মেরুদণ্ডহীন সরকারি আমলাদের কথা

 ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭ বৃহস্পতিবার ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

আমার জীবনে সবচেয়ে কুৎসিত মানুষ কারা? এ প্রশ্নটি করলে সকলেই বলবে, মৌলবাদিরা। মৌলবাদিরা আমাকে বহুকাল হলো ফাঁসি দিতে চাইছে, খুন করতে চাইছে। সকলেই তা জানে, কিন্তু যে কথা বেশি কেউ জানে না, তা হলো আমার বিরুদ্ধে সরকার কী কী করেছে, সরকারি আমলারাই বা কী কী করেছেন। সরকারগুলো সাধারণত মেরুদণ্ড আছে এমন মানুষদের ক্ষতিই করে। আমার ক্ষতি বাংলাদেশের সব সরকারই করেছে। খালেদা সরকার, হাসিনা সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার—আমার ব্যাপারে সব সরকারেরই অবিকল এক ভূমিকা। কারো সাতে নেই পাঁচে নেই আমি, আমি রাজনীতিক নই, তারপরও বারবারই নোংরা রাজনীতির শিকার করা হয়েছে আমাকে। বাংলাদেশে আমার জন্ম, তিরিশ বছরের চেয়েও বেশি বাংলাদেশে কাটিয়েছি। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারি পাশ করেছি, চাকরি করেছি দেশের গ্রাম-গঞ্জের সরকারি ক্লিনিকে, মিটফোর্ড হাসপাতালে, এমনকী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও দীর্ঘকাল ডাক্তারি করেছি। সেই আমাকে হঠাৎ করে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে সরকার। কেন এই শত্রুতা? কী দোষ করেছিলাম আমি? দোষের মধ্যে একটিই, দেশের ভালোর জন্য লিখেছিলাম। দেশের ভালো চাইলে সরকার অনেক সময় সহ্য করে না। যা কিছু ভালো এবং মন্দ, তা সরকার চাইবে। অন্যরা চাইবে কেন, আমি চাইবো কেন? সাধারণ মানুষের দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে, নারীর অধিকার নিয়ে মাথা ঘামানোটা সরকারের মোটেও পছন্দ হয় না। নারীর অধিকার যারা চায় না, যারা নারী-বিরোধী, তাদের নিয়ে তো সরকারের চলতে হয়। তারা সংখ্যায় বেশি। সংখ্যায় বেশির দিকে সরকার সব সময়ই হেলে থাকে। একটি গণতন্ত্রে সংখ্যায় বেশি এবং কম—সবাইকেই সরকার সমান চোখে দেখবে। এমনটিই তো আশা করি। এমনটিই উচিত। কিন্তু, ধর্মান্ধদের সমীহ করলে ধর্মপ্রাণ সকলের ভোট পাওয়া যাবে, এমন একটি অন্ধ-বিশ্বাস সব সরকারের মধ্যেই কম বেশি ঢুকে আছে। ধর্মপ্রাণদের ভোট পাওয়ার জন্য সরকার এমনই মরিয়া হয়ে ওঠে যে, যারা বিজ্ঞানবিশ্বাসী, যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তক—ধরে ধরে তাদের জেলে পাঠায়। দেশ কিন্তু বদলায় বিজ্ঞানবিশ্বাসী, যুক্তিবাদী, মুক্তচিন্তকরাই। ধর্মান্ধরা আজ অবধি কোনও দেশেরই খারাপ ছাড়া ভালো কিছু করেনি। অথচ আমার দেশের সরকার আমাকে পারলে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলতে চায়, যেহেতু ধর্মান্ধরা আমাকে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলতে চায়।

সরকার তাদের, সরকার তো আমারও। সরকার কি দেশের ভালো চায়? নাকি শুধু ভোটই চায়। একবার ভোট পাওয়া হয়ে গেলে দেশের ভালো’র জন্য কিছু করার বদলে ফন্দি ফিকির আঁটতে থাকে আরেকবার ভোট কী করে পাবে। লজ্জা নেই কারোর?

মাঝে মাঝে দেশের কথা বলতে গিয়ে আমি আমার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টানি। যদিও এটি আমার ব্যক্তিগত, কিন্তু এ সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত নয়। আমাকে দেশে ফিরতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সরকারের, আমার জীবনে সমস্যা তৈরি করার সিদ্ধান্ত সরকারের। আমার গল্প বললেই সরকারের সত্যিকার চেহারা অনেকটা বেরিয়ে আসে। দেশের অবস্থাও বেশ অনুমান করা যায়। ২৪ বছর আগে দেশের অবস্থা এমন করেছিল সরকার যে, ধর্মান্ধদের সমালোচনা করাকেও অন্যায় বলে বিবেচনা করা হতো। নারীর সমানাধিকার দাবি করার আরেক নাম ছিল ‘বাড়াবাড়ি’। ২৪ বছরে, হায়, দেশের অবস্থা ভালো না হয়ে খারাপ হয়েছে আরও। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার একটু একটু করে হারিয়ে যেতে যেতে হারিয়েই গেছে একেবারে। ধর্মান্ধতার সেবা করতে করতে ধর্মান্ধতার সেবা করাটাই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ধর্মান্ধতা বাড়লে নারীর অধিকার কমতে থাকে। যুক্তিবাদ শূন্য হতে হতে ভয়ঙ্কর শূন্যতায় পৌঁছে যায়। দেশ কতটা নারী-বিরোধী, কতটা ধর্মান্ধ, কতটা অগণতান্ত্রিক, কতটা বাকস্বাধীনতা-বিরোধী—তার উত্তর ২৪ বছরেও দেশের এক নারীবাদি লেখিকাকে দেশে ফিরতে না দিতে পারার মধ্যেই নিহিত।

যখন বুঝেছি কোনও সরকারই আমাকে দেশে ফিরতে দেবে না, দেশে ফেলে আসা আমার অস্থাবর সম্পত্তির দায়িত্ব আমার বোনকে লিখিতভাবে দিয়েছি। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ডকুমেন্ট সত্যায়িত করতে হয় বাংলাদেশ দূতাবাসকে। কিন্তু অন্য কারোর নয়, আমার ডকুমেন্টই সত্যায়িত করতে চান না বাংলাদেশের কোনও দূতাবাসের কোনও আমলাই। আমার ব্যাপারে কোনও আইনের বাধা আছে? না নেই। তা হলে সত্যায়িত করছেন না কেন?  করছেন না কারণ যদি কেউ কোনও দিন বলে কী দরকার ছিল তসলিমার পাওয়ার অব অ্যাটর্নির ডকুমেন্ট সত্যায়িত করার? যদি কেউ প্রমোশন আটকে দেয়! তসলিমার পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কাগজ বৈধভাবে সত্যায়িত করা কি কারও প্রমোশন আটকে দেওয়ার মতো গুরুতর অন্যায় কোনও কাজ? না তা নয়। কিন্তু মেরুদণ্ডহীন সরকারি আমলারা তাই করে আসছেন বছরের পর বছর। আমার পাসপোর্ট নিয়েও একই রকম ফাজলামি করেছেন তাঁরা। মেয়াদউত্তীর্ণ হওয়া আমার বাংলাদেশের পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়েছি বারবার, বিভিন্ন বাংলাদেশ দূতাবাসের মেরুদণ্ডহীন সরকারি আমলারা বলেছেন, আপনার পাসপোর্ট নবায়ন করার জন্য সরকারের অনুমতি নিতে হবে। আর কারও জন্য না হলেও আমার জন্য এই আইন। এই আইনটি কি লিখিত? না, লিখিত নয়। মৌখিক? না, মৌখিকও নয়। তবে? নামটা তো তসলিমা নাসরিন। তসলিমা নাসরিন কি খুনি, আসামি, জঙ্গি, দেশদ্রোহী? না। তাহলে? আমার প্রশ্নের কোনও দিন কোনও সদুত্তর দেননি সরকারি আমলারা। আমি আবেদন করার পর সরকারের কাছে, তাঁরা বলেছেন, জানতে চেয়েছেন, আমার পাসপোর্ট নবায়ন করবেন কিনা। আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন ক’টা দিন অপেক্ষা করতে হবে। ক’টা দিন পর জিজ্ঞেস করেছি, সরকারের কাছ থেকে কোনও উত্তর এসেছে কি না। না, উত্তর আসেনি। এক মাস পর, দু’মাস পর, তিন মাস পর জানতে চেয়েছি। ওই একই উত্তর, উত্তর আসেনি। উত্তর আসেনি বলে আমার পাসপোর্ট কেউ নবায়ন করেননি। আমার বিদেশি পাসপোর্টেও ভিসা দেননি। এই আমলাদের মনে কি একবারও এই প্রশ্নটি আসে না, একটি নিরস্ত্র নিরীহ মানুষকে আমরা আর কতকাল ভোগাবো? একটি নিরস্ত্র নিরীহ মানুষকে আর কতো অত্যাচার করবে রাষ্ট্রযন্ত্র?

না হয় আমাকে দেশে ফিরতে না দেওয়াটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু আমার বোনকে দেওয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নির কাগজ সত্যায়িত না করার সিদ্ধান্তটি কিন্তু সম্পূর্ণই মেরুদণ্ডহীনতার। আমলারা তাঁদের মেরুদণ্ডহীনতা, নির্বুদ্ধিতা, যুক্তিহীনতা, স্বার্থপরতা, দূরদৃষ্টিহীনতা, নিষ্ঠুরতা—ইত্যাদি কারণে আমার নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করছেন, আমার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছেন, আমার অর্থনৈতিক ক্ষতি করছেন, আমার সর্বনাশ করছেন। আমার সর্বনাশের বিনিময়ে তাঁরা তাঁদের কাল্পনিক প্রমোশন আটকানো বন্ধ করছেন।

আমার অবর্তমানে আমার বাড়িটা আমার বোন বিক্রি করতে পারবে না। যে কেউ লুট করে নেবে। এতেও সরকারি আমলাদের কারও কিছু যায় আসে না। মৌলবাদিরা আমাকে হাতের কাছে পেলে কি খুন করবে? আমি যতটা না নিশ্চিত, তার চেয়ে নিশ্চিত মেরুদণ্ডহীন সরকারি আমলারা আমাকে মওকা পেলে কুপিয়ে হত্যা করবে, এতে তাঁদের প্রমোশন ত্বরান্বিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে কল্পনা ক’রে।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।