একমাত্র সাঁকোটি ৩৫ গ্রামের ভরসা

 ১৫ জুন ২০১৭, বৃহস্পতিবার সহ দেখতে ক্লিক করুন   
মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধিঃ
বর্ষায় নৌকা আর শীত মৌসুমে সাঁকো। নদী পারাপারে এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবলম্বন স্থানীয়দের। দীর্ঘদিন থেকে লক্ষাধীক মানুষের নদী পারাপারে এমন অবর্ণীয় দূর্ভোগ। সেতুর অভাবে দুই জেলার সীমান্তবর্তী ৩৫ গ্রামের মানুষের এমন বেহাল দশা। তারপরও টনক নড়ছেনা সংশ্লিষ্টদের। স্থানীয়রা প্রায় ৪৫ বছর থেকে সংশ্লিষ্ট অফিস ও ব্যাক্তিবর্গের কাছে ওই স্থানে সেতুর জন্য ধর্ণা দিচ্ছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছেনা। যাদের কাছেই যাচ্ছেন তারাই শুধু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী খলিলপুর ইউনিয়ন। ওই ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বরাক নদী (স্থানীয়দের কাছে এখন মরা গাং হিসেবে পরিচিত)। ওই নদীর ওপারে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়ন। বরাক নদীর অবস্থান অর্ধেক মৌলভীবাজার ও অর্ধেক হবিগঞ্জ জেলায়। এমন অবস্থানগত কারনে নদীর উপকারভোগী দুই জেলাবাসী। নদীটি মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলাবাসীর মিলনস্থ হিসেবেই স্থানীয়দের কাছে অনেকটাই পরিচিত। কিন্তু সেতু না থাকায় দীর্ঘদিন থেকে সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে দুই জেলাবাসীর চলছে যোগাযোগ। স্থানীয় বাসিন্ধারা জানালেন নদী পারাপারের জন্য বছরান্তে তারা ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্য বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করেন। এতে খরচ হয় প্রায় লক্ষাধিক টাকা। এলাকাবাসী চাঁদা তুলেই এর ব্যয়বার বহন করেন। এতে শীত মৌসুমে সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে পারলেও বর্ষা মৌসুমে সাঁকো ব্যবহারে থাকে মারাত্মক ঝুঁকি। তারা জানালেন নদীতে সেতু হলে মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ বাইপাস সড়ক হিসেবে এটি ব্যবহার করা যেত। বরাক নদীতে সেতু না থাকার কারণে বেশি দূভোর্গ পোহাতে হচ্ছে মৌলভীবাজার অংশের প্রায় ৫০ হাজার বাসিন্দাকে। স্থানীয় দূর্ভোগগ্রস্থরা স্বাধীনতার পর থেকে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিভিন্ন দপ্তরে সেতুর জন্য নানা দৌড়ঝাপ করেছেন। কিন্তু নদীর উপর সেতু নির্মাণের বিষয়টি আজও তা আলোর মুখ দেখেনি। তাই মৌলভীবাজার অংশের নদী তীরবর্তী কেশবচর, সাটিয়া, দেওয়ান নগর, হলিমপুর, ঘোড়ারাই, কাটারাই, কঞ্চনপুর, চাঁনপুর, নামুয়া, খলিলপুর ও সাদুহাটি এবং হবিগঞ্জ অংশের ফরিদপুর, নোয়াহাটি,সিটফরিদপুর,ধর্মনগর, আলমপুর, নাজিমপুর, ফরাসতপুর, বখশিপুর, মুকিমপুর ও সিছনপুর গ্রামসহ উভয় জেলার প্রায় ৩৫ গ্রামের বাসিন্ধারা দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এই সেতুর  কারনে অর্থনৈতিক, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগের দিক দিয়ে পিছিয়ে রয়েছে উভয় জেলার লক্ষাধীক লোজন। স্থানীয় বাসিন্ধারা জানান সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী মরহুম এম সাইফুর রহমান, সাবেক সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী মরহুম সৈয়দ মহসিন আলী’র কাছে এলাকাবাসীর পক্ষ  থেকে করা হয়ে ছিল আবেদন। এরই প্রেক্ষিতে সেতুর প্রয়োজনীয়তা যাচাই করতে তারা পরিদর্শন করে ছিলেন নদী তীরবর্তী এলাকা। সর্বশেষ গত গেল বছরের ১৫ আগষ্ট মৌলভীবাজার-৩ আসনের (সদর-রাজনগর) অংশের সংসদ সদস্য সৈয়দা সায়রা মহসিন ও হবিগঞ্জ-১ আসনের (নবীগঞ্জ-বাহুবল) অংশের সংসদ সদস্য এম এ মুনিম চৌধুরীকে অতিথি করে উভয় জেলার বাসিন্ধাদের উদ্যোগে সভা করা হয়ে ছিল।

