ছাত্রলীগ সেকালে নায়ক একালে ভিলেন উপহার দেয়

 ২৫ এপ্রিল ২০১৮ বুধবার  ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

ঘটনাবহুল রাজনীতির ময়দানে ছাত্রলীগ এখন বহুল আলোচিত চরিত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের অবরোধের মুখে, উদ্ধারের জন্য পুলিশ না ডেকে ছাত্রলীগকে ডাকেন! সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসিবিরোধী শিক্ষকদের আন্দোলন হোক আর ছাত্রসমাজের আন্দোলন হোক প্রশাসনের পাশে ছাত্রলীগকে দেখা যায়! কি শিক্ষক কি ছাত্রছাত্রী, যেখানে বিক্ষোভ সেখানেই উপাচার্যের হয়ে সবার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় ছাত্রলীগ। এর বাইরে নিজেরা নিজেরা আধিপত্য বিস্তার, উপদলীয় কোন্দল, টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, কর্তৃত্ববাদী ভূমিকার জন্য নানা অপকর্মে জড়িয়ে নিজেরা নিজেরা সংঘাত-সহিংসতায় রক্ত ঝরায়। ভাইয়ের বুকে ভাই আঘাত করে। সহযোদ্ধার মাথায় সহযোদ্ধা বাড়ি মারে। সহকর্মীর হাতে সহকর্মী খুন হয়। কখনোসখনো সামাজিক জীবনেও একদল ছাত্রলীগ কর্মীর আস্ফাালন উন্নাসিক আচরণ ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। একেকটি অপকর্মের ধারাবাহিকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন কোটা সংস্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন উত্তাল ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে, তখন ছাত্রলীগ কর্মী এশার বিরুদ্ধে আরেক ছাত্রীর পায়ের রগ কেটে দেওয়ার অভিযোগ মধ্যরাতে ছড়িয়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে বহিষ্কার করে দেয়। পরবর্তীতে পা কাটা মেয়েটি যখন বলল, কাচে লাথি মেরে তার পা কেটেছে, তখন সেসব বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার হয়ে যায়। এশার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের কবি সুফিয়া কামাল হলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নির্মমতায় ছাত্রী নিপীড়নের অনেক অভিযোগ গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ছাত্র-আন্দোলনের কর্মীরাও এশার গলায় জুতার মালা পরিয়েছেন। তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত করেছেন। প্রতিটি ঘটনা বর্বরতার শামিল। প্রতিটি ঘটনা নির্মমতার। কিন্তু কোনো ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত ও শাস্তি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নেমে আসেনি। এশা অপরাধ করলে তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় ও তার ছাত্র সংগঠন ব্যবস্থা নেবে। অন্যদিকে যারা তাকে লাঞ্ছিত করেছেন, বর্বরভাবে জুতার মালা দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। সেসবে না গিয়ে চলছে রাজনীতি!

মধ্যরাতে কবি সুফিয়া কামাল হল থেকে তিনজন ছাত্রীকে বের করে দেওয়া নিয়ে বিক্ষুব্ধ ছাত্রীরা এখন হল প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবি করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসন বলছে, ওই তিন ছাত্রী মিথ্যা অপপ্রচার ছড়ানোতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ স্বীকার করে চলে যেতে চাইলে অভিভাবকদের সঙ্গে তাদের যেতে দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন থেকে যায়, হল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য সত্য হলেও মধ্যরাতে কেন? কোনো শোকজ, তদন্ত ছাড়াই যা ঘটছে, তাতে ভিসি যতই বলুন না কেন সাধারণ ছাত্রীদের আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। সেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যুক্ত হওয়া ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভয়, আতঙ্ক আর ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেভাবে চলেনি, ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র রাজনীতি যেভাবে পরিচালিত হয়নি, সাম্প্রতিককালে সেভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। সবার জন্য সেকাল ছিল সুনামের। একাল হয়ে উঠেছে বদনামের।

যে বিষয়টি লেখার সূচনা করেছিলাম, তা হলো ছাত্রলীগের সব বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ঘিরে। আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম তার আমলে ছাত্রলীগের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মুখে বলেছিলেন, ছাত্রলীগে ছাত্রশিবিরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তারাই ছাত্রলীগকে বিতর্কিত করছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি বলেছেন, অপকর্ম করে পার পাওয়ার অপসংস্কৃতি আমাদের দলে নেই। যেখানে যে অপকর্ম করছে, তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই বার্তা জানিয়ে তিনি বলেছেন, ছাত্রলীগের আসন্ন সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নতুন মডেলে ছাত্রলীগকে বিকশিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ছাত্রলীগ নিয়ে আমরা নতুন করে ভাবছি।

