রাজশাহীতে ইএএলজি প্রকল্পের সুবিধাভোগিদের সঙ্গে ডেনমার্ক রাষ্ট্রদূতের মতবিনিময়

রাজশাহীতে কার্যকর ও জবাব দিহিমূলক স্থানীয় সরকার শাসন (ইএএলজি) প্রকল্পের আওতায় সুবিধাভোগিদের সাথে ডেনমার্ক রাষ্ট্রদূতের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সোমবার সন্ধ্যায় নগরীর নানকিং দরবার হলে সভায় জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল এর সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত উইনি এস্ট্রাপ পিটারসেন।

আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন ডেনমার্ক দূতাবাসের সিনিয়র এডভাইজার আমিনুজ্জামান, রাষ্ট্রদূতের অতিথি জেন এস্ট্রাপ পিটারসেন, রাজশাহী জেলা প্রশাসনের উপ-পরিচালক (স্থানীয় সরকার) শাহানা আখতার জাহান, ইউএনডিপি প্রোগ্রাম বিশ্লেষক মোজাম্মেল হক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক প্রদীপ কুমার পান্ডে।

 

উপস্থিত সুবিধাভোগিদের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত উইনি এস্ট্রাপ পিটারসেন বলেন, ডেনমার্ক একটি ট্যাক্স ফ্রি দেশ। ডেনমার্কের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় আপনাদের উন্নয়ন দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। যদিও প্রকল্পের শেষ পর্যায়ের কাজ চলছে, তবুও আমরা এই উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নিতে পেরে খুশি হয়েছি। সুবিধাভোগীদের এই প্রকল্প থেকে যে সুন্দর চর্চা শুরু হলো, তা অব্যাহত রাখার আহবান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক আব্দুল জলিল বলেন, ইএএলজি প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সভা, উন্মুক্ত বাজেট সভা, গণশুনানিসহ বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় রাজশাহী জেলার ৩০টি ইউনিয়ন পরিষদের ২৭০টি ওয়ার্ড সভা করা হয়েছে। এছাড়া সাতটি ইউনিয়ন পরিষদে গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে। গণশুনানিতে ৯৯টি ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। এরমধ্যে ১৬টি তাৎক্ষণিক সমাধান করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলার বাগমারা ও মোহনপুর উপজেলায়ও দুটি গণশুনানি করা হয়।

তিনি আরও বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে নির্বাচনের পরে প্রত্যেক জনপ্রতিনিধি তার ভোটারের কাছে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে দুটি করে ওয়ার্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তাতে অন্তত ২ থেকে ৫ শতাধিক মানুষ উপস্থিত থাকে। সভায় জনগণের চাহিদা অনুযায়ী পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পসহ অন্যান্য কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত হয়েছে থাকে। নাগরিকদের অভিযোগের চাহিদা অনুযায়ী রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য রোধ, স্বাস্থ্য সম্মত স্যানিটেশন, কৃষকের চাহিদা ও কৃষি খাতের উন্নয়নসহ নানা বিষয়ের উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হচ্ছে।

এসময় সুবিধাভোগিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সানোয়ার হোসেন, বাগমারা উপজেলার গোয়ালকান্দি ইউপির চেয়ারম্যান আলমগীর সরকার, গোদাগাড়ী ইউপির চেয়ারম্যান মাসিদুল গনি, গোদাগাড়ী উপজেলার মোহনপুর ইউপির সচিব আব্দুর রহমান, গড়গড়ি ইউপির সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নাদিরা বেগম, বাজুবাঘা ইউপির সংরক্ষিত মহিলা সদস্য ববিতা বেগম, মোহনপুর উদ্যোক্তা মানিক ও আদিবাসী উপকারভোগী রাধামনি মার্ডি।

আদিবাসী উপকারভোগী রাধামনি মার্ডি বলেন, বাবুডাইং এলাকায় কোন টিকা কেন্দ্র ছিল না। কিন্তু ইএএলজি প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা একটি অস্থায়ী টিকা কেন্দ্র পেয়েছি। এখন আমাদের গ্ৰামের সব শিশু টিকা পাচ্ছে। সেই জন্য তিনি ইএএলজি প্রকল্পকে ধন্যবাদ জানান।

এর আগে বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের আয়োজনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনা সভা শেষে রাষ্ট্রদূত ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর ঘুরে দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় মনিগ্রাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দুটি শ্রেণি কক্ষ নির্মান কাজ পরিদর্শন করেন।

সভায় কার্যকর ও জবাব দিহিমূলক স্থানীয় সরকার শাসন প্রকল্পের (ইএএলজি) ডিএফ আবু হেনা মোস্তফা কামালের পরিচালনায় সভাপতিত্ব করেন মনিগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাঘা উপজেলা নির্বাহী  কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা, প্রকল্পের প্রগ্রামার মোজাম্মেল হক, প্রজেক্ট কো-অডিনেটর শরিফুল হক। এছাড়াও আলোচনা সভায় অংশ গ্রহণ করেন ইএএলজি প্রকল্পের বাসস্তবায়নের ফলে উপকারভোগী সদস্য।

প্রকল্পের উপকারভোগী সদস্য মনিগ্রাম ইউনিয়নের মহদিপুর গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, আমার এলাকায় একটি রাস্তার বিষয়ে ওয়ার্ড সভায় তুলে ধরলে প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্কার করা হয়েছে।

এদিকে একই গ্রামে লাবনী বেগম বলেন, আমার অভাবের সংসারের বিষয়ে এক ওয়ার্ড সভায় উপস্থাপনা করা হলে আমাকে একটি সেলাই মেশিন দেন। আমি এতে উপকৃত হয়েছি।

আরেক সদস্য টুলুয়ারা বেগম বলেন, বিধবা ভাতার বিষয়ে তুলে ধরায় আমাকে ভাতার কার্ড করে দেওয়া হয়েছে।

মীরগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামান্না খাতুন বলেন, সে প্রতিদিন ৩ কিলোমিটার পথ যাতাযাতের অর্থ সংকটের বিষয়টি ওয়ার্ড সভায় তুলে ধরলে তাকে একটি বাইসাইকেল দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, এই প্রকল্পের রাজশাহী জেলার ৩০টি ইউনিয়ন ও দুইটি উপজেলা পরিষদকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে পরিষদগুলোতে নিয়মিত গণশুনানি, পরিষদের স্থায়ী কমিটির সভা আয়োজন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জেন্ডার বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি, উন্মুক্ত বাজেট সভা, পরিষদের সঙ্গে স্থানীয় মেয়ে শিক্ষার্থীদের সংলাপ অনুষ্ঠান, উপজেলা পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ, উপজেলা পরিষদ কমিটি সদস্যদের প্রশিক্ষণ, ওয়ার্ড সভা, ইউনিয়ন পরিষদের কর ধার্য ও আদায় সহায়তাকরণ, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের এসডিজি বান্ধব পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন, এসডিজি বিল বোর্ড স্থাপনসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এসব কর্মসূচির কারণে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে সেবার মান পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় নাগরিকরা তাদের পরিষদ কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও বিস্তারিত জানতে পারছেন।

আরও পড়ুন