বাতিল নয়, দেশবাসী কোটা সংস্কার চায়

 ১৭ এপ্রিল ২০১৮ মঙ্গলবার  ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

শুভ বাংলা নববর্ষ। বাংলা ১৪২৪-এর শেষ দিনগুলো ভালো ছিল না, বড় ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ ছিল। আশা করব ১৪২৫ আনন্দময় সমৃদ্ধির হবে। বাঙালি তার কৃষ্টি-সভ্যতায় হৃদয়ের সমস্ত শুভ কামনা নিয়ে অবগাহন করবে। সাংস্কৃতিক কৃষ্টি-সভ্যতা সমাজ জীবনে এক অবশ্যম্ভাবী অঙ্গ। সামাজিক বন্ধন ছাড়া মানুষ চলতে পারে না। সাংস্কৃতিক শান্তি-সুস্থিতি থাকলে দেশে আপনা-আপনিই সমৃদ্ধি আসে। একের প্রতি অন্যের অবিশ্বাস, হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি কোনো উন্নয়নের লক্ষণ নয়। পয়লা বৈশাখ দুপুরে উকিল মেয়ের বাড়ি গিয়েছিলাম। আড়ংয়ের দিক থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে খামারবাড়ির পথে রাস্তায় আলপনা দেখে অভিভূত হয়েছি। প্রাণের সমস্ত ভালোবাসা ঢেলে রাস্তায় যারা এমন আলপনা করতে পারে তারা কী করে নিষ্ঠুর হয়? ভাবছিলাম, পৃথিবীর তিন ভাগ জল এক ভাগ স্থল। একজন মানুষের ভালোবাসার কাছে কখনো কখনো পৃথিবীর সব জল বা পানি কম হয়ে যেতে পারে। আগে জামায়াত-শিবির কর্মীরা রগ কাটত। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সুফিয়া কামাল হল ছাত্রলীগ সভানেত্রী ছাত্রীদের রগ কেটেছে, অত্যাচার করেছে। তাকে একবার বহিষ্কার আবার বহিষ্কার প্রত্যাহার করে বিশ্ববিদ্যালয় তার ছাত্রীর মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছে। এশাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল রগ কাটার জন্য আর বাংলাদেশের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বহিষ্কার করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দরিদ্র-অবহেলিত কর্মচারীদের পক্ষে আন্দোলনের জন্য। কত পার্থক্য! ব্রিটিশরা আমাদের সঙ্গে যা করেনি, পাকিস্তানিরা যা করতে পারেনি বর্তমান সরকার যদি তার চেয়ে খারাপ করে তাহলে তাদের ভালো বলি কী করে?

নানাভাবে সরকারি চাকরিতে এখন ৫৬ শতাংশ কোটা। এ কেমন কথা? জন্ম থেকে শুনে আসছি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা। আমার তিন ছেলেমেয়ে। বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীর তিন ছেলেমেয়ে। আমরা সাত ভাই, তিন বোন। কেউ কোনো দিন লেখাপড়া, চাকরি-বাকরি, ভ্রমণ-চিকিৎসা কোনোখানে সরকারি কোটার কোনো সুযোগ পেলাম না। মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম, আহত হয়েছিলাম, যুদ্ধে ভূমিকার জন্য বাংলাদেশের পিতার নেতৃত্বের সরকার সেনাবাহিনীর বাইরে জীবিতদের মধ্যে সর্বোচ্চ সাহসিকতামূলক খেতাব বীরউত্তম একমাত্র আমাকেই দিয়েছিল। স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সাল থেকে যুদ্ধাহতদের প্রতি মাসে ৭৫ টাকা সম্মানী ভাতা দেওয়া হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের দেখাশোনা, সুযোগ-সুবিধা, লেখাপড়ার জন্য সে সময় বিপুল অর্থ-সম্পদ প্রদান করা হয়েছিল। করা হয়েছিল কল্যাণ ট্রাস্ট। যাদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট সেই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য এ পর্যন্ত যা ব্যয় হয়েছে, তার চেয়ে ৩০০ গুণ বেশি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ব্যয় হয়েছে। ছোটবেলায় শুনেছিলাম, ১ টাকার ঘোড়াকে ১০ টাকার দানা খাওয়ানো। একসময় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতি মাসে ২০০০ টাকা সম্মানী চেয়েছিলাম। নেত্রী বড় বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। যারা কানকথা শুনে কোনো কিছু বিচার-বিবেচনা করে না, তারা অন্যের কথায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। একজন বয়সী মানুষ, সমালোচনা করলে কত কী করতে পারে, কী বলতে পারে এটা তো আমার খোলামেলা জীবন উল্টে-পাল্টে দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায়। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, কৃষকের ঘরে সার, সেচ সুবিধা, বেকারের চাকরি— এসব প্রতিশ্রুতি পালন না করায় একসময় মনে হয়েছিল জননেত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হিসেবে আমিও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারীর দলে পড়ছি। তাই পদত্যাগ করেছিলাম সংসদ এবং আওয়ামী লীগ থেকে। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’ বলে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করে রাস্তায় নেমেছিলাম। এখনো সেই রাস্তায়ই আছি। এখন চিন্তা করি, মুখ বুজে সবকিছু সহ্য করে জননেত্রীর নেতৃত্বে থাকলে যা বিশ্বাস করি তা বলতে পারতাম না। বুকের ভিতর এক মারাত্মক অব্যক্ত জ্বালা থেকে যেত। বিত্ত থাকলেও চিত্ত থাকত কাঙালের মতো। আজকাল মহান সম্রাটদের চেয়েও সমৃদ্ধ চিত্তে সমাজ এবং পরিবারে অবগাহন করি। এ কারণে মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার মতো সুখী ভবে কেউ তো নাই। নিশ্চয়ই বেদনা আছে, অভাব আছে, কিন্তু ছেলেবেলায় যেমন মায়ের শীতল বুকের স্নেহ পেতাম, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন, নেতা-কর্মী, আত্মীয়স্বজন নিয়ে এখনো তার চেয়ে খুব একটা কম সুখে নেই। স্ত্রী নিয়ে জটিলতা নেই, ছেলেমেয়ের জন্য বুকের ভিতর রয়েছে অসম্ভব ভালোবাসা। এটা বলে-কয়ে তৈরি করা নয়, আপনা থেকে স্বতঃস্ফূর্ত। তাই কেউ কেউ যখন ভাবে আওয়ামী লীগ ছেড়ে পানিতে পড়ে গেছি, তাদের ভাবনা অন্তঃসারশূন্য। তারা তাদের দিক থেকে ভাবতে পারেন আমার দিক থেকে নয়। তা দেশবাসী যেমন জানে, পাঠকরা আরও বেশি জানেন।

আকাশ-বাতাস থেকে পাওয়া এক মানবসন্তান কুশিমণি আজ আমার ধ্যান-জ্ঞান, আমার সব শক্তির উৎস, আমার অস্তিত্ব। ওকে নিয়ে আমার ঔরসজাত সন্তানরা যদি অসন্তুষ্ট থাকত, স্ত্রী যদি বুকের ধন হিসেবে গ্রহণ না করত, আমি আমার হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা দিয়ে কীই-বা করতে পারতাম। দীপের বয়স হয়েছে। আমি যে বয়সে বিয়ে করেছিলাম তার থেকে দু-চার বছর হয়তো কম, কিন্তু বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেছে। কারও এক ছেলে থাকলে যা হয় আমারও তাই। তেমন কিছু বলতে পারি না। আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মন আকুলি-বিকুলি করে ঘরে একটা মেয়ের মতো বউ আসুক। তারপর ছোট্ট কেউ সারা বাড়ি তোলপাড় করে ছোটাছুটি করুক। কিন্তু ছেলেকে বিয়ে করাতে পারি না। আমারই মতো। আমি তো তবু প্রেম করেছিলাম দেশের নেতার সঙ্গে, জননী-জন্মভূমির সঙ্গে। কিন্তু আমার ছেলে কী করে বলতে পারি না। আমাদের কোনো পছন্দ নেই। তার পছন্দই আমাদের পছন্দ। কিন্তু আমরা সম্পূর্ণ লাচার। আমার এই ছেলে কোনো দিন নিজ হাতে এক গ্লাস পানি ভরে খায়নি, এখনো যে খায় তাও না। কিন্তু ছোট বোন কুশিমণি যদি রাত ১২টায় বলে ‘ভাইয়া, কোক খাব’ কোনো বিরক্তি নেই। পাগলের মতো ছুটে যায়। বড় বোন কুঁড়ির কুশি আরও প্রিয়। আগে ছিলাম মাকে নিয়ে রসুনের কোয়ার মতো। এখন আমরা পাঁচজন কুশিকে নিয়ে রসুনের চাইতে শক্ত। অন্য ভাইবোনেরা তাদের ভাইস্তা-ভাস্তির জন্য একই রকম। আল্লাহ আর কী করবেন আমার জন্য। কতজনের কত বিপুল সম্পত্তি, ছেলে থাকে কানাডায়, মেয়ে আমেরিকা, মেয়ের জামাই জার্মানি। আল্লাহ যে প্রেমের কারণে জগৎ সৃষ্টি করেছেন তার কিছুই নেই সেখানে। মুখে হাসি আছে, কিন্তু সেটা অভিনেতার হাসি, নেতার নয়। ডিরেক্টর যেভাবে বলে সেই রকম শিল্পীর হাসি। আমাদের ওসবের প্রয়োজন হয় না, আল্লাহর তরফ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত যে হাসি-কান্না আপনা-আপনি ঝরে পড়ে তাতেই আমরা অভ্যস্ত। যত যাই বলি, আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। সেই পরিচয়ই ঘুরে-ফিরে সবার ওপর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমিও ব্যাপারটা খুব একটা অস্বীকার করি না। মুক্তিযুদ্ধ না হলে আমি লাখো সাধারণ মানুষের একজন থাকতাম। এর চেয়ে সুখে থাকতাম, না দুঃখে— জানি না। তবে সেদিন নিজেকে যেভাবে রাখতাম এখনো সেভাবেই রাখতে চেষ্টা করি। আমার অনেক ভুল আছে ত্রুটি আছে। কিন্তু জ্ঞানত নিজের স্বার্থে অন্যের ক্ষতি করা ছোট করা অথবা অবহেলা করা ইচ্ছা করে করি না। যত দিন বেঁচে থাকব তত দিন এভাবেই চলার চেষ্টা করব। ১৯৭২ সালের ৫ জানুয়ারি পিতার মতো বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী প্রকাশ্য রাজপথে অবহেলিত কুকুর-বিড়ালের চাইতেও তাচ্ছিল্যের সঙ্গে গালাগাল করেছিলেন। যখন হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা লাখো জনতা আমার মুখের একটা কথা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকত সেই সময় প্রায় ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা ঘিরে থাকার পরও বড় ভাইয়ের গালি থেকে বাঁচাতে পারেনি। অমন গালি খ্যাপা কুকুরকেও কেউ দেয় না। তখনো বঙ্গবন্ধু হানাদার কারাগার থেকে মুক্তি পাননি। এ রকম পরিস্থিতিতে বড় ভাইয়ের গালাগাল শুনে অবশ্যই কিছুটা দিশাহারা হয়েছিলাম, মন ভেঙে গিয়েছিল। চোখে পানি নিয়ে মায়ের কাছে ছুটে গিয়েছিলাম। বাবাও ছিলেন। আমার চোখে পানি দেখে মাকে বাবা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘বজ্রের কী হয়েছে?’ ভাঙা ছাপড়া ঘর তারও চেয়েও ভাঙা চকিতে বসে আমি যখন কাঁদছিলাম মা আমার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলছিলেন, বড় ভাইয়ের গালি খেয়ে খুব মন খারাপ হয়েছে, তাই না? খারাপ লাগছে তাই চোখে পানি? পানি ফেলে শক্তি খর্ব করিস না। বুকের শক্তি চোখের পানিতে বের করে না দিলে দেশের কাজে লাগাতে পারবি। আরজু যা বলেছে বাড়িতে ঘরের ভিতর ওসব বললে তোর কি তেমন লাগত? বলেছিলাম,

— না। এর চাইতে অনেক বেশি বললেও না। ছোটবেলায় তো কত মারধর করেছে তেমন করলেও খারাপ লাগত না।

—তাহলে খারাপ লেগেছে প্রকাশ্য রাজপথে গালাগাল করেছে, তাই তো? গালাগাল বড় কথা নয়, বড় কথা মানুষের সামনে করেছে, তাই খারাপ লাগছে? শিশুর মতো বলেছিলাম,

—সত্যিই তাই। বাবাও তখন ছিলেন। মা আরও আদর দিয়ে হাত বুলিয়ে বলেছিলেন,

—ঘরে গালি দিলে তোমার স্রষ্টা দয়াময় আল্লাহ দেখত, অন্য কেউ জানত না, শুনত না? রাস্তায় গালি দিয়েছে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আল্লাহও দেখেছেন-শুনেছেন। ঘরেও আল্লাহ দেখতেন বাইরেও দেখেছেন। তোর খারাপ লাগার কারণ তো শুধু ওইটুকু যে, অন্যদের সামনে গালি দিয়ে আরজু তোকে ছোট করেছে, অপমান অপদস্থ করেছে। বজ্র, আল্লাহ তোকে কত বড় করেছেন। আল্লাহর দয়া এবং সন্তুষ্টি না থাকলে তুই কি মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হতে পারতি? এত মানুষ তোকে মানত? সেই আল্লাহর সামনে গালি দিলে তোর তেমন লাগে না, কষ্ট হয় না, মানুষের সামনে দিলে তুই অপমানিত হস। তোর কাছে আল্লাহ, না সাধারণ মানুষ কোনটা বড়? কোনটা সম্মানের বা অপমানের? মা আমার ক্লাস থ্রি পর্যন্ত স্কুলে লেখাপড়া করেছিলেন। রবীন্দ্র, নজরুল, শরৎ, মাইকেল, বিদ্যাসাগর কোনো বাংলা সাহিত্য ছিল না, যা মা পড়েননি। লতিফ ভাই যখন বাংলায় অনার্স করেন চর্যাপদ, আরাকানের মহাকবি আলাওলকে নিয়ে পড়তেন কোনো কোনো সময় মা এটা-ওটা বলে দিয়ে বড় ভাইকে সাহায্য করতেন। তখন বুঝতাম না, স্বাধীনতার পর বুঝতাম; বিশেষ করে ভারতে নির্বাসিত জীবনে। স্কুল-কলেজই শুধু মানুষকে শিক্ষা দেয় না, জ্ঞানের ভাণ্ডার বই-পুস্তক, জ্ঞানের সাগর প্রকৃতি, রাস্তা-ঘাট, গাছ-পালা, তরু-লতা, পশু-পাখি— এসব পড়তে পারলে স্কুল-কলেজের বাইরেও জ্ঞান অর্জন করা যায়। মায়ের মতো সুফিয়া খালা ঘরের বাইরে স্কুলে এক দিনও যাননি, নারীমুক্তি ও জাগরণের মূর্তপ্রতীক বেগম রোকেয়ার স্কুলের কোনো পাঠ ছিল না। কেউ কেউ বলেন, নারীবাদী লেখিকা তসলিমা নাসরিন। আমার মনে হয় নারীবাদী হওয়ার চাইতে পুরুষ ও প্রকৃতি নিয়ে সৃষ্টিজগতে প্রকৃতিবাদী হওয়া উচিত। প্রকৃতিবাদী হলে প্রকৃতিপ্রেমী হলে না পুরুষবিদ্বেষী, না নারীবিদ্বেষী এর কোনোটাই হওয়ার সুযোগ বা উপায় থাকে না। নজরুল নারী হয়ে নয়, পুরুষ হয়ে বলেছেন, ‘কোন কালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারি,/প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয়-লক্ষ্মী নারী।’ এ জগতে নারীহীন কোনো পুরুষ যেমন সাফল্য লাভ করেনি, ঠিক তেমনি কোনো পুরুষবিদ্বেষী নারীও তেমন চরম সফলতা পায়নি। কারণ নারীহীন পুরুষ যেমন, পুরুষহীন নারীও তেমনি বিকলাঙ্গ, অর্ধেক। মায়ের কথায় আমার দেহমনের সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণা মুহূর্তে মাটি হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ করতে সৈন্যরা মাথায় হেলমেট পরে, পুলিশ-মিলিটারি নানা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে। গ্রামের গৃহবধূরা প্রিয়জনকে কাঁঠাল খাওয়াতে তেল মাখে যাতে হাতে আঠা না লাগে। মায়ের সেদিনের সেই উপদেশ বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট নয়, আমার গায়ে কামানের গোলা ফেরানো বর্ম হয়ে আজও কাজ করে। মুক্তিযুদ্ধ এবং সরকারি কোটা নিয়ে বলছিলাম। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সম্মানী ভাতার আমার দাবি আওয়ামী লীগ মানেনি। পরবর্তী বিএনপি সরকার এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় দু-তিন শ টাকা সম্মানী ভাতা বরাদ্দ করে কার্যক্রম শুরু করেছিল। মন্ত্রণালয় তারা গুরুত্ব দিয়ে করেনি তার প্রমাণ মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রথম মন্ত্রিত্ব দেওয়া হয়েছিল একজন মুসলিম লীগ পরিবারের সন্তান এবং পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছিল প্রতিমন্ত্রীর। একজন ভালো নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বসম্পন্ন পূর্ণমন্ত্রী দিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় শুরু করলে আজকের এই লেজেগোবরে অবস্থা হতো না। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি করতে করতে এখন ১০ হাজারে এনেছে। কিন্তু আমি যখন ২০০০ চেয়েছিলাম তখন অর্থের যে মূল্য ছিল সে বিচারে এখন ৫০ হাজার টাকা হলে তবে সম্মানজনক হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঢাকা আর্মি স্টেডিয়ামে মুক্তিযোদ্ধাদের ডেকে বলেছিলেন, শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নয়, তাদের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদেরও সুবিধা দেওয়া হবে। চেষ্টাও তিনি করছেন তা অস্বীকার করা যায় না। তবে আশপাশে দুষ্ট লোক থাকায় তার চেষ্টা তেমন সফল হচ্ছে না। তিনি শুধু যুদ্ধাহতদের নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধিরও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে যত গোলমাল থাকুক সরকারি তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হচ্ছে, যা ৫০ হাজারের ওপরে হওয়া উচিত ছিল। যারা খেতাব পেয়েছেন তাদের জন্য দু-তিন বছর ধরে সম্মানী দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বুঝতে পারলাম না দেশের প্রধান নেতা, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা বড়, না কোনো রাজাকারের ছেলে সাবেক সচিব বড়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ফাইলে নোট দিয়ে গেছেন মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত, খেতাবপ্রাপ্ত এই তিন ক্যাটাগরির মধ্যে যে ক্যাটাগরিতে সর্বোচ্চ ভাতা হবে সেটাই পাবেন। এখানে মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা যাই হোন না কেন। কী দেশে বাস করি! হবুচন্দ্র রাজার গবুচন্দ্র মন্ত্রীদের আমলেও বোধহয় এমন ছিল না। সাদা চোখেই দেখা যায় মুক্তিযোদ্ধা না হলে কেউ যুদ্ধাহত হতে পারে না। কারণ যে মুক্তিযোদ্ধাই নয়, সে যুদ্ধাহত হবে কী করে। তাহলে প্রথমে তাকে মুক্তিযোদ্ধা হতে হবে তারপর আহত হওয়ার ব্যাপার। একজন মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বসূচক খেতাব পাওয়া আরও কঠিন। যুদ্ধ করতে গেলে কোনো না কোনোভাবে আহত-নিহত হতে হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধার সাহসিকতা খেতাব খুব একটা সহজ নয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং খেতাবপ্রাপ্ত তিন ক্যাটাগরিতেই পড়ি। কারণ আমি আহত হয়েছি, খেতাব পেয়েছি, যুদ্ধ করেছি। আমি মুক্তিযোদ্ধার ভাতা পাই না, খেতাবপ্রাপ্তেরও নয়। পাই শুধু যুদ্ধাহতের ভাতা। খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বীরউত্তমের সম্মানী ২৫ হাজার। কিন্তু যুদ্ধাহত ক্যাটাগরিতে আমি ৩০ হাজার সম্মানী পাই। মুক্তিযোদ্ধার ১০ হাজার, খেতাবের ২৫ হাজার পাই না। আমার মতো হাবিবুর রহমান তালুকদার বীরপ্রতীক, আবদুল্লাহ বীরপ্রতীক, আনোয়ার হোসেন পাহাড়ী বীরপ্রতীক ওরাও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। ওরাও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পায় না, খেতাবেরও নয়। ওরা পায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা ভাতা পাবেন, খেতাবপ্রাপ্তরা পাবেন, যুদ্ধাহতরাও পাবেন। কিন্তু রাজাকারের ছেলের সিদ্ধান্ত তিন ক্যাটাগরির সর্বোচ্চ যেটা সেই একটা পাবে। কী বিপুল ক্ষমতা তার! কত দল বদল হয় কিন্তু রাজাকারের ছেলের সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত কেউ বদলাতে পারেনি। কারণ সরকারে যারা আছেন তাদের চিন্তা-চেতনার বড় বেশি অভাব। আসা যাক অতিসম্প্রতি দেশের কোটা সংস্কারের আন্দোলন নিয়ে। সরকার দেখছে এটা লন্ডন ষড়যন্ত্র হিসেবে। লন্ডন কেন, সৌদি আরব ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখলেও কিছুই যায়-আসে না। এটা সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিক্ষুব্ধ হয়ে বলেছেন, ‘মেয়েরাও রাস্তায় নেমেছে।’ একটু চিন্তা করা দরকার কেন তারা নেমেছেন। মতিয়া চৌধুরীর মতো একজন অসংলগ্ন মানুষের সবাইকে ‘রাজাকারের বাচ্চারা’ বলার পর ওভাবে রাস্তায় নেমে না এলে বাঙালির শৌর্য-বীর্যের কোনো মূল্য থাকত? মোটেই থাকত না। কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল চায়নি, কোটা সংস্কার চেয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অভিমানের সুরে সংসদে যা বলেছেন আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা বুঝতে পারেনি তেমন নয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কি ওভাবে সংবিধানে উল্লিখিত কোটা পদ্ধতি বাতিল করে দিতে পারেন? অনগ্রসরদের কোটা, প্রতিবন্ধীদের কোটা, যারা দেশের জন্ম দিয়েছে সেই মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা? পৃথিবীর সব দেশে কোটা আছে এবং থাকবে। ভারতীয় সংসদে সংসদ সদস্যদেরও কোটা আছে। তাই রাগ করে বললাম কোটা বাতিল করে দিলাম। ছেলেমেয়েগুলো কিন্তু তা চায়নি। এখানে বিএনপির উসকানি ভাবলে ভুল হবে। কোটাবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নিষ্ক্রিয়তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। রাজনৈতিক দলের কাজ জনগণের যুক্তিসংগত যে কোনো দাবির পক্ষে দাঁড়ানো। বিএনপি সে দায়িত্ব পালন করেনি, তাদের ছাত্র সংগঠনও করেনি। তাই সমস্ত কোটা বাতিল করে দেওয়ার ঘোষণা খুব একটা যুক্তিসংগত নয়। নির্বাসিত জীবনে দিল্লি ছিলাম বহুদিন। ওখানে নেশাখোরদের রাতের কথার কোনো মূল্য দেওয়া হয় না। বলা হয় ‘মাতালের রাত কি বাত, বাত কি বাত’। সংসদে অনেক কথা হয়। কিন্তু সব কথার কোনো মূল্য নেই যতক্ষণ তা আইনে রূপ দেওয়া না হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছা করলেই কি সংবিধান বাতিল করতে পারেন? রক্তের দামে কেনা আমার দেশ অর্থ বা স্বার্থের দামে বিক্রি করে দিতে পারেন? কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যে কোনো সাধারণ নাগরিক হাই কোর্টে রিট করে দিলেই সব বাতিল হয়ে যাবে। তাহলে কি কোটাবিরোধী যুক্তিযুক্ত আন্দোলনকে অন্য খাতে প্রবাহিত করতে এটা একটা কৌশল? কৌশল করে কেউ কখনো পার পায় না। শুনতে অবাক লাগে, শতকরা ৫৬ ভাগ কোটা। পাকিস্তানে আমরা ছিলাম শতকরা ৫৬ জন, পশ্চিম পাকিস্তানিরা ৪৪। তারা সমস্ত পাকিস্তান দখল করেছিল। এখন ৫৬ জনের কোটা আর সব ৪৪ জনের মধ্যে এ কি হয়? দেশের মানুষ শতকরা ৫৬ ভাগ কোটা চায় না, ঠিক তেমনি কেউ গোস্সা করে সমস্ত কোটা বাতিল করে দেবেন এটা সংবিধানবিরোধী। কেউ মেনে নেবে না। কোটা থাকতে হবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত না হোক যত দিন বাংলাদেশ থাকবে তত দিন মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকবে। সেটা ৩০ ভাগ না হোক ২০ ভাগ, ২০ ভাগ না হোক ১৫ ভাগ। কিন্তু কোটা থাকতেই হবে। সরকার বদল হবে প্রতিবন্ধী কোটা বদল হবে না, অনগ্রসরদের কোটা বাতিল করা চলবে না। দেশবাসীকে রাজাকারের বাচ্চা বলায় আগামী এক মাসের মধ্যে বেগম মতিয়া চৌধুরীকে মন্ত্রিসভা থেকে বরখাস্ত না করলে সরকারকে চরম পরিণতির জন্য দায়ী থাকতে হবে।

লেখক : রাজনীতিক।