‘আম্মা, আব্বা গো, আমারে বাঁচাও; সৌদি আরব থেকে ফোনে আকুতি নবীগঞ্জের কল্পনার

 ১৮ ফেব্রুয়ারি  ২০১৭,  শনিবার সহ দেখতে ক্লিক করুন

ছনি চৌধুরী, হবিগঞ্জ প্রতিনিধি:

সৌদি আরবে ‘গৃহপরিচারিকা’র কাজে যাওয়া তরুণী কল্পনা দুই মাসের মাথায় ফোন করেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে বাবা-মায়ের কাছে। ফোন করেই বলেন, ‘আম্মা, আম্মা গো, আমারে বাঁচাও তাড়াতাড়ি। আমারে বেইজ্জতি থাইকা বাঁচাও বাবা আমারে বাঁচাও।’ তরুণীর আধা ঘণ্টাব্যাপী মুঠোফোনের কথাবার্তা ও আত্মীয়স্বজন সূত্রে জানা গেছে, দরিদ্র বাবা- মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে কল্পনা ঢাকার গ্রিন বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে গত ৬ ডিসেম্বর গৃহপরিচারিকার চাকরি নিয়ে সৌদি আরবের দাম্মামে যান। কিন্তু তাঁকে গৃহপরিচারিকার কোনো কাজ দেওয়া হয়নি। হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানের ১৯ নারীর সঙ্গে তাঁকেও বন্দি করে রাখা হয়। সেখানকার দালাল তাদের তিন-চারদিনের জন্য একেকজন সৌদি নাগরিকের কাছে ভাড়া দেয়। এরপর শুরু হয় তাঁদের ওপর শারীরিক ও পাশবিক নির্যাতন। সেখানে তাদের উপার্জিত অর্থও দালালরা নিয়ে যায়। কেউ কোনো প্রতিবাদ জানালে তাঁকে কিল-ঘুষি- লাথি মেরে আঘাত করা হয়। কল্পনা বিষয়টি মুঠোফোনে তাঁর বাবা-মাকে জানিয়ে তাঁর উদ্ধার করার আকুতি জানান। পাশাপাশি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানসহ রাজনৈতিক নেতাদের কাছে যাওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। এরপর তরুণীর দরিদ্র বাবা-মা নেতাদের কাছে মুঠোফোনের কর্তাবার্তার আধা ঘণ্টার রেকর্ড নিয়ে দৌড়ালে তাঁরা তাঁদের মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করতে বলেন। দেশীয় দালালদের কাছ থেকে খবর পেয়ে সৌদি আরবের দালালরা কল্পনার কাছ থেকে মুঠোফোন নিয়ে যায়। পুলিশ বিষয়টি সিআইডি সিলেট ব্র্যাঞ্চকে বিষয়টি অবগত করে। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জের দুই নারীকে বিদেশে পাচারের অভিযোগে মানব পাচার চক্রের তিন সদস্যকে আটক করেছে সিআইডি পুলিশ। আটকরা হল, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার শায়েস্তাগঞ্জ থানার ফরিদপুর গ্রামের রমিজ আলীর পুত্র আবু তাহের (৪৫), কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কাওলিয়া গ্রামের আলহাজ্ব আব্দুল হাশিমের পুত্র এরশাদ উল্লা (৫০) ও ফেনীর সোনাগাজি উপজেলার বাগদানা গ্রামের মাষ্টার সিরাজুল ইসলামের পুত্র শাহজানুর (৪০)।বুধবার দুপুর ২টার দিকে সিলেট সিআইডি ব্র্যাঞ্চের এসআই সুমন মালাকারের নেতৃত্বে একদল পুলিশ ঢাকার পল্টন এলাকার গ্রীণ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল হোটেল থেকে তাদের আটক করেন। এ সময় আয়েশা আক্তার (১৭) নামের এক কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়। আয়েশা আক্তারসহ আটক ৩ আসামীকে বৃহস্পতিবার বিকালে হবিগঞ্জ কোর্টে প্রেরণ করা হয়। ভিকটিম আয়েশা সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত সুলতানার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। দালাল বলেছিল, সৌদি আরবে গৃহপরিচারিকার কাজ করলে মাসে পাবে ২০ হাজার টাকা বেতন। বছরে একবার দেশে আসতে পারবে। পাবে দুই ঈদের বোনাস কিন্তু সে সব হয়নি। দালাল ইয়াকুবকে ধরতে সিআইডি নজরদারি বাড়িয়েছে। 

নির্মম নির্যাতনের সাক্ষী নবীগঞ্জের কল্পনা: 

সৌদি আরবের দাম্মাম শহর থেকে সিআইডির বিশেষ টিম পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে কল্পনাকে উদ্ধার করেছে। সেখান থেকে তাকে হবিগঞ্জ আদালতে এনে হাজির করা হবে বলে জানা গেছে তার পারিবারিক সুত্রে। সুদূর সৌদি আরবের দাম্মাম থেকে নবীগঞ্জে মায়ের কাছে মেয়ে কল্পনার টেলিফোনে কথোপকথন । এ টেলিফোন পেয়ে দিশাহারা পিতা-মাতা। কল্পনার ভাষায় এটি যমঘর। নির্যাতন আর নির্মমতায় তার প্রাণ ওষ্ঠাগত। মানুষরূপী আজরাইল দাঁড়িয়ে আছে জান কবজ করতে। বিদেশ বিভুঁইয়ে এমন করুণ পরিস্থিতির শিকার কল্পনা। স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন সৌদি আরব। পরিবারে সচ্ছলতা আনতে নবীগঞ্জেরই দালাল সেকুলের মাধ্যমে হাসিমুখে সৌদি আরব যান তিনি। কে জানতো সেখানে গিয়ে তার হাসি পরিণত হবে কান্নায়। কল্পনার বেলায় সেটাই ঘটেছে। কিন্তু কল্পনার করুণ এ কাহিনী শুনে এগিয়ে আসেন হবিগঞ্জ-সিলেটের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী । খবর পেয়ে পররাষ্টমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, স্বরাষ্টমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পরিকল্পনা মন্ত্রী আ.হ.ম মোস্তফা কামাল, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম কল্পনাকে উদ্ধারে সচেষ্ট হন। তারা সৌদি আরবস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস, বাংলাদেশস্থ সৌদি দূতাবাস ও সিআইডিকে ঘটনার বিবরণ জানান। সিআইডির এডিশনাল ডিআইজি মো. শাহ আলম বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব নেন। হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার গজনাইপুর ইউনিয়নের কায়স্থগ্রামে কল্পনার বাড়ি। তার পিতা এবাদ মিয়া মাছ বিক্রি করে কোনো রকমে সংসার চালান। এবাদ মিয়ার দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। সবার বড় কল্পনা বিবি। বয়স ২০ বছর। সংসারে সুখ আনতেই মেয়েকে পাঠান। এতে নবীগঞ্জ রাইয়াপুর গ্রামের দালাল সেকুল মিয়া ও গ্রীন বেঙ্গল ট্র্যাভেলসের এমডি জাকির হোসেন পাটোয়ারীকে আসামি করা হয়। দালাল সেকুল জানায়, ৫০ হাজার টাকা দিলে সে আমার মেয়েকে সৌদি আরব পাঠাবে। সেখানে এক সৌদিয়ানের বাড়িতে রান্নার কাজ করতে হবে। বেতন হবে ২০ হাজার টাকা। আমি সেকুলের কথা বিশ্বাস করে স্বজনদের কাছ থেকে ধারকর্জ করে গত বছর ১২ই জুন ৫০ হাজার টাকা ও কল্পনার ছবি দেই। কল্পনার পাসপোর্ট নং- ০৩৪৮৩১৫ এরপর সেকুল ঢাকায় নিয়ে যায় কল্পনাকে। সেখানে প্রায় একমাস রেখে বিদেশে কাজের ট্রেনিং দেয়। পরে ৫ই ডিসেম্বর সকালে আমার বাড়ি এসে কল্পনা বিবি ও সোহেনা বেগমকে ঢাকায় নিয়ে যায়। ৬ই ডিসেম্বর রাত ১টায় কল্পনা সৌদি আরবের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করে। এর বেশ ক’দিন পর এক সন্ধ্যায় কল্পনা আমার অপর মেয়ে সোহেনা বেগমের মোবাইলফোনে কথা বলে। এসময় তার মা ও আমার সঙ্গেও কথা হয় কল্পনার। ফোনে কল্পনা জানায়, সৌদি আরব যাওয়ার পর তার কফিল তাকে একেক দিন একেক বাড়িতে দিয়ে দেয়। এছাড়া, অন্যান্য দিন একটি কক্ষে আটক করে রাখে। যেখানে তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। কথায় কথায় মারধর, কিল, ঘুষি, লাথি নিত্যদিনের চিত্র। ওই কক্ষে তার সঙ্গে আরো ১৯ থেকে ২০ জন রয়েছে বলেও সে জানায়। যাদের বেশির ভাগের বাড়ি সিলেটের বিভিন্ন জেলায়। এরপর থেকে কল্পনার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হচ্ছে না বলে জানান এবাদ মিয়া।

কল্পনার ফোন বক্তব্য তুলে ধরা হলো:

আম্মা, আম্মাগো আমারে বাঁচাও। সেকুল আমারে দালালের কাছে বেঁচে দিয়েছে। দাম্মামে একটি ঘরে আমাদের আটকে রাখা হয়। এছাড়া একেক দিন একেক বাড়িতে পাঠানো হয়। আম্মা আমারে যদি জীবিত দেখতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি আমারে দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো। ওরা আমাকে মেরে-ধরে শেষ করে দিচ্ছে। বেইজ্জত করছে। এখন যে বাড়িতে আছি ওই বাড়ির মহিলারে বলে তোমাদের কাছে ফোন করছি। আর হয়তো ফোন করতে পারবো না। দ্রুত আমাকে দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো। কল্পনা বলেন, আম্মাগো ওরা জানোয়ার। এরপর তার বাবার সঙ্গে কথা বলেন, ‘আব্বা আমাকে বাঁচাইবানি। আব্বা আমারে বাঁচাইলে সেকুলের বাড়ি যাও। ওরে বলো আমারে ফিরাইয়া আনতে। দুইদিনের মধ্যে যদি আমাকে দেশে না নিতে পারো তাহলে আমারে আর খুঁজে পাবে না। সেকুল কণ্ট্রাক করে আমাদের বিদেশ পাঠাইছে। আমাদের বিভিন্ন বাড়িতে পাঠায় আর টাকা নেয় কফিল। আমাকে দেশে না নিলে ফাঁস দিয়ে মরবো। একেক বাড়ি থেকে নিয়ে আমাদের রাখে ওদের অফিসে। ওটা একটা যমঘর। খাওন দেয় না। একটা রুটি ঢিল মারে। ওইটা খাইয়া থাকতে হয়। তোমরা যদি আমারে দেখতে চাও তাহলে তাড়াতাড়ি দেশে নেয়ার ব্যবস্থা করো।’ টানা ৩১ মিনিটের ওই টেলিফোন কথাবার্তায় বেশির ভাগ সময়ই কল্পনা হাউ মাউ করে কেঁদেছেন। আর তাকে উদ্ধারের আকুতি জানিয়েছেন।

এমপি কেয়া চৌধুরী বললেন:

হবিগঞ্জ-সিলেটের সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী বলেছেন, গত সোমবার রাতে পাগলের মতো কল্পনার মা-বাবা আমার বাসায় ছুটে আসেন। রাত তখন সাড়ে ১১টা হবে। দেখি তারা হাউমাউ করে কাঁদছেন। তারা ঘটনা বিস্তারিত জানান। আমি সঙ্গে সঙ্গে হবিগঞ্জের এসপি জয়দেব ভদ্রকে ফোন করি। তার কাছে সহযোগিতা চাই। তিনি আমাকে জানান, যেহেতু এটা বিদেশের ব্যাপার সেহেতু এটা উপরের সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে তিনি সিআইডির ডিআইজি শাহ আলমের ফোন নাম্বার দিয়ে উনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। বিষয়টি আমি শাহ আলমকে জানাই। তার পরামর্শে মামলা করাই। এরপর আমি পররাষ্ট প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করি। জানতে পারি তিনি দেশে নেই। তারপরও প্রতিমন্ত্রীর কাছে মামলার কাগজপত্র ও কল্পনার রেকর্ডকৃত কথা ম্যাসেঞ্জারের মেসেজে পাঠাই। মঙ্গলবারই সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে দেখা করি। উনাকে বিষয়টি জানাই। তিনি আমাকে লিখিতভাবে জানাতে বলেন। মন্ত্রীর কাছেও আমার প্যাডে লিখিতভাবে বিস্তারিত জানাই। তিনি সেদিনই সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাসকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। সংসদে পরিকল্পনা মন্ত্রী আ.হ.ম মোস্তফা কামালও বিষয়টি শুনে আমার কাছে লিখিত চান। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হন। বুধবার সকালে পররাষ্ট মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক আমাকে ফোন করেন। বিস্তারিত কথা হয় তার সঙ্গে। ওদিকে সিআইডির ডিআইজি শাহ আলমও আমাকে ফোন করে আসামিদের গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এরই প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার সকালে নয়াপল্টনের গীন বেঙ্গল ট্র্যাভেল এজেন্সিতে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে জাকিরকে গ্রেপ্তার ও আয়েশা নামের আরেক মেয়েকে উদ্ধার করা হয়। এমপি কেয়া চৌধুরী বলেন, আমি বৃহস্পতিবার সংসদে এ নিয়ে কথা বলেছি। কেউ যেন না জেনেশুনে কোনো মেয়েকে বিদেশ না পাঠায় এ আহ্বান রেখেছি। তিনি বলেন, খুব দ্রুত কল্পনাকে উদ্ধার করতে পারা সরকারের বিরাট একটা সফলতা।