২৬ বছর আগে রোজ মনে হতো, মরে যাই!

নাট্যাঙ্গনের প্রিয় দুই মুখ বৃন্দাবন দাস ও শাহনাজ খুশি দম্পতি বিয়ে করেছিলেন ১৯৯৪ সালের ১৯ জানুয়ারি। এর আগে প্রায় নয় বছর প্রেম করেছেন তারা। যখন তারা বিয়ে করেছিলেন, তখন আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। তবে বর্তমানে দিব্য জ্যোতি ও সৌম্য জ্যোতি, দুই ছেলেকে নিয়ে তাদের সুখের সংসারে আর কমতি নেই। তবে আজকের দিনে এসেও পেছনের দিনগুলোর কথা ভোলেননি তারা। বিবাহবার্ষিকীতে সে সময়েরই স্মৃতিচারণ করেছেন গুণী এ অভিনেত্রী।

‘ভালো না বাসার ২৭ বছর। না হলুদ, না মেহেদি, না কোনো বিয়ের গয়না, শাড়ি, না কোনো মেহমান, গান বাদ্য! এমনকি নিজেরাও সেদিন নানান উৎকন্ঠায় সারাদিন কিছু খাইনি! বোকা বয়সের বোকা সিদ্ধান্তে, আকাশ সমান বোকা করে দিয়েছিল দুজনকেই।

চারপাশের স্বজনদের তিরস্কারে, অভিযোগে,আক্রোশে থেমে গেলাম আমরা। হিসাব করে কিছু করার বুদ্ধি-বয়স ছিল না! সেই হিসাব করলে কি সারা পৃথিবীর সব মানুষ একদিকে রেখে কেউ অনিশ্চিত একটা পথ বেছে নেয়। সেই দুর্বার কাছে আসার দিন থেকে ভালোবাসতে ভুলে গেলাম! মুখরা-আড্ডা প্রিয় আমরা নিশ্চুপ হয়ে গেলাম।

 

আমাদের অনেক কথা হয়েছে, নাটক-থিয়েটার, দেশ-রাজনীতি, চাল-ডাল, বাসা ভাড়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু ভালোবাসা নিয়ে একটি কথাও নয়! অপরাধী সে ভালোবাসাকে বাক্সবন্দি করে বাঁচতেই হবে-এমন পণ করে কেবলই ছুটেছি দুজন। অবর্ণনীয় কাঁটা দুহাতে তুলে, ঘর বাঁধতে-বেঁচে থাকার জন্য!

আমাদের মতের অমিল অনেক হয়েছে। কিন্তু মতবিরোধ হয়নি। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে সংশয় হয়েছে অনেক, কিন্তু কখনো সংঘাত হয়নি! প্রিয় সম্পর্কগুলোর এতো বেশি অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা আমাদের জন্য বরাদ্দ ছিল যে, আজ আর কোনো অচেনা কিছুতেই চমকে উঠি না!

অবস্থা দৃষ্টে, আমাদের স্বপ্নগুলো সব বদলে গেল! অনেক সময় পারও হয়ে গেছে। কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল খাতা আঁকতে দিলে, তার মধ্যে চিঠিসহ ফেরত দেওয়া গল্প বা কবিতার বই উপহার দিলে, তার মধ্যে চ্যাপটা করা শুকনো গোলাপ ফুল দেওয়া চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় এক টাকার শঙ্খের আংটি ভরা প্রেম দেওয়া- এসবের কোনোটাই আর কাছে আসার পর কোনোদিন হয়নি। বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় ফর্দে ফর্দে ভাগ করে দিতে হয়েছে ধৈর্য্য, শক্তি, সুন্দর যৌবনের উচ্ছল সব আয়ু! আর অপেক্ষা করেছি, শক্তি নিয়ে নতুন করে বেঁচে উঠবার।

এখন আমাদের খেয়ে পরে বেঁচে থাকার কুৎসিত ব্যস্ততা কমেছে। এখন অনেক ভালোবাসার সময় হয় আমাদের। আমরা রোজ একই ওষুধের পাতা থেকে অ্যাসিডের ট্যাবলেট খাই; সুস্থ থাকার চিন্তায় খুব ভোরে হাঁটতে যাই। বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগ কাঁধে আর দৌড়াতে হয় না বলে চা খাওয়ার পরে, অনেকক্ষণ কথা হয়। একই ব্র্যান্ডের কালার দিয়ে উঁকি দেওয়া সফেদ চুল ঢাকি। একই ডাক্তার দেখিয়ে চশমার পাওয়ার বদলায়। ক্লান্তি এসে দুজনের চোখের বসার গল্প করে দুজনেই হাসি।

তোমার আমার পথচলা এতো ভয়ংকর না হলে, কুসুমে আঁকা স্বপ্নগুলো কেমন হতো সেটা বলি। মাঝে মাঝে দুজন কিছু না বলে খুব কাঁদি এবং কিছু না বলার পরও আমরা দুজনায় জানি, আমরা কেন কাঁদছি! আমাদের এখন ভালোবাসার অনেক সময়, শুধু বেঁচে থাকার সময় বেশিরকম কমে গেছে!

২৭ বছর তবুও কেটে গেল, এ কংকর বিছানো পথে! দ্রোহ, যুদ্ধে, প্রতিজ্ঞায়, মমতায়। কোনো গিফট, কোনো আনুষ্ঠানিকতা দরকার হয়নি। শুধু আমরা জানি আপনজনহীন হয়ে পড়ার এইদিন। নিঃস্বতা অবধারিত হলে; সেটাকে উৎসব মনে করায় ভালো। তুমি এবং আমি, ২৭টা বছর, এ নিঃস্বতার উৎসব করি শক্তি ভরে।

সময় আমাদের দুজনার জীবনের কাঙ্ক্ষিত গল্পটা নিষ্ঠুরভাবে বদলে দিয়েছে! কিন্তু ভালোবাসাটা বদলাতে পারেনি। যে ফুলের মালাটা গলায় পরা, এটাও ২৩ বছর পর, সন্তানদের উৎসাহে, উপহারে পরা! তাতে কিছু ফারাক পড়েনি।

২৬ বছর আগে রোজ মনে হতো মরে যাই! এখন রোজ মনে হয় অনেকদিন বেঁচে থাকি। কষ্টকর সেই পথটা দুজনে রোজই দেখে আসি! হোক আশীর্বাদহীন, তবুও এ পথচলা যেন থেমে না যায়। ভালোবাসাটুকু যেন গতি না হারায় আমাদের, জীবনের শেষদিনেও…।’

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

 

 

 

আরও পড়ুন