প্রাকৃতির বিপর্যয়ে বালিশিরা ভ্যালির চা বাগান : দু:শ্চিন্তায় বাগান মালিক ও শ্রমিকরা

 ১৫ জুন ২০১৭, বৃহস্পতিবার সহ দেখতে ক্লিক করুন   
মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধিঃ
মাত্রারিক্ত বৃষ্টি, হাই টেম্পারেসার ও মেঘলা আবহাওয়ার কারনে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা বাগানে নতুন পাতা (সুট) আসছেনা। এতে চায়ের ভরা মৌসুমে চা পাতা না পেয়ে হতাশ মালিক ও শ্রমিকরা।
আর এর ফলে গত বছরের তুলনায় এখন পর্যন্ত ওই বাগান গুলোতে প্রায় ৩০% উৎপাদন পিছিয়ে রয়েছে বলে জানান, বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট ব্রান্স চেয়ারম্যান জিএম শিবলী। তবে এ থেকে উত্তোরনের জন্য বাগান কর্তৃপক্ষকে রোগবালাই দমনের সঠিক প্রকৃয়া মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ চা গবেষনা কেন্দ্রের পরিচালক ড.মোহাম্মদ আলী।
এখন চা পাতা তুলার ভরা মৌসুম। বছর এই সময়ে চা শ্রমিকরা হাতের মুঠি ভরে পাতা তুললেও এবছর চিত্র সম্পুর্ন ভিন্ন। যে সময়ে একজন শ্রমিকের দৈনিক ৬০ থেকে ৮০ কেজি পাতা তুলার কথা সেখানে একজন শ্রমিক ১৫/১৬ কেজির উপরে পাতা তুলতে পারছেন না। আর কোন কোন সেকশনে পাতা তুলা একেবারেই বন্ধ রয়েছে।
মৌলভীবাজারের টি এষ্টেটের বালিশিরা ভ্যালিতে সরজমিনে চায়ের অবস্থা পর্যবেক্ষন করতে গেলে সেকশনে কর্মরত নারী শ্রমিকরা এর কারণ হিসেবে জানান, বাগানের বিভিন্ন সেকশনের কোথাও মশার আক্রমন, কোথাও লাল মাকরশা আবার কোথাও কোন কারণ ছাড়াই নতুন কুড়ি গজানো বন্ধ রয়েছে। তারা জানান, এই সময়ে তাদের নিরিখ ৮৫ টাকা হাজিরার অনুকুলে ২৪ কেজি পাতা তুলার পরও তারা পাতা তুলতেন ৬০ থেকে ৮০ কেজি। অতিরিক্ত উত্তোলিত পাতার জন্য কেজি প্রতি ৪ টাকা হারে তারা দৈনিক আড়াই তিনশত টাকা আয় করেন। কিন্ত এই প্রাকৃতিক দূর্যোগে দৈনিক ৮৫ টাকার হাজিরাও উঠাতে পারছেন না। চা শ্রমিক সীমা বুনার্জী জানান, তিনি পাতা তুলেছেন ১৫ কেজি আর এর জন্য তিনি পাবেন ৬০ টাকা। এর ফলে তার দৈনিক হাজিরা ৮৫ টাকাও তিনি পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট ব্রান্স চেয়ারম্যান জিএম শিবলী জানান, বৃষ্টি ছাড়া চা উৎপাদন যেমনি সম্ভব নয় তেমনি অতি বৃষ্টি চায়ের জন্য ক্ষতিকর। অতিবৃষ্টিতে সেকশনের উপরের মাটি ধুয়ে যায়। এ ছাড়াও অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও চায়ের জন্য খুব ক্ষতিকর। এবছর সর্বচ্চো তামমাত্রা পৌছে ৪০ ডিগ্রী পর্যন্ত।
আর বাংলাদেশ চা গবেষনা কেন্দ্রের পরিচালক ড.মোহাম্মদ আলী এই প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় প্রত্যেক চা বাগানের ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ম মাফিক পানি নিস্কাসন ও ঔষধ ব্যববারের নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি জানান, এবছর চা মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি পাওয়া যায়নি। পরে যে বৃষ্টি পাওয়া গেছে তা মাত্রারিক্ত। যা উপকারের চেয়ে ক্ষতি করেছে বেশি। অত্যাধিক বৃষ্টির কারনে ওয়াটার লগ হয়ে গাছের গ্রোথ কমে যায়। আর ২৮ ডিগ্রীর উপরে টেম্পারেসার হলে গাছের বর্ধন বন্ধ হয়ে যায়। এ বছর বেশিভাগ সময়েই টেম্পারেসার ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রী সেলসিয়ারস ছিলো। আর এ অনিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার কারনে বিভিন্ন সেকশনে চা পাতা গজানো স্থগিত হয়ে আছে। আর প্রকৃতিতে এ অবস্থা হলে চা বাগানে মশা ও লাল মাকরশা বেড়ে যায়। লাল মাকরসায় আক্রমনের ফলে পাতা লালচে হয়ে যায়। তখন পাতা যে পরিমান খাদ্য তৈরী করার কথা তা করতে পারেনা ফলে বন্ধ হয়ে যায় নতুন সুট। আর মশা পাতার সবুজ অংশ (মেন্টেইনেন্স লিপ) খেয়ে ফেলে । তিনি জানান, এ সময় যদি টেম্পারেসার ৩০ ডিগ্রীর উপরে চলে যায় তখন একটি মাকরসা বংশবৃদ্ধি করে বাচ্চা পরিপূর্ণ করা পর্যন্ত ১৫ দিনের স্থলে ৭ দিনেই তা সম্পন্ন হয়। এতে এর উপদ্রব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আর তিনদিন ধরে চা বাগান এলাকায় ৩০ থেকে ৩৬ ডিগ্রীতে উঠা নামা করছে। আবার সানের পরিমান যদি কমে যায় আর্থাৎ দীর্ঘক্ষন মেঘলা আবহাওয়ায়ও থাকে তখনও মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। তখন তারা নতুন কুড়ি খেয়ে ফেলে। আর তা এ বছর কাঙ্কিত উৎপাদনের প্রধান অন্তরায়।
এ সময় এর করনীয় হিসেবে তিনি জানান, সার দেয়ার পর পর বৃষ্টি হয় ফলে সার ধুয়ে নিয়ে যায় তাই লক্ষ রেখে পুনরায় সার দিতে হবে। অতি বৃষ্টি হলে অনেক সময় ওয়াটার লগ হয়ে পড়ে তাই সব সময় ড্রেন পরিস্কার রাখতে হবে। সেকশন যদি ফ্লাড এলাকায় হয় তাহলে ক্রস ড্রেন করতে হবে। রেডস্পাইডারের জন্য যে কেমিক্যাল ব্যবহার হয় (মেজিষ্টার) তা ৫দিন অন্তর অন্তর দিলে ভালো হয়। আর মশার জন্য রেনুভা ব্যবহার করলে ভালো হয়। তবে একই ঔষধ বার বার ব্যবহার না করে মাঝে মাঝে তার জাত পরিবর্তন করারও পরামর্শদেন তিনি।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল এম আর খান চা বাগানের মালিক শিল্পপতি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বালিশরা ভেলীতে তার দুটি চা বাগানে নন্দ রানী ও এমআরখানে কোন কারণ ছাড়াই সুট আসছেনা। অনেক সেকশনে মাকরসা বা মশার উপদ্রব নেই তবুও সুট নেই। এর ফলে এ বছর তারা লক্ষমাত্রা অর্জন করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে শংকিত রয়েছেন।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষ হারুন অর রশিদ জানান, মৌলভীবাজারের গড় তাপমাত্র ৩৫ ডিগ্রী সেলসিয়ারস। এ সময় তিনি জানান, চলমান জুন মাসে প্রথম সাপ্তাহে তারা বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছেন ৩৩২ মিলিমিটার আর মে মাসে বৃষ্টি রেকর্ড করেছিলেন ৩৫৫ মিলিমিটার। এ দুটিই চায়ের জন্য ক্ষতিকর।
তবে বাংলাদেশ চা গবেষনা কেন্দ্রের পরিচালক ড.মোহাম্মদ আলী আশা প্রকাশ করে বলেন, নিয়ন মেনে পরিচর্যা ও আগামী সময়ে আবহাওয়া অনকুলে থাকলে এ ঘাটতি মোকাবেলা করে লক্ষমাত্রা অর্জন সম্ভব।