তারা উভয়ই আশ্বস্থ করেছিলেন সেতুটি নির্মাণের। তাদের এমন প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের প্রত্যাশায় এখন অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় দূর্ভোগ্রস্থরা। জানা গেল সেতুটি হলে দূর্ভোগ লাগব হত নবীগঞ্জ র প স্কুল এন্ড কলেজ, সানফ্লাওয়ার জুনিয়র স্কুল, উদয়ন বিদ্যাপিঠ, উলখান্দি এতিমখানা, সৈয়দপুর ফাজিল মাদ্রাসা,ইয়াকুবিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ আউশকান্দি উপ-স্বাস্থ্য  কেন্দ্র, অরবিট হাসপাতাল, কেয়ার ডায়গনিষ্ট সেন্টার, ব্যাংক ও বীমাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সেবাগ্রহীতাদের। স্থানীয়রা জানালেন জেলার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের অবস্থান মৌলভীবাজার শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে। তাই মৌলভীবাজার জেলার সীমান্তবর্তী ওই ইউনিয়নের বাসিন্ধারা পার্শ্ববর্তী হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার ওই সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে স্বল্প সময়ে যোগাযোগ করা তাদের জন্য সুবিধা জনক। সেতু না থাকায় বিশেষ করে স্কুল,কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থী,মুমূর্ষ রোগী ও গর্ভবর্তী মহিলাদের জেলা সদরের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চরম দূভোর্গ পোহাতে হয় ওই এলাকার বাসিন্ধাদের। সেতু না থাকায় নিকটবর্তী নদীর ওপারের নবীগঞ্জ অংশের হাসপাতাল গুলোতে যেতে পারে না তারা। তাই বাধ্য হয়ে ৩৫ কিলোমিটার দূরের মৌলভীবাজার শহর অথবা ২৫ কিলোমিটার দূরের সরকার বাজার হয়ে শেরপুরে যেতে হয়। অথচ ওই সেতু হলে হাসপাতাল যেতে এলাকাবাসীর সময় লাগবে ১০-১৫ মিনিট। এলাকাবাসীরা জানালেন আউশকান্দি বাজারের পাশ দিয়েই ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক (প্রস্তাবিত ফোর লেইন রোড) এবং ৮ কিলোমিটার দূরে শ্রীহট্ট ইকোনমিক জোনের অবস্থান। সেতুটি হলে ইকোনমিক জোনের সাথে যেমন সহজ হবে যোগাযোগ তেমনি বেকারত্ব লাঘব হবে সীমান্তবর্তী দু’জেলার স্থানীয় বাসিন্ধাদের। আর ব্যবসা বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদনসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক দিয়ে এগিয়ে যাবে পিছিয়ে থাকা অবহেলীত ওই এলাকার লোকজন। তাছাড়া ওই সেতু হলে মহাসড়ক দিয়ে নবীগঞ্জ হয়ে সহজেই ঢাকা ও সিলেটর সাথে স্বল্প সময়ে যোগাযোগ করা দু জেলা বাসীর জন্য সম্ভব হবে। সরেজমিন ওই এলাকায় গেলে দেখা যায়, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রসার শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, শ্রমিক, চাকুরিজীবিসহ নানা শ্রেণী পেশার লোকজন ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ সাঁকো দিয়ে নদীটি পার হচ্ছেন। স্থানীয় স্কুল শিক্ষার্থীদের সাথে কথা হলে তারা বলেন বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘ সাঁকো পরাপারে স্কুলে যেতে অনেক ভয় হয়। বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টির দিনে ওই সাঁকোর কারনে স্কুলে যাওয়াও সম্ভব হয় না। কারন নদী পারাপারের জন্য ওখানে কোন নৌকা থাকেনা। তারা জানালো ওই নদীতে তাদের অনেক সহপাঠীদের বই, কলম, হাতের ঘড়ি এমনকি পায়ের জুতাও পড়ে ভেসে গেছে। কেশবচর এলাকার আব্দুস শহিদ, রফিক আহমদ, শিক্ষক আব্দুল হাই, আমিরুল ইসলাম শাহেদসহ এলাকার লোকজন জানান, সেতু না হওয়ায় মৌলভীবাজার অংশের ২২ টি গ্রামের ৫০ হাজার লোকজন উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দুই জেলার ৩৫ গ্রামের লক্ষাধীক মানুষের সার্বিক উন্নয়নের কথা বিবেচনায় নিয়ে ওই নদীতে সেতু নির্মাণের প্রত্যাশা তাদের।