হবিগঞ্জে ভূয়া নারী সাংবাদিক গ্রেফতার

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও সিনিয়র সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে মানহানিকর মিথ্যা স্ট্যাটাস, নারীদেরকে পুরুষ সেজে যৌন হয়রানি এবং ফেসবুকে বিভিন্ন ভূয়া একাউন্ট খোলা এবং বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগে ভূয়া সাংবাদিক ফরজুন আক্তার মনির জামিনের আবেদন আদালত না মঞ্জুর করে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন। বুধবার সকালে হবিগঞ্জ আদালত জামিন শুনানিতে ভূয়া সাংবাদকি মনির জামিন না মঞ্জুর করে বলেন আগামী সপ্তাহে তার রিমান্ডের আবেদনের শুনানি হবে।

মামলার বাদী পক্ষের শুনানিতে অংশ নেন হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শাহ ফখরুজ্জামান, সাবেক পিপি এডভোকেট আকবর হোসেন জিতু, এড. মঞ্জুর উদ্দিন শাহীন, ও এড. আবু বক্কর সিদ্দিক তাহিদ প্রমুখ। এবং আসামীপক্ষে ছিলেন হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি এড.আবুল ফজল ও এড. আবুল মালিক হৃদয় প্রমুখ।

ডিজিটাল নিরাপত্তা ও তথ্য প্রযুক্তি আইনে নবীগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ উক্ত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পায়।বেশ কিছুদিন অভিযান চালানোর পর অবশেষে গত রবিবার (২২ সেপ্টেম্বির) বিকেলে নবীগঞ্জ থানার এসআই শামসুল ইসলাম, এসআই শমীরণ দাশের নেতৃত্বে একদল পুলিশ শহরতলীর জে.কে উচ্চ বিদ্যালয় পয়েন্ট থেকে তাকে গ্রেফতার করে। এসময় তার কাছ থেকে ২টি এনআইডি কার্ড, বিভিন্ন সংস্থার বেশ কিছু ভূয়া আইডি কার্ড, ৪টি মোবাইল ফোন, ০৫ টি সিম কার্ড, একটি কলম ক্যামেরা ,মোবাইলে শতাধিক পর্ন ভিডিও ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়।

এদিকে গত সোমবার উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নবীগঞ্জ উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য গাজী মোঃ শাহনেয়াজ মিলাদ, উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল হক চৌধুরী সেলিম, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নাজমা বেগম, ওসি মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন এবং বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানবৃন্দসহ কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রতারক ফরজুন আক্তার মনি কর্তৃক নবীগঞ্জের সিনিয়র সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকের মাধ্যমে মানহানিকর স্ট্যাটাস দেয়ায় নিন্দা প্রস্তাব গৃহিত হয়। এছাড়া বহুরুপী প্রতারক ফারজানা আক্তার মনি ওরফে ফরজুন আক্তার মনির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সর্ব সম্মতিতে সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় ।

অভিযোগ উঠেছে, ওই বহুরুপী নারী মনি দীর্ঘদিন যাবত নিজেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোকজনের সাথে প্রতারণা করে আসছিল। তার টার্গেট ছিল- নারী জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা ও স্কুল-কলেজের ছাত্রী। সে নারী বেশে থাকলেও নিজেকে পুরুষ দাবী করে নারীদেরকে বিভিন্ন অশালীন ম্যাসেজ দিয়ে যৌন হয়রানি করতো। এসব ম্যাসেজের স্ক্রীণশট প্রকাশ হওয়ায় মনি নারী না পুরুষ এনিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতারক মনির এই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে কেউ প্রতিবাদ করলেই মনি তার ফেইসবুক আইডিতে বিভিন্ন রকম হুমকি ধামকিমূলক ও মানহানিকর স্ট্যাটাস/পোস্ট দিয়ে তাকে অপদস্ত করতো।

অভিযোগ রয়েছে- নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থগ্রামের জহুর উদ্দিনের পালিত মেয়ে ফয়জুন আক্তার মনি বহু রূপের অধিকারী। বিশেষ করে নিজেকে সে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আত্মীয় এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যের মেয়ে আবার কখনও ভাতিজি পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করতো। কিছুদিন পূর্বে নবীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সমকাল প্রতিনিধি এম.এ আহমদ আজাদ ও সাংবাদিক এম. মুজিবুর রহমান এর বিরুদ্ধে তার ফেইসবুক আইডিতে একাধিক মানহানিকর স্ট্যাটাস দিলে সাংবাদিক আজাদ বাদী হয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও তথ্য প্রযুক্তি আইনে নবীগঞ্জ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ তদন্তে নামে। এক পর্যায়ে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে অভিযোগটি এফআইআর হিসেবে রুজু করে। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করেন পুলিশ। ভূয়া সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন গ্রেফতারের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, গ্রেফতারকৃত মনির বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। সে অনেক সম্মানিত ব্যক্তি,সুশীল সমাজ এবং সরকারী কর্মকর্তাদের সম্মানহানী করে আসছে ফেসবুকে। ওসি আরো বলেন- নবীগঞ্জে অনেক ভূয়া সাংবাদিক রয়েছে। তারা সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে নানা অপকর্ম করছে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

মামলার বিবরণে জানা যায়, প্রতারক ফরজুন আক্তার মনি পুরুষ সেজে নবীগঞ্জের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নাজমা বেগম ও সাবেক উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সেলিনা পারভিন এবং বিভিন্ন নারী ইউপি সদস্যসহ আরও অনেককে অশ্লীল ম্যাসেজ পাঠিয়ে যৌন হয়রানি করে আসছিল। সে নিজেকে সাংবাদিক ও এলিট পার্সন হিসেবে পরিচয় দিয়ে অনেকের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলে পরবর্তীতে তাদেরকে যৌন হয়রানী করতো। বিশেষ করে প্রবাসীদের বিভিন্ন ম্যাসেজ দিয়ে নানান উপহার সামগ্রী হাতিয়ে নিতো।

এ বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিক আজাদ কিছুদিন পূর্বে মনিকে ডেকে বিষয়গুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন এবং এ ধরনের কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার জন্য পরামর্শ দেন। এতে সে ক্ষুব্ধ হয়ে সাংবাদিক আজাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। মনি সাংবাদিক আজাদের বিরুদ্ধে তার ফেইসবুক আইডিতে নানারকম মানহানিকর স্ট্যাটাস দিয়ে তার ও তার পরিবারের মান-সম্মান হানি করে আসছিল।

অনেকেই জানান- ফরজুন আক্তার মনি বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করে প্রতারণা করতো এবং এমন কি ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতা ও প্রশাসনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করছিল।সে দাদন ব্যবসার সাথেও জড়িত ছিল। এর ফলে অল্প সময়ে সে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যায়।
তার নানা অপকর্মের বিষয়ে মানুষ জানলেও নিজেকে সে সমাজে ক্ষমতাধর হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কারণে ভয়ে কেউ তার অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস করতেন না। অবশেষে নানা অপকর্মের হোতা ও একই অঙ্গে বহুরূপী ফরজুন আক্তার মনি পুলিশের খাচাঁয় বন্দি হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তার গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকেও অনেককেই আনন্দ উল্লাস করে পোস্ট দিতে দেখা গেছে।

আরও পড়ুন