দক্ষিণ এশিয়ায় নির্যাতনের শীর্ষে বাংলাদেশের নারী

 ২১ মে ২০১৮ সোমবার  ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নারীরা পারিবারিক সহিংসতা (শারীরিক বা যৌন নির্যাতন) শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছেন। এক্ষেত্রে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের পরই আছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নাম। তবে স্বামী বা জীবনসঙ্গীর হাতে নারীদের নির্যাতনের হার পাকিস্তান ও নেপালের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি। নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, সঙ্গীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার ভুক্তভোগী নারীর সংখ্যা এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। আর সিঙ্গাপুরে তা সবচেয়ে কম। অন্যদিকে ভারতের তুলনায় নেপালে নারীদের জীবনসঙ্গীর হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার মতো ঘটনা তুলনামূলক কম। এমনকি জীবনসঙ্গীর হাতে নির্যাতনের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশ-ভারতের চেয়ে ভালো। গত ৯ মে ২০১৮-তে প্রকাশিত ‘গুটম্যাচার-ল্যান্সেট কমিশন’ রিপোর্ট অন সেক্সুয়াল অ্যান্ড রিপ্রোডাকটিভ হেলথ অ্যান্ড রাইটস’ শীর্ষক জরিপে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। গত এক বছরে এবং জীবনের কোনো একটি সময়ে জীবনসঙ্গীর মাধ্যমে সহিংসতা ও নির্যাতনের (শারীরিক বা যৌন নির্যাতন) শিকার হয়েছেন এমন নারীদের তথ্য-উপাত্ত এই গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীদের নির্যাতনের হার শতকরা ৫১ শতাংশ। আর কানাডায় এই হার মাত্র ১%। বাংলাদেশে কিছু নারী আবার গর্ভবতী অবস্থাতেও স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এক্ষেত্রে সন্তানের নিজ বাবাই সেই নারীকে নির্যাতন করেন। চলতি বছরের শুরুতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা আইসিডিডিআরবি আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।  ‘মেজারিং দ্য ইফেক্ট অব এইচইরেসপেক্ট : অন ইন্টারভেনশন অ্যাড্রেসিং ভায়োলেন্স এগেইনস্ট ফিমেইল গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ইন ফোর ফ্যাক্টরিস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের হার প্রকট। চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর হাতে নির্যাতনের হার শতকরা ২৭ শতাংশ। আর পোশাক খাতে কর্মরত নারীদের স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের হার আরও বেশি। এই খাতের মোট নারী শ্রমিকদের শতকরা ৫৩ শতাংশই স্বামীর মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এর ফলে নারী শ্রমিকদের মধ্যে বিষণ্নতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গার্মেন্টের মোট ৪০ শতাংশ নারী এই কারণে বিষণ্নতায় আক্রান্ত হচ্ছেন। দেশের মোট চারটি কারখানার মোট ৮০০ জন নারী শ্রমিককে নিয়ে এই গবেষণা জরিপটি পরিচালিত হয়। আইসিডিডিআরবির গবেষক ড. রুচিরা তাবাসসুম নভেদ জানান, গবেষণাটি করতে গিয়ে স্বামীর হাতে নির্যাতনের কথা বলেছেন এমন প্রায় ৪০ শতাংশ গার্মেন্ট নারী কর্মীর মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ দেখতে পেরেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে নারীদের বিবাহবিচ্ছেদের হারও অতীতের চেয়ে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর অন্যতম কারণ তুলনামূলক শিক্ষিত ও কর্মক্ষম নারীরা সামাজিকতা ও লোকলজ্জার ভয়ে এখন আর স্বামীর নির্যাতন সহ্য করছেন না। বরং এর বিরুদ্ধে তারা প্রতিবাদও শুরু করছেন। কেউ কেউ নির্যাতনের ভুক্তভোগী না হয়ে বিচ্ছেদের আবেদনও করছেন। তবে সমাজের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণিটি স্বামী কর্তৃক নির্যাতনের প্রতিবাদ করলেও নিম্নবিত্ত, অসহায়, কর্মহীন ও গ্রামের নারীরা এখনো স্বামীর হাতে শারীরিক, মানসিক ও জোরপূর্বক যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। স্বামীর পাশবিক নির্যাতনে আবার অনেকের মৃত্যুও হচ্ছে। নির্যাতনের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা স্ত্রীর কাছে স্বামীর যৌতুক দাবি, পরকীয়া সম্পর্ক, মাদকাসক্তি এবং অকারণে স্ত্রীকে সন্দেহ করার জন্য সৃষ্ট বাকবিতণ্ডাকে চিহ্নিত করেছেন। তবে তুলনামূলক কম শিক্ষিত এবং শুধু গৃহকর্মের সঙ্গে জড়িত নারীরা বেশি নির্যাতিত হচ্ছেন এবং তারা বিচ্ছেদেও যাচ্ছেন না। এই নারীরা আপস করে হলেও সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পারিবারিক বন্ধন বিষয়ে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক জগতে পরিবর্তন এসেছে। আগে ব্যক্তির চেয়ে পরিবারকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। বিয়েকে মনে করা হতো জন্মান্তরের বন্ধন। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় এই দর্শনে এখন পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে একটি দম্পতির মধ্যে বেশ কিছু বিষয়ে মতানৈক্য হলে তারা এখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ফলে একটি তিক্ত সম্পর্ক টেনে না নিয়ে নির্যাতনের শিকার নারী এখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন।