বিলুপ্তির পথে নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা

 ১৪ এপ্রিল ২০১৮ শনিবার  ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন
নয়ন বর্মন নেত্রকোনা প্রতিনিধিঃ

নেত্রকোনা:চড়ক পূজা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রাচীন লোকজ উৎসব।চৈত্রের শেষ দিনে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়।মূলত এটি শিবের গাজন উৎসবের একটি অঙ্গ।এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে যা চড়ক পূজা বা চৈত্র সংক্রান্তি মেলা নামে অভিহিত।জেলা শহরের মালনী ঋষিপাড়া, পুকুরিয়া মাঝি পাড়া,সাতপাই রেল কলোনি,এবং নাগড়া অঞ্চলে বংশ পরম্পরায় কয়েক শতাব্দী যাবৎ এই পূজো উৎসব চলে আসছিলো।হাজারো ভক্তের পদধূলিতে সরগরম থাকতো পূজো প্রাঙ্গন। কিন্তু স্থান সংকোচন ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক জায়গায় এই রীতি পালন বন্ধ হয়ে গেছে।তবে মালনী ঋষিপাড়া অঞ্চলের নিম্নবর্ণের হিন্দুরা আজো কোনভাবে এই ঐতিহ্যটি টিকিয়ে রেখেছেন।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহ সভাপতি জ্ঞানেশ চন্দ্র সরকার স্মৃতি চারন করে বলেন,আগে চৈত্র মাস আসলেই প্রতিদিন বাতাসে ঢাকের বাদ্য ভেসে আসতো পূজারীরা শিব-কালির সাজে সজ্জিত হয়ে শিবের পাটা ও খড়গ নিয়ে নৃত্যগীত করতে করতে সাধারণের ঘর থেকে অর্ঘ্য বা চাঁদা সংগ্রহ করতো,ছেলে বুড়ো সবাই উপভোগ করতো তাদের নাচ।সবার দৃষ্টি থাকতো চৈত্র মাসের শেষ দিবসটিকে ঘিরে,সেদিন চড়ক পূজোর বিভিন্ন লোমহর্ষক পর্ব দেখা যেতো।পূজো প্রাঙ্গনের পাশেই বসতো বাহারি পণ্যের গ্রামীন মেলা।পূজা শেষে পেটপুরে খিচুড়ি মহাপ্রসাদ খেয়ে তবেই ঘরে ফিরতো দর্শনার্থীরা।সময়ের সাথে সাথে এই সব রীতি রেওয়াজ উঠে যেতে বসায় হতাশাও প্রকাশ করেন তিনি। সনাতনীদের ঐতিহ্যবাহী চৈত্র সংক্রান্তির সাথে চড়ক পূজা একিভূত হয়ে যাওয়ার সঠিক সময় কাল সম্বন্ধে সঠিক ধারণা পাওয়া যায়না। লিঙ্গপুরাণ,বৃহদ্ধর্মপুরাণ,এবং ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে  চৈত্রমাসে শিবারাধনা প্রসঙ্গে নৃত্যগীতাদির উল্লেখ থাকলেও চড়ক পূজার কোন উল্লেখ পাওয়া যায়না।পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত গবিন্দানন্দের বর্ষক্রিয়াকৌমুদী ও রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্বেও এর উল্লেখ নেই।তবে পাশুপত সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাচীন কালে এ উৎসব প্রচলিত ছিল।উচ্চস্তরের লোকেদের মধ্যে এর প্রচলন খুব বেশিদিন হয়নি। জনশ্রুতি রয়েছে ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে রাজা সুন্দরানন্দ ঠাকুর প্রথম এই পুজোর প্রচলন করেন।কথিত আছে এইদিনে বান রাজা দ্বারকাধীশ শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে মহাদেবের প্রীতি লাভের জন্য এবং অমরত্ব লাভের আশায় নৃত্যগীতাদি ও নিজ গাত্ররক্ত দিয়ে শিবকে তুষ্ট করে নিজ অভিষ্ঠ পূরণ করেন।সেই স্মৃতিতে শৈব সম্প্রদায় এই দিনে শিবপ্রীতির জন্য উৎসব করে থাকেন।আগের দিন চড়ক গাছটিকে ধুয়ে মুছে একটি জল ভরা পাত্রে সিঁদুর পরিয়ে একটি লম্বা তক্তা(শিবের পাটা)প্রোথিত করা হয়।পতিত ব্রাহ্মণ এই পূজোয় পুরোহিতের দায়িত্ব পালন করেন।পুজোর বিশেষ বিশেষ পর্বের মধ্যে রয়েছে কুমিরের পূজা,জ্বলন্ত কয়লার উপর খালিপায়ে হাঁটা,কাঁটা আর ছুরির উপর লাফানো,বান ফোড়া,শিবের বিয়ে,অগ্নিনৃত্য,পিঠের চামড়া ভেদ করে লোহার আংটা লাগিয়ে চড়ক গাছে দোলা প্রভৃতি।  এইসব পূজার মূলে রয়েছে ভূত প্রেত ও পুনর্জন্মবাদের উপর বিশ্বাস।পূজার অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রকার দৈহিক যন্ত্রণা ধর্মের অঙ্গ বলে বিবেচিত হয়।চড়ক গাছে ভক্ত বা সন্যাসীকে লোহার আংটা বা হুড়কা দিয়ে বেঁধে দ্রুতবেগে ঘোরানো হয়।তার পিঠে ,হাতে ,পায়ে,জিহ্বায় ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গে লোহার শলাকা বিদ্ধ করা হয়।কখনো কখনো জ্বলন্ত লোহার শলাকা শরীরে ফুঁড়ে দেয়া হয়।১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার আইন করে তা বন্ধ করলেও গ্রামের সাধারন লোকের মধ্যে তা এখনো প্রচলিত আছে।