রথিশের লাশ গুম করতে ৩০০ টাকায় গর্ত খোঁড়া হয়

 ৪ এপ্রিল ২০১৮ বুধবার  ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

রংপুরের আইনজীবী রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবুসোনাকে হত্যার পর তার লাশ গুম করতে ৩০০ টাকা দিয়ে গর্ত খোঁড়া হয়। আর এ গর্ত খোঁড়ে দেন রথিশ হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক কামরুলের ছাত্ররা।

এদিকে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজির আহমেদ জানান, স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমের জেরেই রংপুরের আইনজীবী রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবুসোনা হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয়েছে।বুধবার দুপুরে রংপুরে র‌্যাব-১৩ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।

এর আগে মঙ্গলবার মধ্যরাতে রংপুর নগরীর বাবুপাড়া এলাকার রথীশের বাড়ি থেকে আধাকিলোমিটার দূরে তাজহাট মোল্লাপাড়ার একটি নির্মাণাধীন বাড়ি থেকে বালু চাপা দেওয়া অবস্থায় রথীশের লাশ উদ্ধার করে র‌্যাব-১৩ এর সদস্যরা।  

বুধবার র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির বলেন, ৩০ মার্চ সকাল থেকে রথীশের নিখোঁজের ঘটনা ছিল তার স্ত্রী দীপা ভৌমিকের সাজানোর নাটক। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্যই তিনি এ পলিসি করেছেন।

“আসলে ২৯ মার্চ রাতেই নিজ শয়নকক্ষে রথীশকে হত্যা করা হয়। রথীশের স্ত্রী দীপা ভৌমিক স্থানীয় তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তার সহকর্মী আরেক সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামে সঙ্গে পরকীয়া প্রেম ছিল দীপার। এনিয়ে রথীশের সঙ্গে দীপার কলহ লেগেই ছিল”।   
 
সোমবার রাতে কামরুলকে গ্রেফতারের পর তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মঙ্গলবার রাতে দীপাকে গ্রেফতার করা হয়। দীপার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রথীশের লাশ উদ্ধার করা হয়।রথীশের ছোট ভাই সাংবাদিক সুশান্ত ভৌমিক ভাইয়ের লাশ শনাক্ত করেন। 

র‌্যাব কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদে দীপার জবানবন্দির বরাত দিয়ে র‌্যাবের ডিজি বেনজির জানান, “দুইমাস ধরে রথীশকে হত্যা পরিকল্পনা করে দীপা ও কামরুল”। 

''২৯ মার্চ রাত দশটায় রথীশ শহর থেকে বাড়ি ফেরার পর তাকে ভাত ও দুধ খেতে দেয় দীপা। আগেই ভাত ও দুধের সঙ্গে ১০টি ঘুমের বড়ি মেশানো হয়। ভাত ও দুধ খেয়ে নিজের শোবার বিছানায় অসচেতন হয়ে পড়েন রথীশ। এই ঘরে আগে থেকেই আত্মগোপনে ছিলেন কামরুল। তারা দু'জনে মিলে রথীশের গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। 

পরদিন ভোর পাঁচটায় বাড়ি থেকে বের হয়ে যান কামরুল। পরে সকাল ৯টায় ফের কামরুল একটি ভ্যান নিয়ে আসেন। একটি স্টিলের আলমারী পরিবর্তনের নাম করে রথীশের লাশ বস্তায় ভরে তা আলমারিতে ভরে ভ্যানে করে তাজহাট মোল্লাপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। 

কামরুলের বড় ভাই খাদেমুল ইসলামের নির্মাণাধীন বাড়ির একটি কক্ষে আগে থেকেই বালু খুঁড়ে গর্ত করে রাখা হয়েছিল। বেলা ১১টায় বস্তায় ভরা রথীশের লাশ সেই গর্তে পুঁতে রাখা হয়। গর্ত খোঁড়ার কাজ করে কামরুলের দুই ছাত্র সবুজ ইসলাম(১৭) ও রোকনুজ্জামান(১৭)। তাদের বাড়িও তাজহাট মোল্লাপাড়ায়। তারা তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। ২৬ মার্চ ৩০০ টাকার বিনিময়ে তারা গর্ত খুঁড়ে রাখে। তাদেরকেও গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছে, কামরুল তাদের শিক্ষক হওয়ায় তারা আদেশ পালন করেছে। 

র‌্যাব দীপা ভৌমিক, কামরুল ইসলাম, সবুজ ইসলাম ও রোকনুজ্জামানকে দুপুরে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।  

রথীশচন্দ্র নিখোঁজ হওয়ার পর তার ছোট ভাই সুশান্ত ভৌমিক সুবল বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় মামলা করেন। মামলায় কাউকে আসামি করা হয়নি। তবে দীপা ভৌমিক, কামরুল ইসলাম, সবুজ ইসলাম ও রোকনুজ্জামানকে এখন এ মামলায় আসামি দেখানো হয়েছে বলে কোতোয়ালী থানার ওসি বাবুল মিঞা জানিয়েছেন।  

তিনি জানান, লাশের গলায় শুধু দাগ রয়েছে। পরনে শার্ট-প্যান্ট ও পায়ে জুতা পরা ছিল। বিছানার চাদর ও লুঙ্গি দিয়ে লাশ পেঁচানো ছিল। 

রথীশের দুই ছেলে-মেয়ে। ছেলে দীপ্ত ভৌমিক ঢাকায় একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে শেষ বর্ষের ছাত্র। তিনি ঢাকায় ছিলেন। আর মেয়ে রিক্তি রানী ভৌমিক রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যাণ্ড কলেজেন নবম শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। ঘটনার রাতে সে তার এক পিসির(ফুপু) বাসায় ছিল। বাবার নিখোঁজের খবর পেয়ে বাসায় আসেন দীপ্ত ভৌমিক। 

এদিকে ময়নাতদন্ত শেষে রথীশের লাশ তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছে পুলিশ। বিকেল পাঁচটায় দখিগঞ্জ শ্মশানে রথীশের শেষকৃত সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে বলে তার ভাই সুশান্ত ভৌমিক সুবল জানিয়েছেন। 

রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক রথীশ জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন। দুটি মামলায় জেএমবি ৭ সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেয় রংপুরের বিশেষ জজ আদালত। রথীথ এই আদালতের পিপি ছিলেন। এছাড়া হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি, জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।