মৃত্যু দেখে ভয় নেই বাঙালীর

করোনাভাইরাস সংক্রমণের উচ্চঝুঁকি উপেক্ষা করেই হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছে রাজধানীর রাজপথে। কেউ রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে, কেউ মার্কেটে শপিং মলে ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করে বেড়াচ্ছে। ফলে ঢাকার রাস্তায়, মার্কেটে, শপিং মলে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। দেশে যে মহামারীর বিস্তার চলছে মানুষের ছুটে চলায় তার কোনো চিহ্নই নেই। ঘরে থাকতে চাইছে না কেউ। বরং ঈদ উপলক্ষে ঘর ছেড়ে দলে দলে তারা বাইরে বেরোচ্ছে।  রাস্তায় নেমে যানজটে স্থির হয়ে বসে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অন্যদিকে মহাসড়কে বাড়ি ফেরার মানুষের ভিড়। ফেরিঘাটে ঘরমুখো জনস্রোত। ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে সবাই। এ যেন জীবনের শেষ যাত্রা। এই শপিং, কেনাকাটা ছাড়া যেন জীবন অচল, ঈদ অর্থহীন। রাজধানীতে প্রবেশ ও বের হওয়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিধিনিষেধ সত্ত্বেও ফেরিঘাটে মানুষের ভিড়। পথে পথে চেকপোস্ট বসিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ। ঢাকাকে ঘিরে এই উন্মাতাল জনস্রোত কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। দেশে ঊর্ধ্বমুখী গতিতে ছড়াচ্ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ। গত দুই দিনে করোনায় ২১ জন করে মানুষ মারা গেছেন। বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন আরও অনেকে। এ পরিস্থিতিতে শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার স্বাস্থ্যবিধি তোয়াক্কা না করে বাড়ি ছুটছে ঢাকার মানুষ। অনেকে আবার ঢাকায় ফিরেও আসছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে যানবাহনের গতি রোধ করায় হেঁটে বাড়ি যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ফেরি সাময়িক বন্ধ রাখায় ভোগান্তিতে পড়েছে হাজার হাজার মানুষ। অনেককে ঢাকায় ফেরত পাঠানো হয়েছে। মুন্সীগঞ্জ-শিমুলিয়া ঘাটেও ঈদে ঘরে ফেরা দক্ষিণাঞ্চলগামী মানুষের ভিড়। রাজধানীতে ঢোকা ও বের হওয়ার প্রধান পথগুলোয় পুলিশের কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকায় ভিন্নপথে ফেরিঘাটে জড়ো হচ্ছে ঘরমুখো হাজার হাজার মানুষ। আগে থেকেই সরকারের বিধিনিষেধ থাকলেও কোনো কিছুই পরোয়া করছে না তারা।

করোনা সংক্রমণ ও ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের প্রভাবে নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ী নৌরুটের ফেরিসহ সব নৌযান। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিআইডব্লিউটিএ ফেরি বন্ধ রাখে। তাতেও বন্ধ হচ্ছে না শিমুলিয়া ঘাটে ঘরমুখো মানুষের ঢল। গতকাল সকাল থেকে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাট এলাকায় পারাপারের অপেক্ষায় ছিল দক্ষিণবঙ্গগামী ২১ জেলার হাজার হাজার মানুষ। শিশু-নারীসহ বিভিন্ন বয়সের যাত্রী পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে। ভোরে লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে একটি ফেরি ছেড়ে গেলেও সকাল ১০টা থেকে ঘাটে নোঙর করা দুটি ফেরিতে কয়েক হাজার যাত্রী অবস্থান করছে। সরকারের নির্দেশনা না থাকায় ছাড়তে পারছে না ফেরি দুটি। এদিকে গাদাগাদি করে করোনা ঝুঁকি নিয়েই ছুটছে দক্ষিণবঙ্গের ২১ জেলার ঘরমুখো মানুষ। সি-বোট, লঞ্চ বা ফেরি না পেয়ে শিমুলিয়ার আশপাশ থেকে ট্রলারে করে যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে। মাওয়া ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ মো. হেলাল হোসেন জানান, জেলা পুলিশ, নৌপুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় রয়েছে। নিরাপত্তারর স্বার্থে চেকপোস্টসহ ঘাটে প্রবেশের সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন দিক ঘুরে যাত্রীরা ঘাট এলাকায় ভিড় জমাচ্ছে। এ ছাড়া দেখা গেছে, ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের চারটি পয়েন্টে চেকপোস্ট থাকায়, যাত্রীরা বিভিন্ন লোকাল রাস্তা দিয়ে, লেগুনা, ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও রিকশায় করে ঘাট এলাকায় চলে এসেছে। এতে করোনা ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। শিমুলিয়া ঘাটে ফেরি পারের অপেক্ষায় রয়েছে কয়েক হাজার ঘরমুুখো মানুষ।

মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া অভিমুখে যাত্রীর চাপ বাড়ায় করোনার সংক্রমণ ঝুঁকি কমাতে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ করেছে বিআইডব্লিউটিসি। গত সোমবারও প্রায় আট ঘণ্টা ফেরি বন্ধ ছিল। গতকাল আবার সকাল ৭টায় ফেরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে পাটুরিয়া ঘাটে লোকসমাগম হতে পারছে না। ফেরিসহ অন্যান্য নৌযান বন্ধ থাকায় ঘাটে জড়ো হওয়া লোকজন বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিসি আরিচা অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক জিল্লুর রহমান বলেন, ফেরি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর উভয় ঘাটে থাকা ফেরিগুলোকে মাঝনদীতে রাখা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনায় ফেরি বন্ধ রাখা হয়েছে। ফেরি চলা শুরু হলে জরুরি সেবার অন্তর্ভুক্ত পরিবহনগুলো পারাপার হবে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়ক দিয়ে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নানা পন্থায় ঈদে ঘরমুখো মানুষ বাড়ি ফিরছে। শহরের মার্কেট, বিপণিগুলোয় হাজার হাজার মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে।

গণপরিবহন ও দূরপাল্লার গাড়ি বন্ধ থাকার পরও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক হয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে নানা পন্থায় বাড়ি ফিরছে মানুষ। এতে লকডাউন কার্যকরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা কোনো কাজেই আসছে না। গণপরিবহন না থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ভ্যান, প্রাইভেট কার ও খোলা ট্রাকে করে বাড়ি ফিরছে মানুষ। ঘরমুখো মানুষ বলছে, পরিবারের সঙ্গে ঈদ পালন করতেই কষ্ট করে হলেও বাড়ি ফিরছে তারা।

হেঁটে ঢাকা থেকে বাড়ি ছুটছে হাজার হাজার মানুষ। পুলিশের বিভিন্ন চেকপোস্টে ছোট পরিবহন ফিরিয়ে দেওয়া হলেও হেঁটে চলা এসব মানুষকে ফেরানো যাচ্ছে না। কেউ ৮-১০ মাইল আবার কেউ তার চেয়ে বেশি পথ হেঁটে বাড়ি যাচ্ছে। এর মধ্যে নারী, শিশু, বৃদ্ধও রয়েছে। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত সরঞ্জাম মাথায় নিয়ে দলবলে হেঁটে যাচ্ছে তারা।

গতকাল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার অংশে এ দৃশ্য দেখা যায়। মহাসড়কে গণপরিবহন না চলায় বিভিন্ন পণ্যবাহী গাড়িতে পথ ভেঙে ভেঙে ঈদযাত্রায় ফিরছে তারা। ঢাকা থেকে দাউদকান্দির গৌরিপুর যাবেন আসমা আক্তার। গোমতী সেতু অতিক্রম করা পর্যন্ত তিনি ৭ কিলোমিটার হেঁটেছেন। পরিবর্তন করেছেন একাধিক পরিবহন। কিছু দূর এলেই পুলিশ যাত্রী নামিয়ে গাড়ি ফিরিয়ে দেয়। আবুল হাশেম নামে এক বৃদ্ধ জানান, তিনি কুমিল্লার মুরাদনগর যাবেন। ১০০ টাকার রাস্তা তিনি ৮৫০ টাকায় ভাড়া দিয়েছেন। পরিবর্তন করেছেন ৫-৬টি পরিবহন। পকেটেও বেশি টাকা নেই। বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছা নিয়ে চিন্তায় আছেন। কুমিল্লার হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রহমত উল্লাহ বলেন, ‘ঢাকা বা সীমান্তবর্তী কোনো জেলা থেকে কুমিল্লায় কোনো যাত্রী পরিবহন প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। সন্দেহজনক কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ ও ট্রাক চেকপোস্টে পুলিশ নিয়মিত চেক করছে। যাত্রী নিয়ে পরিবহনগুলো পুলিশের চেকপোস্টের কাছে এসে স্বাভাবিক নিয়মে যাত্রী নামিয়ে ফিরে যাচ্ছে। আমরা পরিবহন আটকাতে পারি কিন্তু হেঁটে চলা মানুষকে কীভাবে আটকাব? তবে মহাসড়কে কোনো যানজট নেই। নেই গাড়ির চাপ।’

আরও পড়ুন