরা অব্যাহত রেখেছি। এটাও অব্যাহত থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে বলেন, আজকে বিএনপি নেতারা নির্বাচন নিয়ে কথা বলেন, নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাদের আমি জিয়াউর রহমানের হ্যাঁ-না ভোট ও ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। কেমন নির্বাচন তারা করেছিল। সেখানে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেনি। তাদের কথা-ই ছিল ১০টা হুন্ডা ২০টা গুন্ডা নির্বাচন ঠান্ডা। তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিল জেনারেল এরশাদও। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জিয়াউর রহমান যেমন স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী করেছিল, প্রধানমন্ত্রী করেছিল, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেও সেই একই কাণ্ড ঘটালো। ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া একটা নির্বাচন করেছিল। যে নির্বাচনে বাংলাদেশের কোনও দল অংশ নেয়নি। সেটা একটা সাজানো নির্বাচন ছিল। সারাদেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি নির্বাচন করলো। যেখানে বোধ হয় দুই শতাংশ ভোটও পড়েনি। জনগণের ভোট চুরি করে নির্বাচন করে নিজেকে তৃতীয়বারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা দিলো। তিনি বলেন, ভোট চুরি করে খুনি রশিদকে নির্বাচিত করলো। কর্নেল রশিদ ও মেজর হুদাকে নির্বাচিত করে পার্লামেন্টে বসালো। খুনি রশিদকে খালেদা জিয়া পার্লামেন্টে বিরোধী দলীয় নেতার সিটে বসিয়ে দিলো। কিন্তু খালেদা জিয়া সেই ক্ষমতায় বেশি দিন থাকতে পারেনি। ভোটচুরির কারণে মাত্র দেড় মাস ক্ষমতায় ছিল।

১৫ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত হয়ে, ৩০শে মার্চ তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। শেখ হাসিনা বলেন, ৭৫ এর হত্যাকাণ্ডের বিচার রুখে দিতে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়েছিল। তাদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছিল জিয়াউর রহমান। এরশাদও জিয়ার পথ অবলম্বন করে ক্ষমতা দখল করলো। তার থেকেও একধাপ এগিয়ে খালেদা জিয়া। তিনি ’৯৬ সালে সাজানো নির্বাচন করলেন। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের এমপি-মন্ত্রী করলেন। যারা এভাবে খুনিদের মদত দিতে পারে, তারা গণতন্ত্রের কথা কীভাবে বলে। সরকার প্রধান বলেন, তারা ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি, নির্যাতন করেছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘর ছাড়তে হয়েছে। আমরা গোপালগঞ্জে সে সময় অনেক নেতাকর্মীকে আশ্রয় দিয়েছি। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল তারা। আমাদের নেতাকর্মীদের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়েছে, হাত কেটে নিয়েছে, চোখ তুলে নিয়েছে। নেতাকর্মীদের ভিটেবাড়িতে পুকুর কেটে কলাগাছ লাগিয়েছিল। হাজার হাজার মেয়েকে রেপ করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার নির্দেশেই এগুলো করা হয়েছিল। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াতের কাজ ছিল আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা। বাংলাদেশ যেন কখনও এগিয়ে যেতে না পারে, এটাই ছিল তাদের লক্ষ্য। তাদের আমলে ঢাকা শহরে বিদ্যুৎ ও পানির হাহাকার দেখা দেয়। আজকে ঢাকা শহরের পানির চাহিদা আমরা পূরণ করছি। আমরা আরও পানি শোধনাগার করছি। এখন ঢাকা শহরে কেউ এলে দেখবে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। শহরের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে। পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে নগরবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। কলা খেয়ে রাস্তায় খোসা ছুঁড়ে ফেলা যাবে না।

নিজেদের শহরকে নিজেদেরই পরিষ্কার রাখতে হবে। বিনোদনের জন্য শহরে খেলার মাঠ রাখতে আমরা কাজ করছি। মেয়েদের জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থা করেছি। শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামায়াত সুবিধাভোগী, খাওয়া পার্টি। মানুষকে কিছু দিতে পারে না। ওই সব দল মাটি থেকে গড়ে ওঠেনি, মানুষের কথা তাদের বিবেচনায় ছিল না কখনই। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের থেকে আলাদা। আওয়ামী লীগের নীতি আদর্শ হলো জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন করা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে পথ চলতে হবে। দুর্নীতি থেকে দূরে থাকতে হবে। সৎপথে আয় করতে হবে। অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থে বিরিয়ানি খাওয়ার চেয়ে, সৎপথে নুন-ভাত খাওয়া অনেক সম্মানের।

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উত্তর ও দক্ষিণের আগামী দিনের নেতৃত্বের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন,আগামী দিনে যারা নতুন নেতা নির্বাচিত হবেন বা যারা নেতৃত্বে আসবেন তাদেরকে সেই কথাটা মনে রাখতে হবে এবং আদর্শ নিয়ে চলতে হবে। যে ত্যাগের মহিমা জাতির পিতা রেখে গেছেন। সেই ত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। আজকে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। আমাদের এই ধাপ ধরেই আমাদের উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে আমরা গড়ে তুলব। ২০৪১ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ হবে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। আমরা আরও সামনে কর্মসূচি নিয়েছি। ডেল্টা প্ল্যান ২১০০।

আমরা শত বছরের প্ল্যান দিয়েছি। এই বাংলাদেশ যেন আর কখনো পিছনে ফিরে না যায়। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন সুন্দর জীবন পায়, উন্নত জীবন পায়, সমৃদ্ধ জীবন পায়, সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা এই পরিকল্পনা তৈরি করেছি এবং বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আওয়ামী লীগ জাতির পিতার নেতৃত্বে বাংলার মানুষকে নিয়ে যুদ্ধ করে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে এই দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়ে গেছেন। কাজেই আমাদের কাজ হবে, দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা, দেশের উন্নয়ন করা। আর সেই উন্নয়ন কাজেই আমরা করে যাচ্ছি। আমরা চাই, আমাদের প্রতিটি নেতাকর্মী সেই আদর্শ নিয়ে নিজেকে গড়ে তুলবে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। ইনশাল্লাহ এগিয়ে যাবে। আর কখনো কোন হায়েনার দল এই বাংলাদেশের মানুষের টুঁটি চেপে ধরতে পারবে না, আর তাদের বুকের রক্ত চুষে খেতে পারবে না। আর কোন যুদ্ধাপরাধী, খুনী সন্ত্রাসী, আগুন দিয়ে যারা পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করেছে, তারা আর কখনো এই দেশের জনগণের ভাগ্য নিয়ে ভবিষ্যতে ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। মহানগর সম্মেলনের সফলতা কামনা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন,আপনারা আপনাদের নেতা নির্বাচিত করবেন। সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। মনে রাখবেন জাতির পিতার হাতে গড়া এই সংগঠন। এই সংগঠন দিয়েই তিনি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। কাজেই সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করা এটাই আমাদের লক্ষ্য।

সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসনাতের সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। স্বাগত বক্তব্য দেন মহানগর উত্তরের সভাপতি এ কে এম রহমতউল্লাহ। সাংগঠনিক রিপোর্ট উপস্থাপন করেন উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান ও দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ। সূত্র: দৈনিক মানবজমিন

আরও পড়ুন