পানিশূন্য তিস্তায় বিপন্ন জীববৈচিত্র্য

 ২৪ ফেব্রুয়ারী২০১৮ শনিবার ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

করালগ্রাসী প্রমত্তা তিস্তা নদী বর্ষায় ফুলে-ফেঁপে দুই কূল ভাসিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। ভেঙে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও স্থাপনা। সেই তিস্তা এখন শুকিয়ে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। খেয়াপারে বা মাছ ধরতে বর্ষায় নৌকা নিয়ে ছুটে চলা মাঝি-মল্লাদের দৌড়ঝাঁপ নেই। পানি আর মাছে পরিপূর্ণ তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে শুধুই বালুচর। মাছ ধরতে না পেয়ে অমানবিক জীবন-যাপন করছে নদীর দুই পাড়ের কয়েক হাজার জেলে পরিবার। বিপন্ন হতে চলেছে তিস্তার বুকে বাস করা নানা জীববৈচিত্র্য। নৌকা নয়, পায়ে হেঁটেই তিস্তা পাড়ি দিচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।

তিস্তাপাড়ে চলছে হাহাকার অবস্থা। কৃষক, জেলে থেকে শুরু করে তিস্তার সুবিধাভোগী লাখো মানুষের চাপা কান্নায় তিস্তাপাড়ের বাতাস ভারি হয়ে উঠছে। লালমনিরহাটের মত্স্য অফিস সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ অংশে তিস্তার বুকজুড়ে বাস করত ৩৭ প্রজাতির মাছ। পানি না থাকায় আজ সেগুলো বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯ প্রজাতির মাছ। আর প্রাণিসম্পদ অফিসের সূত্রমতে, তিস্তায় বাস করা ৬৩ প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের মধ্যে অধিকাংশই এখন বিপন্ন। শুধু তিস্তা নয়, অন্যান্য নদীতেও পানি সংকটের কারণে রংপুর অঞ্চল ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে যাচ্ছে বলে জানান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও রিভারাইন পিপলসের পরিচালক নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ। তার মতে, তিস্তাসহ অন্যান্য নদী এখন শুধুই ইতিহাস। আগামী প্রজন্ম জানবেই না নদী নামের শব্দটি। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি চুক্তি করা না গেলে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে সব নদী, নিশ্চিত মরুকরণ হবে এই অঞ্চল-এমটাই দাবি এই নদী গবেষকের। তিনি আরও বলেন, ভারতের অংশে তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি থাকা সত্ত্বেও ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা মরতে বসেছে, এটি ভারতের স্পষ্টত আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশ পানি পেতে ব্যর্থ হলে আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিস্তায় অভিন্ন অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তিস্তা। লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী বন্দর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিশেছে এটি। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার হলেও বাংলাদেশ অংশে রয়েছে প্রায় ১৬৫ কিলোমিটার।

ভারতের গজলডোবায় বাঁঁধ নির্মাণ করে সেই দেশের সরকার একতরফা তিস্তার পানি নিয়ন্ত্রণ করায় তিস্তা মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফলে লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার ১৬৫ কিলোমিটার তিস্তার অববাহিকায় জীবনযাত্রা, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দেশের অন্যতম সেচ প্রকল্প লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার তিস্তা ব্যারাজ অকার্যকর হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত তিস্তা রেলসেতু, তিস্তা সড়কসেতু ও নির্মাণাধীন দ্বিতীয় তিস্তা সড়কসেতু দাঁড়িয়ে রয়েছে ধু-ধু বালুচরের তিস্তার ওপর। ব্রিজ থাকলেও পায়ে হেঁটেই পার হচ্ছেন অনেকেই। ঢেউহীন তিস্তায় রয়েছে শুধু বালুকণা। তিস্তা নদীতে মাছ আহরণ করে শুঁটকি ও মাছ বিক্রি করে জীবন-যাপন করতেন এ অঞ্চলের হাজারো জেলে। তারাও আজ কর্মহীন হয়ে অমানবিক জীবন-যাপন করছেন। এ ছাড়া মাঝি-মল্লারাও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। হারিয়ে গেছে তিস্তার বুকে বাস করা নানা বৈচিত্র্যময় প্রাণী। তিস্তাপাড়ের মানুষের কাছে এসব যেন এখন ইতিহাস। পানি না থাকায় তিস্তার সুবিধাভোগী জেলে ও মাঝি-মল্লাদের কষ্টের কথা স্বীকার করে রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হারুন অর রশিদ জানালেন, যতটুকু পানি আছে, সেই পানিটুকু ব্যারাজের মাধ্যমে ক্যানেলে নেওয়ার পর তিস্তার বুকজুড়ে ধু-ধু বালুচর হওয়ায় তিস্তার সুবিধাভোগীদের কষ্ট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। পানিই যেহেতু নদীর প্রাণ, তাই পানি না থাকলে এর সুবিধাভোগীরা বেকায়দায় পড়বে এটাই স্বাভাবিক।