গ্রামে এখন মদ-গাঁজার হাট-বাজার

 ৬ জানুয়ারি২০১৮ শনিবার ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার পানিহাকা গ্রামের কিশোর হারুন আর রশীদ। গ্রামের আলো-বাতাসে বড় হওয়া কিশোরটি স্কুলের গণ্ডিও পেরোতে পারেনি। কিছু অসৎ সঙ্গ তাকে নিয়ে যায় মাদকে। এখন এমন অবস্থা যে, গাঁজা আর মদ ছাড়া তার দিনই চলে না। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার বাবার সামনে থেকেই ছেলেকে ইয়াবা-গাঁজাসহ হাতেনাতে ধরে পুলিশ। চোখের পানি ফেলা ছাড়া কিছুই করার ছিল না বাবার। হারুনের মতো আরও দুই কিশোরকেও আটক করে পুলিশ। অভিভাবকরাও এ ক্ষেত্রে থাকেন অসহায়। শুধু পানিহাকা গ্রামই নয়, পঞ্চগড়ের পাঁচটি উপজেলার সবগুলোর চিত্রই প্রায় এক। বিশেষ করে তেঁতুলিয়ার রণচণ্ডি, সিপাইপাড়া, হাকিমপুর, ভজনপুর, বাংলাবান্ধা যেন মাদকের আখড়া। প্রায় প্রতি পরিবারেরই দু-একজন কিশোর-যুবক মাদকাসক্ত। দেশের সর্বউত্তরের সীমান্তবর্তী এ জেলার প্রতিটি গ্রামগঞ্জেই রয়েছে মাদকের হাট। ফলে কোমলমতি কিশোর-যুবকরা পড়ার টেবিলে না বসে মদ-গাঁজার আসরে থাকতেই ভালোবাসে। মাঝে-মধ্যে পুলিশ ঝটিকা অভিযান চালিয়ে আটক করলেও আইনের ফাঁকফোকরে জামিন নিয়ে তারা আবারও মাদকে জড়িয়ে পড়ছে।  পঞ্চগড়ের সহকারী পুলিশ সুপার সুদর্শন কুমার রায়  দাবি করেন, ‘মাদকের ব্যাপারে পঞ্চগড় পুলিশ সব সময় রয়েছে জিরো টলারেন্সে। যত প্রত্যন্ত এলাকাই হোক না কেন, আমরা ছুটে যাচ্ছি। মাদকের ব্যাপারে কোনো ছাড় নয়- সে যত শক্তিশালীই হোক না কেন। আমরা মাদকাসক্তদের আইনে সোপর্দ করছি। এর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চলছে এবং চলবেই।’ একই বক্তব্য তেঁতুলিয়া মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. জহুরুল ইসলামেরও। তিনি বলেন, ‘যেখানে মাদক সেখানেই পুলিশের অভিযান। মাদকে কোনো ছাড় নয়। আমরা মাদককে নিরুৎসাহিত করতে নানা পদক্ষেপও নিচ্ছি।’

অন্যদিকে তেঁতুলিয়ার অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদকে আসক্ত সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা দারুণভাবে শঙ্কিত। ছেলেরা স্কুলে যাওয়ার কথা বলে গাঁজার আসরে চলে যায়। তাদের নানাভাবে বোঝানোর পরও কোনো লাভ হচ্ছে না। এ নিয়ে অনেক অভিভাবক নিজে থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হচ্ছেন। কেউ কেউ নিজেই ছেলেকে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তবুও বাঁধ মানছে না মাদক। তেঁতুলিয়া উপজেলার জনপ্রতিনিধি উপজেলা চেয়ারম্যান রেজাউল করীম শাহীন, সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবুল কালাম আজাদ, ইউপি চেয়ারম্যান কাজী আনিসুর রহমান, রাজনীতিবিদ কাজী মাহমুদুর রহমান ডাবলু, শাহাদাত হোসেনসহ এলাকার বিশিষ্ট নাগরিকরাও মাদক নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। তারা জানান, যে কোনো মূল্যেই হোক মাদক থেকে  কোমলমতি ছেলেদের সরাতে হবে। এ ব্যাপারে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর এলাকার প্রত্যন্ত গ্রাম বৈরাগীগজ। সেখানকার জালাল উদ্দিন নামে এক বয়োবৃদ্ধ বলেন, ‘মদ-গাঁজা কী জিনিস আমরা জানতামই না। কিন্তু এখনকার ছেলেরা সবাই এগুলো খায়। এ নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে পর্যন্ত নাজেহালের শিকার হতে হয়।’

