পুনর্জন্মের অবিশ্বাস্য কাহিনী

 ২৮ এপ্রিল ২০১৮ শনিবার  ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে দিল্লিতে ছোট্ট একটা মেয়ের পুনর্জন্মের ঘটনায় চারদিকে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। ছোট্ট মেয়েটা প্রথমদিকে কেবল স্থানীয়দের কাছেই বিস্ময় ছিল। ধীরে ধীরে তার পুনর্জন্মের খবর ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বে—

 পুনর্জন্ম একটি ধর্ম বিশ্বাস মাত্র। এর দালিলিক কোনো প্রমাণ কখনোই পাওয়া যায়নি। তারপরেও পৃথিবীর ইতিহাসে মাঝে মধ্যে এমন সব ঘটনা ঘটে যার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। শান্তি দেবীর ঘটনাটাও এরকমই একটি। তাকে বলা হয় জাতিশ্বর। জাতিশ্বর তাদেরই বলা হয় যারা আগের জন্মের স্মৃতি মনে করতে পারে। শান্তি দেবীর ঘটনাটাও তাই। গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে দিল্লিতে শান্তি দেবীর পুনর্জন্মের ঘটনায় চারদিকে  হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। ঘটনাটি দেশের সীমা ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলে। অবশ্য এ ঘটনা সে সময় সন্দেহ ছিল অনেকেরই। ১৯২৬ সালে জন্ম নেওয়া ছোট্ট একটা মেয়েকে ঘিরে তৈরি হয় সব জল্পনা-কল্পনা। এটি বলার আগে চলুন এর ২৪ বছর আগে ফিরে যাই ১৯০২ সালে। তখন ভারতের মাথুরায় চতুর্ভুজ নামে এক বাড়িতে এক মেয়ের জন্ম হয়। মেয়েটির নাম রাখা হয় লুগদি। মাত্র দশ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় মাথুরার কেদারনাথের সঙ্গে। পেশায় কেদারনাথ একজন ব্যবসায়ী। লুগদি প্রথমবারের মতো গর্ভবতী হলে সন্তানটি পেটের ভিতরই মারা যায়। সিজার করে তার মৃত সন্তান বের করা হয়। এরপর দ্বিতীয়বারের মতো গর্ভবতী হলে তাকে তার স্বামী আগ্রার একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানেই সিজারের মাধ্যমে লুগদির একটি ছেলে সন্তান জন্মলাভ করে ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টম্বর। ছেলের জন্মের নয়দিনের মাথায় লুগদির শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। এক সময় এতটাই খারাপ হয়ে পড়ে যে, মারা যায় লুগদি। এতক্ষণ বললাম এক ভারতীয় বধূর জীবনের গল্প। যা অবিশ্বাস্য হয়ে ওঠে দিল্লির এক ছোট্ট এলাকায় শান্তি দেবী নামের এক মেয়ের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে। লুগদির জন্মের ঠিক এক বছর দশ মাস এবং সাত দিন পর ১১ ডিসেম্বর ১৯২৬ সালে দিল্লিতে চিড়াওয়ালা মহল্লা নামের এক এলাকায় বাবু রঙ বাহাদুর মাথুর নামের এক ভদ্রলোকের ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যা সন্তান। নাম রাখা হয় শান্তি দেবী। চার বছর বয়স থেকেই শুরু হয় শান্তি দেবীর অস্বাভাবিকতা। চার বছর বয়সের ছোট্ট মেয়ে শান্তি দেবী বার বার তার স্বামী আর সন্তানের কথা বলতে শুরু করে। সবাই তো অবাক। সে বলতে থাকে তার বাড়ি মাথুরায়। সেখানে তার স্বামী আছে, সন্তান আছে। তার স্বামী ব্যবসায়ী। যার কাপড়ের দোকান আছে। প্রথমদিকে শান্তির বাবা-মা কথাগুলো বিশেষ পাত্তা দিত না। তারা মনে করল, এটা তাদের ছোট্ট মেয়ের কল্পনার জগৎ। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শান্তির গল্পের বিস্তার বাড়তেই থাকে। তখন সবাই চিন্তায় পড়ে গেল। শান্তি দেবী মাথুরায় তার স্বামী, সন্তান এবং সংসারের খুটিনাটি বর্ণনা এত নিখুঁতভাবে দিতে থাকল যে, তখন আর তা ছোট্ট শিশুর মনের ভাবনা বলে মানা গেল না। যেমন, খেতে গিয়ে হঠাৎ শান্তি দেবী বলে ওঠে মাথুরায় আমার বাড়িতে আমরা অনেক রকমের মিষ্টান্ন খেতাম। আবার যখন তার মা তাকে কাপড় পরাতে যায়, শান্তি দেবী কোন ধরনের কাপড় আগে পরত সেই গল্প শুরু করে দেয়। কখনো কখনো সে তার স্বামীর বর্ণনা দেয়। সে বলে তার স্বামী দেখতে সুন্দর, গালে একটা আঁচিল আছে এবং চশমা পরে ইত্যাদি। আবার তার স্বামীর কাপড়ের দোকান যে একটা মন্দিরের সামনে এ কথাও বলে। এভাবেই আগের জন্মের স্মৃতি বলতে বলতে শান্তি দেবী বড় হতে তাকে। শান্তি দেবীর বয়স যখন ছয় বছর হয় তখন সে বলে কীভাবে বাচ্চা জন্ম দেওয়ার ৯ দিনের মাথায় সে মারা গিয়েছিল। সেই বর্ণনাও করে নিখুঁতভাবে। এসব গল্পে ভয়  পেয়ে শান্তির বাবা-মা ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। ডাক্তার ভদ্রলোকও অবাক হয়ে যায়। কী করে বাচ্চা মেয়েটি জটিল ধরনের সিজারিয়ান অপারেশনের কথা এত সহজভাবে গুছিয়ে বলছে। এভাবেই রহস্য জট পাকাতে থাকে। এক সময় লোকজন সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করে এগুলো মেয়েটির পূর্ব জন্মের গল্প। শান্তি দেবী আরও একটু বড় হলে বাবা-মার সঙ্গে জিদ ধরে তাকে মাথুরায় স্বামীর বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য। সে বলত, তাকে মাথুরায় নিয়ে গেলে সে তার স্বামীকে দেখিয়ে  দেবে, কিন্তু নাম বলতে পারবে না। এমন সময় এক দিন দিল্লির দাঁড়াগঞ্জের রামজেশ উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বাবু ভীষণচাঁদ এলো শান্তি দেবীকে দেখতে।

সে শান্তিকে আশ্বাস দেয়, খোঁজখবর নিয়ে শান্তিকে স্বামীর বাড়ি মাথুরায় নিয়ে যাবে। ভীষণচাঁদ কেদারনাথের কাছে শান্তির সম্পর্কে সবকিছু জানিয়ে একটি চিঠি লিখে এবং তাকে একবার দিল্লিতে আসার জন্য অনুরোধ করে। কেদারনাথ চিঠির উত্তরে তার এক আত্মীয় পণ্ডিত কামজিলালের মাধ্যমে জানাল যে, শান্তি দেবীর বেশির ভাগ দাবিই সত্য। পণ্ডিত কামজিলাল যখন শান্তি দেবীর সঙ্গে দেখা করতে এলো শান্তি দেবী তাকে সঙ্গে সঙ্গেই চিনে ফেলে। শান্তি মাথুরায় কামজিলালের বাড়ি কোথায়, কি করে, এমনকি লুগদি কোথায় তার জমানো টাকা লুকিয়ে রেখেছিল তাও ঠিক ঠিক বলে দেয়। কামজিলাল এসব শুনে মাথুরায় ফিরে কেদারনাথকে দিল্লিতে আসার জন্য রাজি করিয়ে ফেলে। ১৯৩৫ সালের ১২ নভেম্বর কেদারনাথ তার এবং লুগদির একমাত্র পুত্র নাভনিদ লাল ও তার বর্তমান স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে আসে। সে শান্তিদের বাড়িতে এলে শান্তি দেবীর বাবা শান্তিকে পরীক্ষা করার জন্য কেদারনাথকে তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল লুগদির ভাসুর হিসেবে। কিন্তু কেদারনাথকে দেখামাত্র শান্তি লজ্জায় লাল হয়ে যায়। কেন ভাসুরকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে জিজ্ঞাসা করলে শান্তি উত্তর দেয়, ইনি আমার ভাসুর নয়, আমার স্বামী। এরপর সে তার মায়ের দিকে ঘুরে বলে, আমি তোমাকে বলেছিলাম না সে দেখতে সুন্দর আর তার বাঁ দিকের গালে কানের কাছে একটা আঁচিল আছে। এরপর শান্তি তার মাকে মেহমানদের জন্য খাবার তৈরি করতে বলে। শান্তি তার মাকে আলুর পরোটা আর কুমড়োর তরকারি করতে বলে যা কেদারনাথের প্রিয় খাবার। কেদারনাথ এ কথা শুনে অবাক না হয়ে পারে না, কারণ সত্যিই এগুলো তার প্রিয় খাবার।

 

পুনর্জন্ম নেওয়া শান্তি দেবী

 

কেদারনাথকে শান্তি দেবী বলে, মাথুরায় তাদের বাড়ির উঠানে একটা কুয়া আছে, সেখানে সে গোসল করত। তার আগের জন্মে জন্ম নেওয়া পুত্র সন্তান নাভনিদকে দেখে শান্তি খুবই আবেগপ্রবণও হয়ে পড়ে। সে তাকে জড়িয়ে ধরে হাঁউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। শান্তি তত্ক্ষণাৎ নিজের খেলনাগুলো নিয়ে তার ছেলেকে দেয়। কেদারনাথ শান্তিকে জিজ্ঞাসা করে, আগের জন্মে মৃত্যুর আগে সে তো মাত্র একবার ছেলেকে দেখেছে, তাহলে এখন সে কি করে তার ছেলেকে চিনতে পারল? শান্তির ব্যাখ্যা শুনে কেদারনাথ হতভম্ব হয়ে যায়। শান্তি বলে তার ছেলে তো তারই আত্মার অংশ, নিজের আত্মাকে চিনতে তাই  কোনো কষ্ট হয়নি। খাওয়া-দাওয়ার পরে কেদারনাথের বর্তমান স্ত্রীকে দেখিয়ে শান্তি জিজ্ঞাসা করে, আপনি কেন তাকে বিয়ে করেছেন? আমরা কি ঠিক করেছিলাম না যে, আপনি অন্য কাউকে বিয়ে করবেন না। এ কথার উত্তরে কেদারনাথ বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। দিল্লিতে থাকতেই কেদারনাথ লক্ষ্য করে শান্তির আচার-আচরণ হুবহু তার মৃত স্ত্রী লুগদির মতো। দিল্লি ছাড়ার আগের রাতে কেদারনাথ শান্তির সঙ্গে একান্তে কিছু সময় কথা বলতে চাইল এবং বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে সে পুরোপুরি বিশ্বাস করল যে, শান্তি দেবী তার মৃত স্ত্রী লুগদির পুনর্জন্ম। কেননা, শান্তি কেদারনাথকে তাদের সংসার জীবনের এমন এমন সব কথা বলেছিল যা তার স্ত্রী ভিন্ন অন্য কারও পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এই কাহিনী ধীরে ধীরে পুরো ভারতে— পরবর্তীতে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এক সময় মহাত্মা গান্ধীর কানে পৌঁছয় এ ঘটনা। তিনি শান্তি দেবীর সঙ্গে দেখা করেন। মহাত্মা গান্ধী সমাজের ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিককে নিয়ে এ ঘটনা তদন্ত করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। ২৪ নভেম্বর ১৯৩৫ সালে শান্তি দেবী তদন্ত কমিটির সদস্যদের সঙ্গে মাথুরায় যায়। কমিটির সদস্যরা ফিরে এসে যা বর্ণনা করল সে সব বিস্ময়কর। শান্তি মাথুরায় গিয়ে তার শ্বশুরবাড়ি, স্বামীর বাড়ি, আগের জন্মের বাবার বাড়ি, বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, আত্মীয়স্বজন— সবাইকে এক মুহূর্তেই ঠিক ঠিক চিনতে পারে। মহাত্মা গান্ধীর নির্বাচিত কমিটির সদস্যরা মাথুরা থেকে ফিরে এসে তদন্তের প্রতিবেদন পেশ করে। তারা শান্তি দেবীকে লুগদি দেবীর যথার্থ জন্মান্তর হিসেবে দেখিয়ে উপসংহার টানেন।