উত্তরা গণভবনের শতবর্ষী 'জীবিত' গাছ কর্তনের ঘটনায় তোলপাড়

 ১৮ অক্টোবর ২০১৭ বুধবার ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন 

অনলাইন ডেস্কঃ

মরা দাবি করে নাটোরের উত্তরা গণভবনের শতবর্ষী জীবিত গাছ কেটে সাবাড় করার ঘটনায় নাটোর জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাঞ্চলীয় কার্যালয় উত্তরা গণবভনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত এলাকায় দুইশো/তিনশো বছরের প্রাচীন বৃক্ষ অবাধে কাটার ঘটনায় সর্বত্র বইছে নিন্দা ঝড়।

নাটোরের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এসব তাজা গাছ কেটে নেয়ার দৃশ্য গণভবনের নিরাপত্তায় স্থাপিত ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধরা পড়ার পর বিভিন্ন দফতরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ঘটনা তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে মঙ্গলবার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মনিরুজ্জামান ভুঞাকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খায়রুল আলম, সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শামীম ভূঁইয়া ও এনডিসি অনিন্দ্য মন্ডল। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

এই রাজবাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপূর্ত বিভাগই মূল্যবান গাছগুলো লোক দেখানো দরপত্রের মাধ্যমে কেটে নিয়েছে। আবার এই দপ্তরের কর্মীরা গণভবনের ভেতরেই আবাস গেড়ে বসেছেন। কেউ কেউ ভেতরে গরু-ছাগল পালছেন। এক কর্মচারী আবার রাজপ্রাসাদের ঐতিহাসিক খাট নিজের মতো করে ব্যবহার করছেন।

নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন গত ৩০ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগের স্থানীয় নির্বাহী প্রকৌশলীকে চিঠি দিয়েছেন। এতে তিনি রাজপ্রাসাদকে ঐতিহাসিক ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) এবং প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাঞ্চলীয় বাসভবন হিসেবে উল্লেখ করেন। এতে আরও বলা হয়, এর ভেতরে কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। গরু-ছাগলের খামার গড়ে তুলেছেন। কোন বিধিবলে, তারা কত দিন থেকে সেখানে বসবাস করছেন, তা পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে জানাতে হবে।  

তবে ১৬ দিনেও তার জবাব আসেনি। জানতে চাইলে উত্তরা গণভবন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব নাটোরের এনডিসি অনিন্দ্য মন্ডল বলেন, কমিটিকে না জানিয়েই গণপূর্ত বিভাগ গাছ কেটেছে। বিষয়টি জানার পরপরই তারা গাছ কাটা বন্ধ করতে চিঠি দিয়েছেন।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন ও রাজশাহী গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম জিল্লুর  রহমানসহ জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গণভবন পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা পান। দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে স্থানীয় সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুলের উপস্থিতিতে গণভবন ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা হয়। এসময় তাজা গাছ কাটা এবং কম দামে নিলামে বিক্রি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম শিমুল। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

জেলা কালেক্টরেট অফিস সূত্রে জানা গেছে, উত্তরা গণভবনের চারপাশের লেকের ধারে শত বছরের অন্তত ৩০০ আম গাছ রয়েছে। এছাড়া মেহগনি, নারিকেল, কাঠ বাদামসহ আরো পাঁচ শতাধিক গাছ রয়েছে এখানে। সম্প্রতি ঝড়ে পরা এবং মরে যাওয়া দুটি আম, একটি মেহগনিসহ বেশ কিছু গাছের ডালপালার ইজারা আহ্বান করে স্থানীয় গণপূর্ত বিভাগ।

বনবিভাগের কর্মকর্তা আবু আব্দুল্লাহ দেয়া মূল্য তালিকা অনুযায়ী, মাত্র ১৮ হাজার ৪০০ টাকার টেন্ডারের বিপরীতে অন্তত ১০ লাখ টাকার ১২ থেকে ১৬টি তাজা গাছ কেটে গণপূর্ত বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তায় সরিয়ে ফেলেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সোহেল ফয়সাল।

বন কর্মকর্তা আবু অব্দুল্লাহ জানান, তিনি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে মরা, পচা ও ঝড়ে পড়া গাছের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন মাত্র।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নাটোরের দিঘাপতিয়া এলাকায় ১৯৪৫ দাগের ৪১ দশমিক ৫০ একর জমির ওপরে এই রাজবাড়ি অবস্থিত। বর্তমানে এটি এক নম্বর খাসখতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি। দিঘাপতিয়ার সর্বশেষ রাজা কুমার প্রভুনাথ ভারতে চলে গেলে ১৯৫৬ সালে প্রশাসন রাজবাড়িটি অধিগ্রহণ করে।  

১৯৬৭ সালে সরকার এ রাজপ্রাসাদকে গভর্নর হাউস ঘোষণা করে। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেটিকে গণভবনে রূপান্তর করেন। একাধিকবার এখানে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক হয়েছে। রাজপ্রাসাদের আঙিনার ভেতরে তিন শতাধিক আমগাছ, ২৫৬টি নারকেল গাছ, ১৫০টি সুপারি গাছসহ ১২ রকমের মৌসুমি ফলের গাছ রয়েছে। এ ছাড়া প্রাসাদের ভেতরে ইতালিয়ান গার্ডেনে রয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এনে লাগানো দুর্লভ প্রজাতির গাছ।

গণপূর্ত বিভাগের দাবি, গণভবনের আঙিনার ভেতর থেকে মরা ও ঝরে পড়া কিছু গাছের ডালপালা দরপত্রের মাধ্যমে তারা কেটেছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, গণভবনের বিপুলসংখ্যক গাছ কেটে নেওয়া হয়েছে। সেগুলোর গুঁড়ি দায়িত্বরত পুলিশ, আনসার ও গণপূর্ত বিভাগের কর্মচারীদের সামনে দিয়েই গণভবনের বাইরে নেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে নাটোর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহম্মদ মশিউর রহমান আকন্দ বলেন, গাছ কাটার জন্য অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী তাদের অনুমতি দিয়েছেন। বন বিভাগ ১৫ হাজার ১৯০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করেছিল। তারা ১৮ হাজার ৫০৮ টাকার দরপত্র পেয়েছেন।

তিনি দাবি করেন, কাটা গাছগুলো গণভবনের ভেতরেই রয়েছে। কয়টি গাছ কাটার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়, তা বলতে পারেননি তিনি। তবে একটি সূত্র বলেছে, মাত্র তিনটি মরা গাছ কাটার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। এ-সংক্রান্ত কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি বন বিভাগের কাছে যেতে বলেন।

ভ্যানে করে গাছ পাচার

গণভবনের গাছ লুটের বিষয়টি ধরা পড়েছে সম্প্রতি প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাটোরে আসার পর। তিনি গণভবনটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। গতকাল সোমবার থেকে উত্তরা গণভবনের প্রধান ফটকের সিসি ক্যামেরার ১৮ দিনের (২৫ সেপ্টেম্বর-১২ অক্টোবর) ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়। এতে দেখা যায়, ১৬টি ভ্যানে করে তাজা গাছের গুঁড়ি নিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ সময় পুলিশ ফটকের সামনেই বসা ছিল। এ ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, যারা গাছ পাচারের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজপ্রাসাদের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, আঙিনার বাগানের ভেতরটা জঙ্গলাকীর্ণ। এই বাগানে অন্তত ২০টি গাছ কাটা হয়েছে। বেশিরভাগ গাছের কাঠই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। জঙ্গলের ভেতরে ভ্যানগাড়ি যাতায়াতে রীতিমতো রাস্তা হয়ে গেছে। কয়েকটি জায়গায় তাজা গাছের ডাল কেটে নেওয়া হয়েছে। আর দুটি জায়গায় কেটে রাখা বেশিরভাগ গাছের গা থেকে কষ ঝরছিল। সেখানে যে পরিমাণ গাছের গুঁড়ি পড়ে থাকতে দেখা গেল, তার মূল্যই দরপত্রের মূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি হবে।  

দর মূল্যায়নের বিষয়ে বন বিভাগের নাটোর জেলা কর্মকর্তা এম এ আওয়াল বলেন, তাদের একজন কর্মকর্তা গাছের মূল্যায়ন প্রতিবেদন দিয়েছেন। তার ভুলও হতে পারে, আবার ইচ্ছাকৃতও হতে পারে। সেটা তদন্ত করা হবে। আর ওই প্রতিবেদন মৌখিকভাবে বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনিও মূল্যায়ন প্রতিবেদনের কোনো কাগজ দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

গণভবনের কর্মচারী সুজন পাল জানান, গণপূর্ত বিভাগ শুধু ভবনগুলোর দায়িত্বে থাকলেও তারা অন্যায়ভাবে গাছগুলো লিজ দিয়েছে। নিলামে কেনা ঠিকাদার শতবর্ষী অন্তত ১৫টি তাজা গাছ কেটে নিয়ে গেছেন। এছাড়া কেটে নিয়েছে বিভিন্ন গাছের মোটা মোটা ডাল।  

গণভবনে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য সোহেল হোসেন জানান, তিনি গাছের গুঁড়ি বাইরে নিয়ে যেতে বাধা দিয়েছিলেন। ওই সময় গণপূর্ত বিভাগের কর্মচারীরা নিলামের কাগজ দেখিয়ে তা ছাড়িয়ে নিয়ে যান।

ঠিকাদার সোহেল ফয়সাল জানান, তিনি কোনো অনিয়ম বা গোপনে কাঠ সরিয়ে ফেলেননি। নিয়ম অনুযায়ী গাছ কেটেছেন। গাছ কাটা ও পরিবহনের সময় জেলা প্রশাসন ও গণপূর্ত বিভাগের নিয়োগকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং পুলিশ ও আনসার সদস্যরা সার্বক্ষণিক উপস্থিত ছিলেন। গোপনে সরিয়ে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।