জানা গেছে, জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে মদ-গাঁজা। নতুন করে যুক্ত হচ্ছে ইয়াবাও। প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে এসব মাদক আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখকে ফাঁকি দিয়ে এসব ব্যবসা চলছে। জেলার আটোয়ারী উপজেলার সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি গাঁজা প্রবেশ করছে। এই উপজেলায় মাদকের ব্যবসাও জমজমাট। পুরাতন আটোয়ারী, ধামোর, মির্জাপুর, বারোঘাটিসহ আরও কয়েকটি এলাকায় গাঁজার ব্যবসা জমজমাটভাবে চলছে। এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা লক্ষ্য করা গেলেও তাদের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে ধৃতদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবীগঞ্জ সদর, কালিগঞ্জ, চেংটি হাজরা, সোনাহার, চিলাহাটিসহ বেশ কিছু এলাকায় চলছে প্রকাশ্যে গাঁজার ব্যবসা। বোদা উপজেলার মাড়েয়া, রানীগঞ্জ, নতুন হাট, ময়দান দিঘী, পঞ্চগড় সদর উপজেলার রত্নিবাড়ি, হাড়িভাসা, মডেলহাট, জগদল বাজার, গোয়ালঝারসহ নানা এলাকায় এখন গাঁজার রমরমা ব্যবসা চলছে। ভজনপুর তেঁতুলিয়া উপজেলার সবচেয়ে বেশি মাদক উপদ্রুত এলাকা হিসেবে পরিচিত। এই এলাকার স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে থাকে গাঁজার পুড়িয়া। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই উপজেলাকে ‘মাদকমুক্ত উপজেলা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। গত বছর এ ঘোষণার পর থেকে ফেনসিডিলের ব্যবহার কমলেও এখন বেড়েছে গাঁজার ব্যবহার। গ্রামগঞ্জে বসছে মাদকের হাট। 

জানা গেছে, ব্যবসায়ীরা পুড়িয়া হিসেবে বিক্রি করছে গাঁজা। এক পুড়িয়া গাঁজা অর্ধেক সিগারেটের সমান। এই পরিমাণ গাঁজা বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। সুধী মহল বলছে, গাঁজা ব্যাপারটি প্রকাশ্য হয়ে উঠছে দিন দিন। পুরনো মাদক ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন ব্যবসায়ী এবং গ্রাহক তৈরি করছে। ফেনসিডিল বিক্রি বন্ধের পর গাঁজায় খুব বেশি লাভ না হওয়ার কারণে গ্রামে গ্রামে এর গ্রাহক এবং ব্যবসায়ী তৈরি করছেন তারা। জেলার পাঁচ থানায় প্রতি মাসে ১৫ থেকে ২০টি মাদক সম্পর্কিত মামলা করা হচ্ছে। গত মাসেও ২৫টিরও বেশি মামলা করা হয়েছে। আটক হয়েছে শতাধিক কিশোর-যুবক।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে নিয়মিতই গাঁজা প্রবেশ করছে তেঁতুলিয়া পঞ্চগড়ে। এক বছর আগেও গাঁজার এরকম প্রকাশ্য হয়ে ওঠার খবর ছিল না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ তত্পরতার জন্য এই এলাকার মাদকের রুটগুলো দিয়ে ফেনসিডিল আসা কিছুটা বন্ধ হলেও এখন তা বেড়েছে। এর আগে বিভিন্ন নেশাজাতীয় ইনজেকশন নিত মাদকসেবীরা। এখন তা কিছুটা কমলেও গাঁজা এবং ইয়াবাসেবীর সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশি ইয়াবা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের একটি বড় চক্র কাজ করছে এই জেলায়। ইয়াবা সিন্ডিকেটের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের নামও জড়িত। সদর উপজেলার ভিতরগড় এলাকার বিধবা নমিজন বেওয়া জানান, তার ১৯ বছরের একমাত্র ছেলে ট্রাক্টর চালিয়ে সংসার চালায়। এখনো বিয়ে হয়নি। সে প্রতিনিয়িত গাঁজা খেয়ে উপার্জনের টাকা শেষ করে ফেলে। এখন সংসার ভালো চলে না। ছেলেটা বাড়িতে শুধু বকাবকি করে।