ছাত্রলীগ যেন তার অতীত ঐতিহ্য বিস্মৃত না হয়

 ৫ জানুয়ারি২০১৮ শুক্রবার ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

মেঘে মেঘে ঘর্ষণ না লাগলে যেমন বিদ্যুৎ চমকায় না, মেহেদিকে না পিষলে যেমন লাল টকটকে রং বের হয় না, নির্যাতন-নিগ্রহের পথ পরিক্রমণ না করলে ঠিক তেমনি প্রান্তিক জনতার অধিকারও অর্জিত হয় না, সাফল্যের সৈকতেও পৌঁছানো যায় না।

কথাগুলো কোনো প্রবাদবাক্য নয়। ভাষা আন্দোলন থেকে ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনের অন্তরালে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি ও মৌলিক গণতন্ত্রের নির্বাচন পদ্ধতি বাতিলের আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার এবং স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের পথপরিক্রমণের নিখুঁত নির্যাস। পাকিস্তানের ২৩টি বছরে সামরিক জান্তা বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে জোট বেঁধে বার বার মানুষের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে। প্রান্তিক জনতাকে রাজনৈতিক অধিকারবিবর্জিত করার খেলায় তাদের উন্মত্ততা ছিল ভয়ঙ্কর। কিন্তু সুখের কথা হলো, প্রান্তিক জনতাও ছিল প্রতিটি মুহূর্তে সজাগ ও সক্রিয়। একদিকে যেমন তাদের জীবনের আলো নিভিয়ে অন্ধকার অমানিশার দিকে ঠেলে দেওয়ার ঘৃণ্য প্রয়াস ছিল মারাত্মক, জনতাকে নিস্তব্ধ ও নিষ্প্রভ করার অপচেষ্টাগুলো উদগ্র ছিল, তেমনি প্রান্তিক জনতাও সেই অপপ্রয়াসের বুক চিরে উদ্যত-উদ্গত পূর্ণায়ত পদ্মটির মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। শত নির্যাতনের মুখে নিস্তব্ধ, নিঃস্পৃহ তো হয়ইনি, বরং সব সংকটের বুক চিরে সাফল্যের সূর্য ছিনিয়ে এনেছে। কোনো ষড়যন্ত্রই স্থায়ীভাবে প্রান্তিক জনতাকে অধিকারবঞ্চিত তো করতে পারেইনি, বরং গর্জে ওঠা জনতার বজ্র নিনাদে কুটিল ষড়যন্ত্রের সব জাল ছিন্ন করেছে।

কিন্তু আজ এ কী দেখি! সংগ্রামের অনন্ত পথপরিক্রমণে ক্লান্তিহীন হিংস্র পাশবিকতার বিরুদ্ধে রক্তাক্ত সংগ্রামে বিজয়ী সেই মানুষগুলো ম্লান মুখে পড়ে পড়ে শুধু মার খাচ্ছে; রুখে দাঁড়াচ্ছে না। মৌলিক অধিকার ফিরে পেতে জনসমুদ্রের ফেনিল চূড়ায় ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলে উঠছে না। ভাষা আন্দোলন থেকে স্বায়ত্তশাসন, স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধিকার, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার আন্দোলনের কণ্টকাকীর্ণ পথে হেঁটে আসা মানুষের সঙ্গে আজকের এই দুর্বিষহ নিষ্ক্রিয়তা ও নিষ্প্রভতা বড়ই বেমানান। আওয়ামী লীগের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজ দুর্নীতির শিকড়। অন্যদিকে ওয়ালসো টাওয়ারের অফিসে বসে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি, বেগম খালেদা জিয়া বকশীবাজারের বিশেষ আদালত থেকে মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে শুভেচ্ছা জানাতে রূপসী বাংলা হোটেলের মোড়ে তার দলের ৩০০-৪০০ লোক জড় হয়ে আছে, কিন্তু বেগম জিয়ার গাড়িবহর জায়গাটি অতিক্রম করা মাত্র মুহূর্তের মধ্যে তারা রাস্তা থেকে কর্পূরের মতো উবে যায়। তাদের জড় হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো পুলিশি বাধায়ও পড়তে হয়নি।

দুটি রাজনৈতিক দলের সীমাহীন লোভ, মাটি ও মানুষের প্রতি মমত্বহীনতা ও কেবলই ক্ষমতা দখলের লিপ্সা রাজনীতিতে মানুষের অংশগ্রহণের প্রদীপ্ত আকাঙ্ক্ষাকে একেবারেই নিষ্প্রভ করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ আজ রাজনৈতিক আন্দোলন, অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ দূরে থাক; সম্পৃক্ত থাকতেই নারাজ। অথচ এ দেশের মানুষই সব রাজনৈতিক নির্যাতন-নিগ্রহ উপেক্ষা করে শুধু আন্দোলনের পথে দৃপ্ত পদচারণই করেনি, যে সাফল্য অর্জন করেছে তা সমগ্র বিশ্বের জন্য বিস্ময়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, দেশপ্রেম, মাটি ও মানুষের সঙ্গে তাদের হৃদয়ের নিবিড় সংযোগ, স্বার্থচিন্তা বিমুক্ত তাদের অমলিন মানসিকতা মানুষকে কাছে টানতে পারত, আত্মত্যাগে উজ্জীবিত করত, সংগ্রামের পথপরিক্রমণে সতীর্থ করতে পারত। শেরেবাংলা, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক (টাঙ্গাইল), আমাদের মুজিব ভাই— এদের রাজনীতি শুধু স্বার্থবিমুক্তই ছিল না, জনগণের কল্যাণে নিবেদিত ছিল। ’৬২-এর আন্দোলনে শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, শেখ ফজলুল হক মণি, এনায়েতুর রহমান, কে এম ওবায়দুর রহমান— এরা ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বের মূর্তপ্রতীক ছিলেন। আন্দোলনের বেদিমূল সৃষ্টি তো বটেই, তাদের ব্যক্তিগত জীবনের কথোপকথন, চালচলন, ওঠাবসা— এমন নিখুঁত আদলে পরিমণ্ডিত হতো যে, সব মিলিয়ে তারা ছাত্র আন্দোলনের আদর্শপুরুষ ও অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। ছয় দফা প্রদানের পর সৈয়দ মাযহারুল হক বাকী, আবদুর রাজ্জাক— এরাও ছাত্র রাজনীতির ক্ষেত্রে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন। পরিমার্জিত চিন্তার ও বুদ্ধির সৌকর্যে বাম রাজনীতির ধারাকে ছাপিয়ে ছয় দফার দাবিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে তারা সক্ষম হন। এ আন্দোলনের স্রোতধারায় ছাত্র-জনতার আরও উচ্ছ্বসিত ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে ১১ দফার আন্দোলন। তাদের অকুতোভয় সাহস ও প্রত্যয়দৃঢ় দৃপ্ত চেতনায় পরবর্তীতে ’৬৯-এর গণআন্দোলনের প্রচণ্ড চাপে লৌহমানব খ্যাত আইয়ুব খানের পতন নিশ্চিত করে। তা সত্ত্বেও ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে সামরিক শাসনের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। তবুও ইয়াহিয়া খানের সামরিক শাসন ছিল অনেকটা ভোঁতা এবং মানুষের চেতনাটাও ছিল তীব্র ও তীক্ষ। সামরিক শাসনের ভ্রুকুটি উপেক্ষা ও অগ্রাহ্য করার মতোই শানিত। সম্ভবত পাকিস্তানের সামরিক জান্তা মানুষের এই শানিত চেতনাটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল। যার ফলে সামরিক শাসন জারি করার পরপরই ইয়াহিয়া খান ’৭০-এর সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতেই সাধারণ নির্বাচনের সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রদান করতে বাধ্য হন। ফলে গণআন্দোলন একটুখানি হোঁচট খেলেও মূলত পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটা বিস্ময়কর বিজয় এনে দেয়। এ বিজয়ের আরেকটি নৈর্ব্যক্তিক দিক হলো, জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদীয় আসন নির্ধারণের মাধ্যমে নির্বাচনটি অনুষ্ঠানের ঘোষণা। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সৌভাগ্যে জুটল ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসন।

১১ দফা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সমগ্র বাংলাদেশ গণসমুদ্রের ফেনিল চূড়ায় ভিসুভিয়াসের মতো জ্বলে ওঠে। আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন ছাত্রনেতা আবদুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী ও তোফায়েল আহমেদ। তখনকার ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রলীগের একাধিপত্যের শুরু এখান থেকে।

আমরা পরবর্তী সময়ে যারা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা বা ‘চার খলিফা’ হিসেবে আন্দোলনের জাজ্বল্যমান প্রতীকরূপে রাজনীতিতে প্রতিভাত হয়েছিলাম, আমাদের চিত্তের অনুরণন, নাড়ির স্পন্দন, রক্তের শিরায় শিরায় যে ছন্দ সৃষ্টি হতো তা বাঙালি জাতীয় চেতনারই বহিঃপ্রকাশ। আমাদের মননশীলতা গড়ে ওঠে এ দেশের মাটি ও মানুষের হৃদয়ের অনুভূতির আবির মেখে। আমাদের সত্তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিল ‘এ মাটি আমার সোনা, আমি করি তার জন্মবৃত্তান্ত ঘোষণা’, ‘সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি যে আছে মাটির কাছাকাছি’।

আমরা উচ্চারণ করতে ভালোবাসতাম— ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’। শহরে বন্দরে অনেক ছাত্রনেতাই পিতৃপুরুষের পদবি বাদ দিয়ে বাঙাল বা বাঙালি পদবি লিখতে ভালোবাসতে শুরু করেন। চট্টগ্রামের প্রখ্যাত ছাত্রলীগ নেতা আইয়ুব, বন্ধুরা তাকে আইয়ুব খান সম্বোধন করে ডাকত বলে নিজের বংশীয় পদবি পরিহার করে তার নতুন নামকরণ করে আইয়ুব বাঙ্গাল। আষাঢ়ে গল্প নয়, দেশমাতৃকার প্রতি শর্তহীন এ আনুগত্যই আমাদের চেতনার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল। যদিও মুজিব ভাইকে আমাদের চেতনার অগ্রদূত আমরাই বানিয়েছিলাম, তবুও জীবনের একটি মুহূর্তের জন্যও আমরা নিজেদের আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন হিসেবে ভাবিনি, ভাবতে শিখিনি। বরং আওয়ামী লীগ যেখানে দ্বিধাগ্রস্ত ও সংকুচিত থাকত, সেখানে বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে আমরা অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনের সৃষ্টি করতাম। এ দেশের সব আন্দোলনের বিশ্লেষণে এটি মরুভূমির নিষ্কলুষ সূর্যোদয়ের মতো ফুটে ওঠে যে, ছাত্রলীগই সব আন্দোলনের অগ্রযাত্রী, উদ্ভাবক ও সারথি। বঙ্গবন্ধুকে তারা আন্দোলনে শুধু প্রণোদনাই প্রদান করেনি, বরং মূল শক্তি হিসেবে তার সব অগ্রযাত্রায় মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় বিচারে বাংলাদেশ, শেখ মুজিব ও ছাত্রলীগ একটি অন্যটির প্রতিশব্দ বা পরিপূরক হিসেবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। পরবর্তীতে সেই ছাত্রলীগের দ্বিধাবিভক্তি বঙ্গবন্ধুর হাতকে শুধু দুর্বলই করেনি, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় ভাটার সৃষ্টি করেছে।

আজকের ছাত্র রাজনীতি বিশেষ করে ছাত্রলীগের মূল্যবোধের অবক্ষয় পরিলক্ষ করে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ তো ঘটেই, তবুও এর জন্য এককভাবে ছাত্রলীগকে অভিযুক্ত করতে পারি না। রাজনৈতিক অঙ্গনে সার্বিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, নেতৃত্বের দুর্বলতা ও ক্ষমতার প্রতি নেতৃত্বের দুর্দমনীয় লোভ, ক্ষমতায় আরোহণ ও যেনতেন মূল্যে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হীনমন্যতা রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করেছে। অমানিশার অন্ধকারে নিমজ্জিত রাজনীতির সব মূল্যবোধ। শুধু ভ্রান্ত বামের প্রভাবই নয়, আওয়ামী লীগের রাজনীতিটা আজ নানাবিধ চিন্তার অনুপ্রবেশে ভেলপুরিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এ দেশের রাজনীতির মূলধারা আওয়ামী লীগকে আজ যে যার দিকে টানছে। এই ক্রমবর্ধমান টানাটানিতে সংগঠনের অবস্থা ত্রাহি মধুসূদন। তর্কের খাতিরে তর্ক না করলে যে কোনো লোককেই স্বীকার করতে হবে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাতে গড়া আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক চেতনায় উজ্জীবিত ও উচ্ছ্বসিত। সেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আজ ফসিল হয়ে গেছে। আজকে আওয়ামী লীগের সংগঠন ও দেশ শাসনের প্রক্রিয়া অবলোকন করলে যে বিকৃত অবয়ব ধরা পড়ে, তা সংগ্রামরত আওয়ামী লীগের চেহারার অনুরূপ তো নয়ই, বরং বিকৃত ও বীভৎস। আওয়ামী লীগ আজ ভ্রান্ত বাম দ্বারা প্রভাবান্বিত তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে ব্যুরোক্র্যাট সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারের দোসররা এমনভাবে এখানে জেঁকে বসেছে যে তারা এমন উচ্চারণেরও স্পর্ধা দেখান, ‘গণতন্ত্র নয়, উন্নয়নই দেশের জন্য কল্যাণকর!’ এই নব্য আওয়ামী লীগাররা অবহিতই নন, দেশের গণতন্ত্র মজবুত না হলে কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না এবং সামগ্রিকভাবে প্রান্তিক জনতার কোনো কল্যাণই আসে না। বরং প্রতিটি উন্নয়নের নামে দুর্বিনীত লুটপাটেরই আখড়ায় পরিণত হয়। একটু গভীরের দিকে তাকালে বাংলাদেশে এটা স্পষ্ট যে, জনগণের সার্বিক কল্যাণের নিরিখে নয়, বরং বখরা উঠানোর সুবিধার দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নয়নের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। রাস্তাঘাট বানালেই তার হায়াত থাকে মাত্র একটি বর্ষা। একটি বর্ষা পেরোলেই রাস্তার যে কঙ্কালসার চেহারা পরিলক্ষিত হয় তাতে গাড়ি চালানো দুঃসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ তো হয়ই, বরং রাস্তার কঙ্কালসার চেহারা যাত্রীকে যেন বিদ্রূপ ও উপহাস করে। এর কোনো উদাহরণ নিষ্প্রয়োজন। কারণ, সর্বত্র একই হালত।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় ছাত্রলীগ। এটি বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন। প্রতি বছর অনেক গৌরবের ফুটন্ত কুঁড়ি এ দিনটি জাতিকে উজ্জীবিত করে। ছাত্রলীগের জন্মলগ্নে আমিও ছিলাম কিশোর, তবুও ৪ জানুয়ারি আমার রক্তে আজও নাচন ধরায়। এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার গৌরব আমার চিত্তকে বিমোহিত করে। আওয়ামী লীগ আজ ক্ষমতাসীন থাকায় বাম-ডান— বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের দলছুট ও আদর্শবিবর্জিত কিছু তরুণ ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ করেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, অন্য কোনো সংগঠনের অস্তিত্ব নেই। ষাটের দশকে আইয়ুব খান ও মোনায়েম খানের প্রযত্নে লালিত এনএসএফের আসুরিক কর্মকাণ্ডের মতো ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে রবাহৃতরা সমাজে নানারূপ অনৈতিক, অগ্রহণযোগ্য অর্থ ও স্বার্থকেন্দ্রিক কার্যকলাপে বেমালুম লিপ্ত হয়ে পড়েছে। জীবনসায়াহ্নে এসে এই মর্মান্তিক দৃশ্য নিথর দৃষ্টিতে অবলোকন করতে হবে— এটি আমাদের কাছে একান্তই অনভিপ্রেত। সরাসরি রাজনীতি না করলেও রাজনীতি আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে, অনুভূতির পরতে পরতে। রাজনীতির চেতনায় উজ্জীবিত আমার সমগ্র সত্তা আমাকে একটি মুহূর্ত থেকেও রাজনৈতিক চেতনাবিমুক্ত হতে দেয় না। তাই এ প্রজন্মের কাছে আমার শাশ্বত দাবি রয়েই যায়, তোমাদের গৌরবদীপ্ত অতীতকে জানার চেষ্টা কর। সেদিনের সংগ্রাম ছিল ভাষা, স্বাধিকার ও স্বাধীনতার। আজকের সংগ্রাম হোক বিশ্বাসের, দেশপ্রেমের ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। জীবনসায়াহ্নে আমার শেষ আশীর্বাণী, সেদিনের যে ছাত্রলীগ স্বাধীনতা এনেছে, বাঙালি জাতীয় চেতনার মূর্তপ্রতীক সেই ছাত্রলীগ স্বাধীনতার সুফলকে প্রান্তিক জনতার দুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করুক। মূল্যবোধের কোনো অবক্ষয় তাদের উজ্জীবিত হৃদয়কে অন্ধকারে ঢেকে না দিক। প্রগতিশীল চেতনাকে বিবর্ণ না করুক। যার অতীত আছে, তার বর্তমান কলঙ্কিত হতে পারে না, ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে না। আমরা অকুতোভয় সাহসে বিজয় ছিনিয়ে এনেছি, এ বিজয়কে পরিপূর্ণতা দেওয়ার অলঙ্ঘনীয় দায়িত্ব পালনও করব, ইনশা আল্লাহ।

লেখক : স্বাধীন বাংলা ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা।