কেমন আছেন খালেদা জিয়া

 ২৪ ফেব্রুয়ারী২০১৮ শনিবার ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে এই প্রথম কারাগারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে একমাত্র আসামি তিনি। গতকাল ছিল তাঁর কারাগারে যাওয়ার ১৬তম দিন। নির্জন কারাগারে কেমন আছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী? এ নিয়ে দলের নেতা-কর্মীদের বাইরেও সাধারণ মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। এ পর্যন্ত তিন দফায় তাঁর ভাই-বোনের পরিবারের সদস্যরা দেখা করেছেন। একবার দেখা করেছেন বিএনপি-প্রধানের কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবী।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ সময় চুপচাপই থাকেন বেগম জিয়া। তাঁর সময় কাটে ইবাদত-বন্দেগি আর পত্রিকা পড়ে। মাঝেমধ্যে বাধ্য হয়ে বিটিভিও দেখেন। পুরো সময়টা জুড়েই তাঁর সঙ্গে থাকেন গৃহকর্মী ফাতেমা। সেখানে দায়িত্বরত কারা মহিলা স্টাফদের সঙ্গেও আলাপচারিতায় তাঁর সময় কাটে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাঁর বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অন্য পাঁচজনকে। রায় ঘোষণার পরই সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারকে ‘বিশেষ কারাগার’ ঘোষণা দিয়ে সেখানে রাখা হয়। কারাগারে যাওয়ার পর একবার বেগম জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের নেতৃত্বে পাঁচজন সিনিয়র আইনজীবী। এর বাইরে তিন দফায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন তাঁর বড় বোন সেলিনা হোসেন বিউটি ও তাঁর ছেলে, বড় ভাইয়ের স্ত্রী, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তাঁর স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ও তাঁদের ছেলে অভীক এস্কান্দার। এ ছাড়া একবার খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর শাশুড়ি দেখা করেছেন। বেগম জিয়ার সঙ্গে দেখা করে এসে গণমাধ্যমকে তাঁর আইনজীবীরা জানান, বেগম জিয়াকে সম্পূর্ণ সলিটারি কনফারমেন্টে রাখা হয়েছে। পরিত্যক্ত যে কেন্দ্রীয় কারাগার ছিল তাতে এখন কেউ বাস করে না। যার ঘরবাড়িগুলো পড়ে যাচ্ছে, স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। সেই কারাগারে বেগম জিয়া সম্পূর্ণ একা একজন প্রিজনার। ৭৩ বছরের একজন বয়স্ক মানুষ তাঁর যে সার্বক্ষণিক পরিচারিকা যা জেল কোডের মধ্যে রয়েছে সেই পরিচারিকাকেও তাঁর সঙ্গে থাকতে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়গুলো সম্পূর্ণ অমানবিক। পরে অবশ্য ডিভিশন দেওয়াসহ গৃহপরিচারিকা ফাতেমাকে কারাগারে পাঠানোর অনুমতি দেয় আদালত। কারাসূত্রে জানা যায়, খালেদা জিয়াকে প্রথমে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের সিনিয়র কারা তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে রাখা হয়। খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগমুহূর্তে কারাবিধি অনুসারে ভিআইপি বন্দী রাখার জন্য পুরনো কারাগারের ‘ডে-কেয়ার’ সেন্টারের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির ডান পাশের দুটি কক্ষ থাকার উপযোগী করে তোলা হয়। এর মধ্যে একটি কক্ষে লাগানো হয় নতুন টাইলস, সিলিং ফ্যান। বসানো হয় খাট, চেয়ার ও টেবিল। বিটিভির লাইনও সংযোগ দেওয়া হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি ডিভিশন পাওয়ার পর সেখান থেকে বেগম জিয়াকে ডে-কেয়ার সেন্টারে নেওয়া হয়। তাঁকে পড়ার জন্য একটি দৈনিক পত্রিকা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ১৫ ফেব্রুয়ারি কারাগারে বেগম জিয়াকে দেখে এসে তাঁর পরিবারের এক সদস্য জানান, বেগম জিয়া শারীরিকভাবে সুস্থ আছেন। কারা কর্তৃপক্ষও তাদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে বিএনপি-প্রধানকে ভালো রাখার চেষ্টা করছেন। একজন নারী ফার্মাসিস্ট নিয়মিত বিএনপি-প্রধানের শারীরিক চেকআপ করছেন। অবশ্য বিএনপি চেয়ারপারসন নিজেকে নিয়ে চিন্তিত নন। তাঁর মুক্তির দাবিতে বর্তমানে দলের অবস্থান ও চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও খুশি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। নেতা-কর্মী, পরিবারসহ সবাইকে ধৈর্য ধরে পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। দেশবাসীর কাছে দোয়াও চেয়েছেন। এ ছাড়া উচ্চ আদালতে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাও করেছেন বেগম জিয়া। কারাসূত্র জানায়, কারাগারের সব নিয়ম মেনেই চলছেন খালেদা জিয়া। তাকে কোনো বিষয় নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষের অনুরোধও করতে হয় না। খাবারেও তাঁর কোনো চাহিদা নেই। ঘুম থেকে উঠে কারাবিধি অনুসারেই সকালের নাস্তা হিসেবে রুটি ও সবজি খান। এরপর তিনি পত্রিকা পড়েন। মাঝেমধ্যে চা দেওয়া হয়। এরপর গোসল করেন, পরে জোহরের নামাজের পর নিয়মিত অজিফা পড়েন তিনি। সেখানে বেশ সময় কাটে তাঁর। দুপুরের খাবার খান একটু দেরিতে। বিকালে কিছু সময় ডে-কেয়ার সেন্টারের বারান্দায় পায়চারি করেন। সেখানে থাকা একটি চেয়ারে বসেও সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় কাটে তাঁর। মাগরিবের নামাজের পর মন চাইলে কিছু সময় বিটিভি দেখেন। এরপর রাতের খাবার খান। ডে-কেয়ার সেন্টারেই তাঁর খাবার রান্না করা হয়। খাবারগুলো চিকিৎসকের পরীক্ষার পর বেগম জিয়াকে দেওয়া হয়। এদিকে আদালতের অনুমতি নিয়ে খালেদা জিয়ার তত্ত্বাবধানের জন্য ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে গৃহকর্মী ফাতেমাকে কারাগারে থাকতে দেওয়া হয়। এর পর থেকেই তিনি বেগম জিয়ার সঙ্গে রয়েছেন। তবে তাঁকে স্বেচ্ছায় কারাগারে যাওয়ার একটি সাদা কাগজে ‘বন্ড সই’ দিতে হয়েছে। তিনি দিনে কর্তব্যরত নারী কারারক্ষীর কাছে থাকেন। ডাকা হলে তিনি খালেদা জিয়াকে ওষুধ দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেন। রাতে ঘুমান খালেদা জিয়ার পাশের কক্ষে। তাঁর সেবায় কারাগারের ভিতরে সার্বক্ষণিক একজন নারী ফার্মাসিস্ট, প্রয়োজন হলে একজন চিকিৎসক থাকেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় খালেদা জিয়ার কক্ষ ঘিরে একজন নারী উপ-কারাধ্যক্ষের নেতৃত্বে সার্বক্ষণিক চারজন নারী কারারক্ষী থাকেন। কারাগারের বাইরে আছেন একজন উপ-কারাধ্যক্ষের নেতৃত্বে একদল কারারক্ষী। আরও আছেন পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা।