বরফমানব ওটজি

 ১৪ জানুয়ারি২০১৮ রবিবার ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

অনেক নামেই পরিচয় তার। কেউ বলেন ওটজি, আবার কেউ বলেন দ্য আইসম্যান। বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় বরফমানব। ১৯৯১ সালে বিজ্ঞানীরা অস্ট্রিয়া-ইতালি সীমান্তে ওটজাল আল্পস নামক স্থান থেকে হিমায়িত অবস্থায় পাঁচ হাজার ৩০০ বছরের পুরনো একটি মমি উদ্ধার করেন। আর সে জায়গার নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছিল ওটজি দ্য আইসম্যান। ওটজির মমিটিই এখন পর্যন্ত ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন মমি হিসেবে গণ্য করা হয়।

যুগান্তকারী এই আবিষ্কারের পর এই বরফমানবের জিনোম আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। তাদের দাবি ছিল এর মাধ্যমে বর্তমান যুগের মানুষের সঙ্গে তাদের যোগসূত্রের হদিস মিলবে। এছাড়াও, জটিল সব রোগের উদ্ভবের কারণও জানা যাবে এর ফলে। এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা অনেক দূর এগিয়েছেন বটে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের সেই গবেষণা ছাপিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়ে উঠেছে বরফমানব ওটজির ভয়ঙ্কর অভিশাপের গল্প। অনেকগুলো মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ওটজি। সত্যি কী প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া এই মমিটি অভিশপ্ত ছিল?

আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগের কথা। ১৯৯১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জার্মানির নুরেমবার্গ থেকে আসা দুই পর্যটক হেলমুট আর এরিকা সিমন হিমালয় পর্বতমালা আল্পসে আরোহণ করছিলেন। হঠাৎ সেখানে এক আদি মানবের সন্ধান পান তারা। অবশ্য জীবন্ত নয়, একটি মমি। তারা ভেবেছিলেন, এই দেহটি হয়তো কোনো হতভাগ্য পর্বতারোহীর হবে যে পাহাড়ে চড়তে গিয়ে মারা গিয়েছিল। পরের দিন একজন পুলিশ অফিসার ও পর্বত এলাকার রক্ষণাবেক্ষণকারী মিলে ড্রিল মেশিন ও বরফ কাটার কুঠার দিয়ে মমিটি বরফের আচ্ছাদন থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। এর পরের দিন আট পর্বতারোহীর দল সেই জায়গায় আসে। ২২ সেপ্টেম্বর মমিটিকে পুরোপুরি উদ্ধার করা হয়। আইসম্যানের সঙ্গে বরফের নিচে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল তার ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র। এর মধ্যে রয়েছে একঝাঁক তীর, একটি ধনুক আর দস্তার তৈরি একটি কুড়াল। তার শরীরে পরিহিত ছিল সেলাইকৃত ঘাস দিয়ে তৈরি এক গরম চাদর, একটি কোট, ছাগলের চামড়ার তৈরি ল্যাগিংস আর ভালুকের চামড়ার ক্যাপ।

সেটিই বরফমানব। এই অজানাকে জানার চেষ্টার শুরু সেখানেই। হিসাব করে বের করা হলো, আজ থেকে পাঁচ হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে এই বিশ্বেই চলাফেরা ছিল বরফমানবের। হোমো স্যাপিয়ন্স মানে বর্তমান মানবের নিকটতম আদি পুরুষের অন্যতম তারা। বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি খুঁজে বের করেছেন আইসম্যানের জীবিত বংশধরদের। একজন-দুজন নয়, ১৯ বংশধরকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞানীরা। ইনসব্রাক মেডিকেল ইউনিভার্সিটির লিগ্যাল মেডিসিন ইনস্টিটিউটের গবেষকরা দেশটির পশ্চিমে টাইরোল এলাকার রক্তদানকারীদের ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করেন। তার মধ্যে ১৯ জনের ডিএনএ স্যাম্পলের সঙ্গে ওটজি দ্য আইসম্যানের ডিএনএর সাদৃশ্য শনাক্ত করতে সক্ষম হন তারা।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, একই ধরনের ডিএনএ মিউটেশন নিকটবর্তী এলাকা সুইজারল্যান্ড এবং ইতালির দক্ষিণ টাইরোল এলাকাতেও পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা প্রায় ৩৭০০ ব্যক্তির ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহ করেন। এছাড়াও প্রত্যেককে বলা হয় তাদের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে তারা যতটুকু জ্ঞাত আছে সে তথ্য দেওয়ার জন্য। বিজ্ঞানীরা ডিএনএর সাদৃশ্য পাওয়া বংশধরদের এ বিষয়ে এখনো কোনো কিছু জানাননি। প্রায় দুই দশক আগে বরফের নিচে খুঁজে পাওয়া ওটজির হিমায়িত দেহ নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। ৫৩০০ বছর আগে ওই স্থানে ওটজি কীভাবে সমাহিত হয়েছিলেন সেটা জানার চেষ্টা চালিয়ে যান তারা।

ওটজির কলারবোনে ছিদ্র থাকায় ধারণা করা হয়েছিল তিনি তীরবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন। আবার ব্রেইন স্ক্যান করার পর জানা গেছে তিনি উঁচু স্থান থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করেন। তবে এ বছরের শুরুর দিকে জার্মানির ইউর‍্যাকের (ইউরোপিয়ান একাডেমি অব বোলজ্যানো) গবেষকরা আবিষ্কার করেন, খুব সম্ভবত তিনি মস্তিষ্কে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ২০০১ সালে অস্ট্রিয়ার ইনসব্রাক ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা ওটজির মস্তিষ্কের ক্যাট স্ক্যান করেন। স্ক্যানে দেখা যার আইসম্যানের মাথার পেছনে কালো ক্ষত রয়েছে। এরপর বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত নেন, ওটজি মাথায় আঘাতের কারণে মারা গিয়েছিলেন। ডিএনএ স্যাম্পল থেকে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন মৃত্যুর সময় তার বয়স ছিল আনুমানিক ৪৫ আর উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি। ওটজির দেহ ইতালির বোলজ্যানোতে বিশেষভাবে তৈরি এক জাদুঘরে সংরক্ষণ করা আছে। বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হিমায়িত ঘরে রাখা ওটজির দেহকে দেখার জন্য অনেক দর্শনার্থী বেড়াতে আসেন।

আইসম্যান বা বরফমানব ওটজি সম্পর্কে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, ওটজির মমি কি অভিশপ্ত? ওটজির দেহ আবিষ্কার, বরফের নিচ থেকে উঠিয়ে আনা ও পরবর্তীতে তার মমি নিয়ে গবেষণার ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে এ প্রশ্নটি আসাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই অস্বাভাবিকভাবে একই বছর মৃত্যুবরণ করেন। অনেকগুলো মৃত্যু যেমন রহস্য, সন্দেহ আর প্রশ্নের উদ্রেক করেছে— তেমনি কয়েকটি মৃত্যুকে অবশ্য স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেওয়া যায় নিমিষেই। ৬৩ বছর বয়সে যদি কেউ মারা যান, তবে সেটিকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি হন একজন বিজ্ঞানী যিনি ৫,৩০০ বছর আগের বরফে জমে যাওয়া এক মৃত সৈনিকের মমি আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িত, তখন একটু প্রশ্নের উদ্রেক হতেই পারে! শুধু কী তাই? তার সঙ্গে সঙ্গে একই বছর সেই মমির সঙ্গে সম্পর্কিত আরও সাত ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যু খুব স্বাভাবিকভাবেই ভয়াবহ একটা কিছুর ইঙ্গিত বহন করে। আর সেটিই আসলে অভিশাপ।

বরফমানব ওটজিকে নিয়ে একটা বই লিখছিলেন আমেরিকান বংশোদ্ভূত মলিকুলার প্রত্নতত্ত্ববিদ টম লয়। কিন্তু এই বইটি চূড়ান্ত রূপ পাওয়ার মাত্র ১৫ দিন আগে তাকে তার ব্রিজবেনের বাসায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তখন চারদিকে ওটজির অভিশাপ নিয়ে নানা রকম কানাঘুষা শুরু হয়। কিন্তু অনেকেই একে উড়িয়ে দেন। টম লয়ের এক সহকর্মী বলেন, ‘লয় এসব অভিশাপে বিশ্বাস করতেন না। এগুলো কেবলই কুসংস্কার। যারা মারা যাচ্ছে এটার সঙ্গে অভিশাপের কোনো সম্পর্ক নেই।’

