থমকে গেছে ঢাকা উত্তর সিটি

 ৮ জানুয়ারি২০১৮ সোমবার ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

জমি না পাওয়ায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে সদ্যপ্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের নেওয়া ঢাকার সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউলুপ নির্মাণ প্রকল্প। শুধু এই প্রকল্প নয়, উচ্ছেদ করা তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড দখলে নিচ্ছেন পুরনো দখলদাররা। এ ছাড়া নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ সম্পন্ন করা নিয়েও শঙ্কায় পড়েছে আনিসুল হকের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা ৪২ প্রকল্প। উন্নয়ন প্রকল্প আর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের ধীরগতিতে থমকে গেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। আর উত্তরের এই প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও। নগরবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, নগর সরকারের বিকল্প নগর সরকারই। সিটি করপোরেশনের ভিতরের জায়গায় ইউলুপ করার জন্য যদি অন্য প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে বা টাকা দিয়ে জায়গা কিনতে হয়, এর চেয়ে দুর্দশার আর কিছু হতে পারে না। ৩৪ লাখ মানুষের ভোটে মেয়র নির্বাচিত হয়। অথচ খাজনা তোলা আর শহর ঝাড়ু দেওয়া ছাড়া তার কোনো অধিকার নেই। ৫৪টি সেবা সংস্থা আর ৭টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কোনো মেয়রেরই শহরের উন্নয়ন কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, আনিসুল হকের নেওয়া প্রকল্পগুলো তার ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়। এ শহরের মানুষের দুর্দশা লাঘব করে জীবনযাত্রা সহজ করার জন্য। তাই এ প্রকল্পগুলো নিয়মিত তদারক করতে হবে এবং মেয়াদের মধ্যে শেষ করতে হবে।  অনিশ্চয়তায় ঢাকার ‘ইউলুপ’ প্রকল্প : জমি না পাওয়ায় অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে রাজধানীর সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউলুপ নির্মাণ প্রকল্প। ঢাকার যানজট কমাতে হাতে নেওয়া এ প্রকল্পে র‌্যাব-১ অফিস এবং রাজলক্ষ্মী বাদে বাকি ইউলুপগুলোর কাজ বন্ধ রয়েছে। এ প্রকল্প আর এগোবে কিনা, তা নিয়েই এখন সন্দিহান এর উদ্যোক্তা ও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। সরেজমিন সাতরাস্তা, তেজগাঁও, মহাখালী এবং বনানী এলাকায় দেখা যায়, প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। এসব জায়গায় প্রকল্পের সাইনবোর্ড থাকলেও কোনো শ্রমিক বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাউকে পাওয়া যায়নি। শুধু উত্তরার র‌্যাব-১ অফিসের সামনে এবং রাজলক্ষ্মী এলাকায় দুটি নির্মাণ কাজ চলছে। দুই বছর আগে প্রায় ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি ‘ইউটার্ন’ নির্মাণের এই উদ্যোগ নেন উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। সাতরাস্তা, কোহিনূর কেমিক্যাল মোড়, মহাখালী বাস টার্মিনাল, মহাখালী ফ্লাইওভার, বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি, বনানী কবরস্থান, বনানী ওভারপাস, শ্যাওড়া, কাওলা, উত্তরার র‌্যাব-১ অফিসের সামনের সড়ক এবং জসিমউদ্দীন সড়কের সামনে এই ইউটার্নগুলো নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। সিটি করপোরেশনের এ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের ১ দশমিক ৩৬ একর, বাংলাদেশ রেলওয়ের দশমিক ২২ একর, ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের দশমিক শূন্য নয় একর এবং জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের দশমিক শূন্য ছয় একর জমি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়বে। এ প্রকল্পের ব্যয়ের ২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকার মধ্যে ১৯ কোটি ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা সরকারের দেওয়ার কথা। আর বাকি ৪ কোটি ৯৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে জোগানোর কথা।

এসব ইউটার্ন নির্মাণের জন্য ২০১৫ সালের শেষ দিকে পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠায় উত্তর সিটি করপোরেশন। সেখানে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে কাজ শুরু করে ২০১৭ সালের জুনে শেষ করার কথা থাকলেও অনুমোদন পেতেই গত বছরের ২৭ মার্চ পেরিয়ে যায়। এরপর প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গত ২৯ অক্টোবর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এসএম কনস্ট্রাকশনসকে কার্যাদেশ দেয় সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। নভেম্বরের শুরুতে ঠিকাদার কাজ শুরু করলেও জমি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এরপর দুই মাস পার হয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি প্রকল্পটির। এ ব্যাপারে প্রকল্প পরিচালক মো. মাহবুব আলম  বলেন, ‘সড়ক ও জনপথের কাছ থেকে এখনো জমি বুঝে পাইনি। মেয়র আনিসুল হক থাকতে তারা আমাদের বলেছিলেন, তাদের জমি আমরা ব্যবহার করতে পারব। কিন্তু এখন সড়ক ও জনপথ বলছে, জমি কিনে নিতে হবে। ফলে পুরো প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, এ প্রকল্পের জটিলতা নিরসনে গত ৩০ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে চিঠি দিয়েছে সিটি করপোরেশন। এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।

দখল হয়ে যাচ্ছে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড : তেজগাঁও সাতরাস্তার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট দখল করে তৈরি করা হয়েছিল ট্রাকস্ট্যান্ড। নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়েও মেয়র আনিসুল হক সেটি উচ্ছেদ করেছিলেন। কিন্তু আনিসুল হক অসুস্থ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আবার ট্রাক রাখতে শুরু করেন মালিক-শ্রমিকরা। প্রথমে রাতে ট্রাক রাখা শুরু হয়। এখন রাত পার হয়ে সকাল গড়িয়ে দুপুর গেলেও সরানো হয় না ট্রাক। গলি থেকে শুরু করে মূল রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয় সারি সারি ট্রাক। এ এলাকার বাসিন্দা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, এই ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করার দাবিতে আমরা অনেক দিন সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের কাছে ঘুরেছি। অবশেষে আনিসুল হক ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করে পুরো এলাকা যানজটমুক্ত করেছিলেন। কিন্তু মেয়র অসুস্থ হওয়ার কথা শুনতেই এ রাস্তায় আবার ট্রাক রাখা শুরু হয়। এখন আবার আগের অবস্থাতেই চলে যাচ্ছে। সবার চোখের সামনে এ দখল চলছে অথচ কর্তৃপক্ষ নীরব। শুধু তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড নয়, দখল হয়ে যাচ্ছে রাজধানীর ফুটপাথগুলোও। উত্তর সিটি করপোরেশন উচ্ছেদ অভিযান চালালেও পরের দিনই নির্ধারিত জায়গায় বসে যাচ্ছে হকাররা।

থমকে গেছে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম : ‘গ্রিন ঢাকা ক্লিন ঢাকা’ ক্যাম্পেইন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মেয়র আনিসুল হক। এ জন্য একদিকে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আর অন্যদিকে গাছ লাগিয়ে সবুজ নগরী তৈরিতে কাজ করছিলেন তিনি। কিন্তু মেয়রের মৃত্যুতে থমকে গেছে এ কার্যক্রম। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও রাস্তার মোড়ে থাকছে ময়লা। গতকাল দুপুর ২টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার ফলের দোকানের পাশে দেখা যায় স্তূপাকার করা ময়লা-আবর্জনা। আড়াইটার দিকে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এসে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় ময়লা। সকালের মধ্যে ময়লা নিয়ে যাওয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। এভাবে দিনভর দুর্গন্ধে নাক চেপে চলাচল করতে হচ্ছে এই এলাকার বাসিন্দা, যাত্রী এবং দোকানদারদের।  

উত্তরের প্রভাব পড়েছে দক্ষিণেও : দুই সিটি করপোরেশনে উন্নয়ন কাজ চলছিল সমানতালে। কিন্তু মেয়রের মৃত্যুতে থমকে গেছে উত্তর সিটির উন্নয়ন। মেয়রের অনুপস্থিতিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। যানজট নিরসনসহ রাজধানীর সমস্যা নিরসনে নেওয়া প্রকল্পগুলোতে তৈরি হচ্ছে সমন্বয়হীনতা। উত্তরের এ প্রভাব পড়ছে দক্ষিণেও। যানজট নিরসনে নেওয়া প্রকল্পগুলো সফলতার মুখ দেখলে উত্তর এবং দক্ষিণ উভয় সিটি এলাকার যানজট নিরসন হতো।

দেখার কেউ নেই : প্রকল্পের কাজ শুরু হলে শুধু উদ্বোধন করেই দায়িত্ব শেষ করতেন না আনিসুল হক। হঠাৎ উপস্থিত হয়ে খোঁজ নিয়ে আসতেন উন্নয়ন কাজের পরবর্তী অবস্থা। শুনতেন এলাকাবাসীর অভিযোগ ও দাবি। কিন্তু মেয়র না থাকায় এখন জোড়াতালি দিয়ে চলছে রাস্তা-ড্রেনের উন্নয়ন কাজ। সিমেন্টের বদলে দেওয়া হচ্ছে বালি আর তিন নম্বর ইট দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ড্রেন। মিরপুর সেনপাড়া এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, সেনপাড়া পর্বতা এলাকার কেয়ারীমুনের পাশে স্যুয়ারেজ লাইন এবং রাস্তায় উন্নয়ন কাজে তিন নম্বর ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। বসানো হচ্ছে ভাঙাচোরা পাইপ। বালি দিয়ে গর্ত ভরাট করার কথা থাকলেও আগের তুলে রাখা মাটি দিয়ে দায়সারাভাবে শেষ করা হচ্ছে কাজ। কাজের শুরু থেকে এসব অনিয়মের কথা ঢাকা উত্তর সিটির-৪ নম্বর অঞ্চলে জানালেও কর্তৃপক্ষের কেউ এসে কাজ তদারকি করেনি। এ ব্যাপারে ডিএনসিসির অঞ্চল-৪ এর নির্বাহী কর্মকর্তা গুল্লাল সিংহ বলেন, এ প্রকল্পগুলোর কাজ কিংবা এর ঠিকাদার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। এর সব দায়িত্ব ডিএনসিসির প্রকল্প পরিচালকের।

Related News

থমকে গেছে ঢাকা উত্তর সিটি

 ৮ জানুয়ারি২০১৮ সোমবার ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুনঅনলাইন ডেস্কঃজমি না পাওয়ায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে সদ্যপ্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের নেওয়া ঢাক..

Detail