এক গর্ত ভরাটেই ৩৭ লাখ

 ০৯ আগস্ট  ২০১৭, বুধবার সহ দেখতে ক্লিক করুন

হাসিবুর রহমান রুবেল, কুষ্টিয়া:

প্রকল্পের নাম কুমারখালী ডিগ্রি কলেজের গর্ত ভরাট। এতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৩৭ লাখ টাকা। কাগজে-কলমে গর্ত ভরাটের শতভাগ কাজ সমাপ্ত হয়েছে এমন প্রতিবেদন জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। আর বরাদ্দের পুরো টাকা প্রকল্পের চেয়ারম্যান তুলে নিয়েছেন।

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মাহমুদুল ইসলাম বলেন, গর্ত ভরাটের বরাদ্দের পুরো টাকা প্রকল্প সভাপতি তুলে নিয়েছেন। তবে কাজ এখনো বাকি আছে। কাজ শেষ না হওয়ায় তাঁর কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা বন্ড রেখে দেওয়া হয়েছে। কাজ শেষ হলে সেই টাকা দেওয়া হবে। তবে তিনি বলেন, এই বন্ড রাখারও কোনো বিধান নেই। কলেজের অধ্যক্ষ শরীফ হোসেন বলেন, ‘গর্ত ভরাটের ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। এ ব্যাপারে কোনো কাগজপত্রও পাইনি।’ পিআইওর কার্যালয় সূত্র জানায়, গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষাবেক্ষণ (কাবিটা) কর্মসূচির আওতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কুমারখালী ডিগ্রি কলেজের গর্ত ভরাটের জন্য ৩৭ লাখ ৯ হাজার ৭০৮ টাকা বিশেষ বরাদ্দ ছাড় হয়। গত ২২ জুন পিআইও কার্যালয়ে এই বরাদ্দের চিঠি আসে। ২৯ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজের অনুমোদন দেন। কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সাংসদ আবদুর রউফের ডিও লেটারে কাজের প্রকল্প চেয়ারম্যান হন আলতাব মাহমুদ। তিনি সাংসদের নিকটাত্মীয়। কলেজের একটি ডোবার—৮০ ফুট দীর্ঘ, ৬০ ফুট প্রস্ত ও আট ফুট গভীর—মাটি ভরাট করার কথা। এতে মাটি কাটার শ্রমিকেরা কাজ করে টাকা পাবেন। তবে মাত্র এক দিন শেষে ৩১ জুন সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে বলে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন পাঠান। এই কাজে বরাদ্দ দেওয়া পুরো টাকা ব্যয় হয়ে গেছে

বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কার্যালয় সূত্র আরও জানায়, কাগজে-কলমে কাজ শেষ দেখানো হলেও কাজ শুরু হয় জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে। প্রায় ২০ দিন কাজ চলে। তবে মাটির পরিবর্তে গর্তে বালু ফেলা হয়। এই বালু স্থানীয় জিলাপীতলায় গড়াই নদ এলাকা থেকে ট্রাকে করে নিয়ে আসা হয়। তবে গ্রামীণ অবকাঠামোর মূল উদ্দেশ্যে বরাদ্দের টাকা মাটি কাটার শ্রমিকদের উন্নয়নের জন্য দেওয়া হয়। পিআইও মাহমুদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার চাকরিজীবনে একটি গর্ত ভরাটের বিপরীতে একটি প্রকল্পে এত টাকার বরাদ্দ এটাই প্রথম দেখলাম।’

গত বৃহস্পতিবার বিকেলে কলেজে গিয়ে কথা হয় অধ্যক্ষ শরীফ হোসেন ও উপাধ্যক্ষ বিনয় কুমার সরকারের সঙ্গে। কলেজের সামনে খোলা মাঠের সামনে থাকা একটি পুকুর ঘুরে দেখান তাঁরা। তাঁরা জানান, এই কাজের জন্য অনেক মাস আগে কলেজের সভাপতি ও সাংসদ আবদুর রউফ মৌখিকভাবে জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে কোনো সভা হয়নি। হঠাৎ জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বেশ কয়েকটি ট্রাকে করে বালু নিয়ে ডোবা ভরাটের কাজ করতে দেখা গেল। এ ব্যাপারে ইউএনওর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানিয়েছিলেন, সেখানে একটি প্রকল্পে নগদ ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছে। বালু ফেলার অংশ দেখিয়ে দুজন শিক্ষকই জানান, দেখে মনে হচ্ছে প্রস্তে ২৫ থেকে ৩০ ফুট বালু ফেলা হয়েছে। তবে দৈর্ঘ্যে ও গভীরে ঠিক আছে। বাকি কাজ কবে হবে তা তাঁরা জানেন না। কুমারখালী উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কাজ যদি ঠিকভাবে না হয়ে থাকে এবং পুরো টাকা উঠে যায়, তবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার জবাবদিহি করা উচিত। জানতে চাইলে প্রকল্পের সভাপতি ও কুমারখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলতাব মাহমুদ গত শনিবার দুপুরে বলেন, অভিযোগ সঠিক নয়। কাজ ঠিকভাবেই করা হয়েছে। আর কোনো কাজ করা হবে না। টাকাও পাওয়া গেছে। মাটি ও শ্রমিকের পরিবর্তে বালু ও ট্রাক ব্যবহারের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘এখন ট্রাকে এভাবেই কাজ করা হয় বলে জানি।’

ইউএনও মো. শাহীনুজ্জামান বলেন, কাজ পুরোপুরি বুঝে নেওয়ার পর বাকি টাকা দেওয়া হবে।