কিন্তু আস্তে আস্তে মৃত্যুর মিছিলে যোগ হতে থাকে আরও কিছু নাম। বরফমানব ওটজির মমি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন আরেক প্রত্নতত্ত্ববিদ- কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স বিভাগের পরিচালক। আর এই গবেষণা শুরুর পর পরই তিনি রক্তের নানা সমস্যায় আক্রান্ত হন, যেটি টানা ১২ বছর ধরে তাকে ভোগাতে থাকে।

৬৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন হেলমুট সিমনও। তিনিই প্রথম ওটজির দেহটি আবিষ্কার করেছিলেন। পরবর্তীতে হাইকিং এ বেড়িয়ে প্রবল তুষারপাতের কারণে মারা যান। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এই যে সিমন যেখানটায় মৃত্যুবরণ করেন, ঠিক একই জায়গায় ওটজির দেহ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। ফলে মানুষের মনে ওটজির অভিশাপের বিষয়টি দানাবেঁধে ওঠে। এখানেই শেষ নয়, সিমনের শেষকৃত্যানুষ্ঠানের মাত্র এক ঘণ্টার মাথায় আরও একটি অপমৃত্যু ঘটে। এবারকার শিকার ডিয়েটার ওয়ারন (৪৫)। তিনি দেহ উদ্ধারের কাজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর সুস্থ ডিয়েটারের মৃত্যু হয় এক আকস্মিক হার্ট অ্যাটাকে। এরপর এপ্রিলে প্রত্নতত্ত্ববিদ কনরাড স্প্লিন্ডার (৫৫) মাল্টিপল সেক্লরোসিসে ভুগে মারা যান। এই লোকটিও বরফমানবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তিনিই প্রথম ওটজির দেহ পরীক্ষা করেছিলেন। বাদ যাননি ওটজিকে পরীক্ষাকারী ফরেনসিক টিমের প্রধান রেইনার হেন (৬৪) পর্যন্ত। তিনি যখন ওটজিকে নিয়ে একটি বক্তব্য প্রদানের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন, তখন এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান।

এরপর পর্বতারোহী কার্ট ফ্রিটজ (৫২) যিনি হেনকে ওটজির মমির সন্ধান দিয়েছিলেন, পর্বতারোহণের সময় তুষারধসের নিচে চাপা পড়ে মারা যান। ওটজিকে তার বরফাচ্ছাদিত সমাধি থেকে ওঠানোর ছবি ধারণকারী অস্ট্রিয়ান সাংবাদিক রেইনার হোয়েযল (৪৭) মারা যান মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত হয়ে। এসব মৃত্যুর রহস্য এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। বিজ্ঞানীরা অভিশাপের বিষয়টিকে পাত্তা না দিলেও অনেকের বিশ্বাস এই মানুষগুলোর মৃত্যুর সঙ্গে ওটজির মমির কোনো এক যোগসাজশ অবশ্যই রয়েছে। বরফমানবের মমিটি বর্তমানে রয়েছে ইতালির South Tyrol Archaeological Museum in Bolzano হিমাগারে।  আর এ জাদুঘরটি যে প্রতিষ্ঠানের সেই ‘ইনস্টিটিউট ফর মমি অ্যান্ড দ্য আইসম্যান’-এর প্রধানের দায়িত্বে আছেন জিংক। ইতালির ইউরোপিয়ান একাডেমি অব বোজেনের কর্মকর্তাও তিনি। অভিশাপের বিষয়টিকেও তিনি পাত্তা দিতে চান না। অভিশাপ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হলো- ‘এগুলো স্রেফ কাকতালীয়। গুজব এবং কুসংস্কার। এসবে বিশ্বাস করা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়।’

কিন্তু এরপরও প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ, বিজ্ঞান আসলে এর পেছনের রহস্যগুলো এখনো পর্যন্ত ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হয়নি।