সরে যেতে হচ্ছে জাবি উপাচার্যকেও, রাব্বানীর কমিশন ৮৬ কোটি টাকা

কমিশন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ায় ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদককে পদ ছাড়তে হয়েছে। এই একই অপরাধে এবার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে।
দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে যে, কমিশন কেলেঙ্কারির ঘটনায় জাবি উপাচার্যও দায় এড়াতে পারেন না। একজন শিক্ষকের কাছে ছাত্রনেতারা কীভাবে কমিশন দাবি করে এবং কীভাবে তাদের সঙ্গে শিক্ষকের বৈঠক হয়, এ নিয়ে সরকারি মহল ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, জাবি উপাচার্য একাধিকবার ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মিটিং করেছেন। এ বিষয়টি সরকারের নীতি নির্ধারকদের নজরে এসেছে। ছাত্রলীগের দুই নেতাকে অব্যাহতি দেওয়ার পর এখন জাবি উপাচার্যের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তাকে উপাচার্যের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জাবি ভিসির কাছে রাব্বানী ৮৬ কোটি টাকা কমিশন চেয়েছিলেন!

চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জেরে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য ফারজানা ইসলামের অভিযোগ ছিলো, এই দুই ছাত্র নেতা বিশ্ববিদ্যালয়টির ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের ৬ শতাংশ চাঁদা চেয়েছিলেন। প্রথম দিকে অভিযোগটি অস্বীকার করলেও পরে গণমাধ্যমের কাছে অকপটে স্বীকার করেছেন রা্ব্বানী।

জাবি ভিসির কাছে চাঁদা দাবির বিষয়টি স্বীকার করে সদ্য অব্যহতি পাওয়া ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‌উপাচার্যের কাছে আমরা আমাদের ‘ন্যায্য পাওনা’ দাবি করেছিলাম। ঈদের খরচ হিসেবে ওই টাকা চেয়েছিলাম। তবে টাকার পরিমাণ কতো ছিলো জানাননি এই ছাত্রলীগ নেতা।

এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা প্রদানের জন্য রাব্বানী উল্টো উপাচার্য ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপাচার্য এবং জাবি ছাত্রলীগ সভাপতি জুয়েল রানা। জুয়েল বলেছেন, রাব্বানী গণমাধ্যমকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। আমাদের না জানিয়েই গত ৮ আগস্ট তারা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাত করেছিলেন।

এ বিষয়ে জাবি উপাচার্য ফারজানা ইসলাম বলেন, ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতা গত ৮ আগস্ট তার বাসভবনে এসে চাঁদা দাবি করেছিলেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা তুলে দিতে তারা আমাকে চাপ দেয়। এক পর্যায়ে রাব্বানী বলে যে, এখনকার দিনে ১-২ শতাংশের আলাপ কোথাও নেই। ৪-৬ শতাংশ ছাড়া কি হয়? …এটি একটি বড় প্রকল্প। আপনি আমাদের সহায়তা করলে, আমরাও আপনাকে সহযোগিতা করবো। ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের ৬ শতাংশ মানে হলো প্রায় ৮৬ কোটি টাকা।

ফারজানা ইসলাম বলেন, আমি তাদেরকে বললাম যে, আমি তবে ভবন বানাবো কী দিয়ে, এসব কথা আমার সামনে আর বলবা না..আমি যখন তাদের চাপে ন’তি স্বীকার করতে অপারগতা প্রকাশ করলাম, তখন তারা আমার দিকে চেঁচিয়ে ওঠলো এবং চলে গেলো। এরপর গত ২৬ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন থাকার সময়েও আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে নিজের পছন্দ মতো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিতে চাপ দেন রাব্বানী। এসময় শোভনসহ অন্য ছাত্রলীগ নেতারও রাব্বানীর সঙ্গে ছিলেন।

জাবি উপাচার্য জানান, গত মঙ্গলবার তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে চলমান আন্দোলন, ক্যাম্পাসে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা ৩০ মিনিটের মতো কথা বলেছি। বৈঠকে ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে নিয়ে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- তারা (শোভন-রাব্বানী) তোমাকেও ঝামেলায় ফেলেছে! এ বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে কোনো দু’শ্চিন্তা না করতে বলেছেন বলেও জানান উপাচার্য।

উপাচার্য জানান প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন- জাবি যদি উন্নয়ন প্রকল্প না চায়, তাহলে আমরা সেখানো কোনো অর্থ ছাড় দেবো না। তবে এ নিয়ে সেখানে কোনো আ’ন্দোলন চলতে পারবে না।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অতিরঞ্জিত বলে দাবি করেছেন রাব্বানী।

চিঠিতে রাব্বানী লিখেছেন, জাবি উপাচার্যের স্বামী এবং ছেলে একটি বড় অঙ্কের কমিশন পাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ শাখাকে ব্যবহার করেছে এবং ঈদুল আজহার আগে জাবি ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দিয়েছে। খবরটি প্রকাশ হয়ার পর উপাচার্য তাদের কার্যালয়ে দেখা করতে বলেছিলেন বলেও জানান রাব্বানী।

চিঠিতে রাব্বানী লিখেছেন, আমরা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাত করেছিলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করেছি যে- ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদককে না জানিয়ে তিনি কেনো জাবি ছাত্রলীগকে টাকা দিয়েছেন। তখন তিনি বিব্রত বোধ করেন। সেসময় আমরা তাকে যা বলেছিলাম তা আমাদের ঠিক হয়নি। এজন্য আমরা ক্ষমাপ্রা’র্থী।

যদিও জাবি ছাত্রলীগকে টাকা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন উপাচার্য। তবে গোলাম রাব্বানী জানিয়েছেন ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়ার ঘটনাটি তিনি জাবি ছাত্রলীগের কাছ থেকে জেনেছেন।
রাব্বানী বলেন, জাবি ছাত্রলীগের সদস্যরা এসে আমাকে পুরো ব্যাপারটি জানিয়েছে। পরবর্তীতে আমি এবং শোভন উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করি এবং বলি- ম্যাম, আপনি তাদের টাকা দিয়েছেন। তাহলে আমাদের ন্যায্য পাওনা কই? আমাদের ঈদ বোনাস কই?

তিনি আরও বলেন, জাবি প্রশাসন আমাদের কোনো টাকা না দিলেও, আমাদের নেতৃত্বের নীচে যারা রয়েছে তাদেরকে টাকা দিয়েছে।
এদিকে শনিবার ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। একইসঙ্গে সংগঠনটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে লেখক ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন