রুমা আপা আমার জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে

রুমা আপা আমার জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে। আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন সে আমার মুখে ইবাবা তুলে দেয়। অন্যদিকে অভাবের সংসারের দায় সারতে ও নেশা থেকে আমার জীবন রক্ষা করতে বাবা-মা বাল্যকালেই আমাকে বিয়ে দেয়। কিন্তু ততক্ষণে আমি ইয়াবা কুইন। ইয়াবার নেশা আমাকে আরো বেশি করে আকড়ে ধরে। নেশার টাকা যোগাড় করতে গিয়েই এখন রাত-দিন ডাক পড়ে। আমি নষ্ট হয়ে গেলাম। বুঝেও কোনো উপায় নাই।

এখন নেশার টানে ঘর ছাড়তে হয়। চাহিদাও বেড়েছে। বিকাল হলেই ডাক পড়ে এ ঘর ও ঘরে। ওরা ফুর্তি করে আর আমি টাকা নেই, নেশা করি।

গাইবান্ধা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ খান মোহাম্মদ শাহরিয়ার ও সাংবাদিকের কাছে এ কথাগুলো বলছিলেন (আদরী আকতার সপনা) নামের এক কিশোরী স্কুলছাত্রী। গাইবান্ধা সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ইউপির তালুকজামিরা গ্রামের সনজু মিস্ত্রির মেয়ে। ২ ভাই ২ বোনের মধ্যে সে বড়। বাবার টানাটানির সংসারে মোটামুটি চলে যাচ্ছিল। মেয়েকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন তার মা শেফালী বেগম। স্কুলে পড়াশোনার জন্য সব কিনে দিতে হতো। বাবার মিস্ত্রির কাজের অর্থ থেকে পড়াশোনার খরচ যোগাড় হচ্ছিল। ২০১৫ সালে তালুক জামিলা স্কুল থেকে জেএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করে।

কিশোরী বয়সেই বাবা-মা তাকে বিয়ে দেন পাশের গ্রামের ছেলে রেজাউল মিয়ার সঙ্গে। রেজাউল মিয়ার সঙ্গে কিশোরীর সংসার তখনো খুব বেশি জোড়া লাগেনি। খেলার বয়সের নাবালিকা তখনো বিয়ের বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেনি। ট্রেনে স্বামীর সঙ্গে ঢাকা যাওয়ার সময় পরিচয় হয় রুমা নামের এক মেয়ের সঙ্গে। তার বাড়ি গাইবান্ধা শহরের ব্রিজ রোডে। রুমা তাকে তার বাড়িতে থাকতে দেন। বলেন, এখানে থেকে চাকরি খুঁজে নিও। তখনো এই কিশোরী বুঝতে পায়নি রুমার আসল উদ্দেশ্য। রুমা আস্তে আস্তে এই কিশোরীকে ইয়াবা সেবনে আগ্রহী করে। স্বামী রেজাউলকে বলেন আপনি কাজ খুঁজুন। তারপর হবে। দেখতে দেখতে যাত্রাবাড়ীর রুমার বাড়িতে ইয়াবায় আসক্ত করে ফেলেন ওই কিশোরীকে। বাধ্য করে তাকে খারাপ কাজ করতে। ততক্ষণে তার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ভণ্ডুল হয়ে যায়। স্বামী আর ফিরে আসেনি। নেশায় আসক্ত হয়ে কিশোরী গাইবান্ধায় চলে আসে। তারপর নিজের নেশার জন্য যোগাযোগ করেন গাইবান্ধার ইয়াবা বিক্রেতাদের সঙ্গে। হয়ে যান ইয়াবা কুইন। ইয়াবার টাকা যোগাড় করতে সে অসামাজিক কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। পড়াশোনা ও বিয়ের কথা মাথা থেকে বাদ দিয়ে পা বাড়ান অপরাধ জগতের পথে।

নিজেও আসক্ত হয়ে পড়েন এবং নিজেকে ইয়াবা বিক্রেতাদের কাছে তুলে দেন। বাদিয়াখালী, বোনারপাড়া, রিফায়েতপুর, গাইবান্ধা শহর এমনকি বগুড়ায় তার যোগাযোগ সৃষ্টি হয়। তাদের কথামতো ইয়াবা নিয়ে যায় দূর-দূরান্তে কাস্টমারদের কাছে। পাশাপাশি দেহ ব্যবসার রমরমা অবস্থা। ছোট বড়, নেতা, মেম্বর, চেয়ারম্যান বলে কথা নেই। তার কথা হলো টাকার দরকার। টাকা হলে খারাপ হতে দোষ নেই। যৌবন আর টাকা দিয়ে হাতের মুঠোয় নেন এলাকার মাস্তানদের। এলাকায় এই কিশোরীকে সবাই এক নামে চেনে। যৌবন ও জীবন নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। সে কারণে দিনরাত ইয়াবা বিক্রি ও যৌনতা বিলিয়ে দিতে সে কোনো কুণ্ঠা বোধ করতো না। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর ওই কিশোরী জানান, নেশার টাকা যোগাড় করতেই তাকে এ পথে নিয়ে এসেছে। আজ কখন রাত হয় কখন দিন হয় সে বুঝতে পারে না। তবে ডাক পড়লেই কিশোরী গিয়ে হাজির হয় নেশার টাকার জন্য। এ খবর জানাজানি হওয়ার পর তার বাবা সনজু মিস্ত্রি নির্বাক। তার মেয়ে এমন হতে পারে সে ভাবতে পারে না। তার মেয়েকে এ পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে সবার প্রতি সহযোগিতার আহ্বান জানান।

কিশোরী সাংবাদিকের কাছে বলেন, কিছু বুঝে ওঠার আগেই আামি এখন ইয়াবা কুইন। ক’জন আছে আমার মতো ? আমার এ জঘন্য পথ, পাপের পথে কেউ ইচ্ছে করে আসে না। আমাকে যারা সেই রুমা আপুরা আমাকে এ পথে ঠেলে দিয়েছে তাদের প্রতিরোধ করুন। না হলে আমার মতো অনেক কিশোরী মেয়ে আসল পথ হাড়িয়ে ফেলবে। কাল রাতে গাইবান্ধা থানার পুলিশ বাদিয়াখালী ও তালুক জামিরা থেকে অসামাজিক কাজে লিপ্ত থাকার সময় ওই কিশোরীসহ কয়েকজনেকে গ্রেপ্তার করার পর এ রহস্যময় তথ্য বেড়িয়ে আসে।

You might also like