জীবিত বাবাকে মৃত বানিয়ে মাদক ব্যবসায়ীর জামিন নিয়ে তোলপাড়

 ৪ জুন ২০১৮ সোমবার  ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্ক

মাদক ব্যবসায়ী ছেলে জীবিত বাবাকে মৃত বানিয়ে প্রত্যয়নপত্র দাখিল করে আদালত থেকে জামিন নেওয়ায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি ঘটিয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার ধর্মগড় ইউনিয়নের চেংমারি গ্রামের মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে মাসুদ রানা বাবু (২৮)।

মামলার নথির তথ্য সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ মার্চ মাসুদ রানা ওরফে বাবুকে তার বাড়ি থেকে ৫৫ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পরদিন ডিবি পুলিশের এসআই নূর আলম সিদ্দিক রাণীশংকৈল থানায় মাদক আইনে একটি মামলা করেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয় আদালত। 

এরপর গত ১৮ এপ্রিল আইনজীবী ফজলে রাব্বী বকুল আসামি বাবুর বাবা মোফাজ্জলের 'মৃত্যুর প্রত্যয়নপত্র' ও মা রোকেয়া বেগমের 'অসুস্থতাজনিত কাগজপত্র' আদালতে দাখিল করে জামিনের আবেদন করেন। এ বিষয়ে শুনানি শেষে বিচারক বাবুকে জামিন দেন।

জেলার ১নং ধর্মগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলাম মুকুল স্বাক্ষরিত ওই প্রত্যয়নপত্রে বলা হয়- তিনি বাবুকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন ও জানেন।

'সে অত্র ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি লেখেন, আমার জানামতে তার বাবা মোফাজ্জল হোসেন গত ১৫/০৪/২০১৮ ইং তারিখে মারা গেছেন। আমি মৃতের রুহের মাগফেরাত কামনা করি।'

চেংমারি গ্রামে বাবুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা বেঁচে আছেন তবে তিনি অসুস্থ। বাবুর মা রোকেয়া বেগমও সুস্থ নন। বাবুর স্ত্রী ও এক মেয়ে রয়েছে। 

বাবুর বাবা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, আমার ছেলে গোপনে মাদক ব্যবসা করে আসছিল। এ কারণে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে ছিন্ন রয়েছে। কিছুদিন আগে ডিবি পুলিশ আমার ছেলেকে আটক করে নিয়ে যায়।

তার মৃত্যুর প্রত্যয়নপত্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি বেঁচে আছি, আমি মারা যাইনি। আদালতে আমার মৃত্যুর প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে- এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। স্থানীয় চেয়ারম্যান, আইনজীবী বা আমার ছেলে আমাকে কেউ কিছুই জানায়নি।'

ধর্মগড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম মুকুল জানান, বাবুর বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ এটা আমি জানি। মোফাজ্জলের ছেলে অর্থাৎ বাবুর ভাই তার বাবার মৃত্যুর প্রত্যয়নপত্র নিতে এসেছিল। আমি একটু ব্যস্ত ছিলাম তাই যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ব্যস্ততার মধ্যে আমি প্রত্যয়নপত্রে স্বাক্ষর করে দিয়েছি। সে যে এটি আদালতে ব্যবহার করবে আমার জানা ছিল না। পরবর্তীতে কেউ মৃত্যুর প্রত্যয়নপত্র নিতে আসলে আমি এটি খেয়াল রাখব। 

এলাকায় বাবুকে না পাওয়ায় তার মুঠোফোনে কয়েকবার ফোন করলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বাবুর আইনজীবী ফজলে রাব্বী বকুল বলেন, আসামিপক্ষ আমাকে বাবুর বাবার মৃত্যুর প্রত্যয়নপত্র দিয়েছিল। আমি তা আদালতে দাখিল করেছি এবং শুনানি শেষে আদালত জামিন দিয়েছেন। পরে শুনেছি এই প্রত্যয়নপত্রের মধ্যে ভুল তথ্য ছিল। অনেক মামলার ভিড়ে প্রত্যয়নপত্রটি যাচাই করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

তবে প্রত্যয়নপত্রটির 'ভুল' ছিল স্বীকার করে তিনি বলেন, এরপর থেকে এ ধরনের প্রত্যয়নপত্র কেউ দিলে সেটা দাখিল করার পূর্বে যাচাই করার চেষ্টা করব।

জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ ফরিদ মিথ্যা তথ্য সম্বলিত প্রত্যয়নপত্র সম্পর্কে জানান, জামিন দেওয়া না দেওয়া আদালতের ক্ষমতা। আমি বিষয়টি শুনেছি। জেলা আইনজীবী সমিতির হলরুমে আইনজীবীদের সুবিধা-অসুবিধা এজেন্ডা সম্বলিত সভায় একজন আইনজীবী জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে একজন মাদক কারবারীর জামিন নেওয়ায় আইনজীবী বকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেন। কিন্তু সময় কম থাকায় ওই বিষয়ে আলোচনা করা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

স্থানীয় সরকার ঠাকুরগাঁও-এর উপ-পরিচালক (উপ-সচিব) ড. এ.কে.এম. আজাদুর রহমান জানান, আমি এই প্রথম বিষয়টি অবগত হলাম। অভিযোগ পেলে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।