স্বাস্থ্য খাতে মালেকদের সংখ্যা কত?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্রাইভার আব্দুল মালেক গ্রেফতার হওয়ার পর এখন প্রশ্ন উঠেছে স্বাস্থ্য খাতে এই মালেকদের সংখ্যা কত? কীভাবে এই মালেক শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন? তৃতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারীর আয়ের উৎস কী? অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু টেন্ডার, কেনাকাটা আর নিয়োগ-বদলির কমিশনেই মালেক আজ বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যখন যেই ডিজি এসেছেন তারই ড্রাইভার হিসেবে চাকরি করেছেন এই ক্ষমতাধর কর্মচারী মালেক। বসের কাছে তদবির করে পেয়েছেন কমিশন। শুধু কমিশনের টাকায় যদি মালেক শতকোটি টাকার মালিক হন, তাহলে যারা কমিশন দিয়েছেন তারা কত টাকার মালিক হয়েছেন? সেই টাকা কোথায়? দেশেই আছে, না বাইরে পাচার হয়ে গেছে?

মালেকের অবৈধ অর্থের অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কয়েক দিন আগে মালেককে দুদকে ডেকেও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এত অবৈধ সম্পদ থাকার পরও কেন মালেককে ছেড়ে দেওয়া হলো? দুদক কেন তার অবৈধ অর্থের সন্ধান পেল না? তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে কিছুদিন ধরে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা মালেকের অবৈধ অর্থের অনুসন্ধান করছিল। সেই অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য থেকেই মালেককে গ্রেফতার করে র্যাব। প্রাথমিক অনুসন্ধানে মালেকের স্ত্রীর নামে দক্ষিণ কামারপাড়ায় দুটি সাততলা বিলাসবহুল ভবন, ১৫ কাঠা জমিতে একটি ডেইরি ফার্ম, ধানমন্ডির হাতিরপুল এলাকায় সাড়ে চার কাঠা জমিতে একটি নির্মাণাধীন ১০ তলা ভবনের সন্ধান পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ব্যাংকে মালেক ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে অঢেল টাকা থাকার তথ্য মিলেছে।

অনুসন্ধানকারী গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালেকদের অবৈধ অর্থের প্রধান উত্স ছিল মেডিক্যালে অবৈধভাবে ভর্তি বাণিজ্য। একজন শিক্ষার্থীকে মেডিক্যালে ভর্তি করিয়ে অবৈধভাবে কোটি টাকার ওপর লেনদেন হয়েছে। এই টাকা সরাসরি চলে গেছে অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতনদের কাছে। আর মালেকরা পেয়েছে কমিশন। যাদের কাছে এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ চলে গেছে তাদেরও অনুসন্ধানের মধ্যে আনার দাবি উঠেছে। এই টাকা বিদেশে চলে গেলে তা ফিরিয়ে আনার দাবিও করেছেন অনেকে।

আগামী জানুয়ারি মাসে অবসরে যাওয়ার কথা মালেকের। গতকাল সোমবার মালেককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু ড্রাইভার নয়, অধিদপ্তরের একশ্রেণীর কর্মচারী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সহকারী পরিচালক এমনকি মেডিক্যাল অফিসারদের অনেকেই এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নয়, নার্সিং অধিদপ্তর, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজসহ সরকারি সবগুলো মেডিক্যাল কলেজেই এখন একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে।

নার্সিং অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সহকারী পরিচালকসহ বেশ কয়েক জন কর্মকর্তা দুর্নীতি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। কয়েক দিন আগে অধিদপ্তরের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার ড্রাইভারকে দুর্নীতির অভিযোগে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এছাড়াও চক্র রয়েছে বিভাগীয় পরিচালক, সিভিল সার্জন অফিস, জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাসা বরাদ্দ, নিয়োগে কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। চিকিৎসকদেরও একটি বাসা নিতে কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাদের ২ লাখ টাকা দিতে হয়। প্রতিটি নিয়োগে দুই থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেন কর্মচারী ইউনিয়নের নেতারা। এক কর্মচারী ইউনিয়নের নেতার কামরাঙ্গীরচরে বহুতল ভবনেরও সন্ধান মিলেছে। এমন অনেক নেতার বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নেতা সরকারি বাসা নিয়ে সেটা ভাড়া দিয়ে নিজে থাকেন বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল মান্নান ইত্তেফাককে বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ৫১টি প্রকল্প রয়েছে। সেখানে শত শত কোটি টাকার কেনাকাটা হয়। অনেক জায়গায় এমন সব যন্ত্রপাতি কেনা হয়, সেগুলো চালানোর দক্ষ জনবল নেই। এতদিন এভাবেই সেখানে কেনাকাটা হয়েছে। এখন আমরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করছি। অযথা যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় একেবারেই কোনো অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে না। এই ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরাও এসব বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, যারাই স্বাস্থ্যের দায়িত্বে এসেছেন তারা কেনাকাটার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। কারণ যত বেশি কেনাকাটা তত বেশি কমিশন। দেশের বহু হাসপাতালে এমন সব যন্ত্রপাতি আছে সেগুলো চালানোর কোনো লোক নেই। কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি দেশে এনে ফেলে রাখা হয়েছে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মো. খুরশিদ আলম বলেন, ‘এমন মালেকের খোঁজ আমরাও পাচ্ছি। এদের চিহ্নিত করতে আমরা কাজ শুরু করেছি। এদের কেউ যাতে পার না পেয়ে যায় সেদিকে আমরা লক্ষ্য রেখেই তদন্ত করছি। যাদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ আছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ পার পেয়ে যেতে পারবে না।

র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাফী উল্লাহ বুলবুল বলেন, ‘আমরা মালেকের বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান করে যে তথ্য পেয়েছি, সেটাই রীতিমতো ভয়াবহ। একজন ড্রাইভার কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন সে বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি একজন ড্রাইভার অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রও কীভাবে রাখে, সে তদন্তও হচ্ছে।’

 

আরও পড়ুন