এই বক্তব্যের আগের দিন চট্টগ্রামের জিইসি এলাকার ইউনিভার্সিটি অ্যাডমিশন কোচিং সেন্টারের পরিচালক রাশেদ মিয়াকে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি নির্মমভাবে নির্যাতন করেছেন। সিসি ক্যামেরার সেই ফুটেজ গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় মানুষ বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যায়।

সেখানে দেখা গেছে, রাগে ফুঁসতে থাকা ছাত্রলীগ নেতা রনি রাশেদ মিয়ার অফিসরুমে ঢুকে তাকে টানা-হেঁচড়া করছেন, সমানে চড়-থাপ্পড় মারছেন। অথচ অসহায় লোকটি শান্ত হয়ে বসে আছেন। গুনে গুনে ১৩টি চড় মারার পর রাশেদের গলা চেপে ধরেন রনি। এ সময় রাশেদ হাতজোড় করে নিজেকে বাঁচানোর আকুতি জানান। পরে পাঁচলাইশ থানায় লিখিত অভিযোগে রাশেদ জানান, রনি তার কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন। অন্যদিকে ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করে রনি এক বিবৃতিতে বলেন, অংশীদারিত্বের প্রতিষ্ঠানে নিজেদের মধ্যে আর্থিক লেনদেনে অপ্রীতিকর ঘটনা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যদিও রাশেদ বলেছেন, রনি তার কোনো ব্যবসায়িক অংশীদার নন।

এর আগে রনি দলবল নিয়ে চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ মো. জাহেদ খানকে চড় মেরেছিলেন। যদি চাঁদাবাজির অভিযোগ সত্য না হয়, যদি রনির বক্তব্য সত্য হয়, তাহলেও প্রশ্ন ওঠে একজন ব্যবসায়ী কীভাবে ছাত্রলীগের চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক হন?

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে অশান্ত। উপাচার্যের সঙ্গে সাবেক উপাচার্যের দ্বন্দ্বে সেখানে ছাত্রলীগ বর্তমান ভিসির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি মোটা ফ্রেমের ক্যানভাসে সাম্প্রতিককালের ছাত্র রাজনীতির রুগ্নদশা ও ছাত্রলীগের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের চিত্রপট তুলে ধরলে বুকভরা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া, হতাশা-বিষাদ ছাড়া কিছু করার থাকে না।

এ দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ছাত্রলীগের অতীত বর্ণাঢ্য, গৌরবময় ও সৃষ্টিশীলতার ঐতিহ্যের মুকুট নিয়ে যেখানে মাথা উঁচু করা প্রতিষ্ঠান, সেখানে একালের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ঐতিহ্য ও গৌরবের ধারাবাহিকতা কতটা ধারণ, লালন ও পালন করছে তা সন্দেহাতীতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। একালের ছাত্রলীগ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে হামেশাই বিতর্ক হচ্ছে।

ছাত্রলীগের জন্য বুকভরা দরদ ও ভালোবাসা যারা রাখেন, তাদের আত্মা ক্রন্দন করে ওঠে। তারা বলেন, ছাত্রলীগ ঘিরে যা ঘটছে এ এক গভীর ষড়যন্ত্র। প্রশ্ন উঠছে, ছাত্রলীগের এই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ কী? সে কি গৌরবময় ছাত্রলীগ বা ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে আসলেই কোনো সুগভীর ষড়যন্ত্র? নাকি ক্ষমতানির্ভর শাসক দলের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে কিছু কিছু নেতার এমনকি শিক্ষাঙ্গনগুলোয় দলীয় আজ্ঞাবহ প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতার উন্নাসিক আচরণে একের পর এক ঘটছে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড? নাকি বিগত ২৭ বছর ধরে ডাকসুসহ সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রেখে ছাত্র রাজনীতি থেকে ও আদর্শিক উত্তরাধিকারিত্বের পথ থেকে বিচ্যুত করায় যখন যে দল ক্ষমতায় সে দলের ছাত্র সংগঠনের হাতে দখল হচ্ছে সব শিক্ষাঙ্গান ও জনপদ? আর বিতর্কে জড়াচ্ছে সেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন। এরই ধারাবাহিকতায় কি একালে ছাত্রলীগের কাঁধে সব বিতর্ক আর বদনামের বোঝা?

দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে জন্ম নেওয়া পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ছয় মাস যেতে না যেতেই সেদিনের দূরদর্শী তরুণ রাজনীতিবিদ ও আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ’৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ছাত্রলীগকে ঘিরে পূর্ববাংলার অধিকারবঞ্চিত বাঙালি জাতিকে আদর্শহীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকদের বিরুদ্ধে জাগিয়ে তোলা শুরু হয়েছিল। ভাষা আন্দোলন থেকে সুমহান মুক্তিযুদ্ধই নয়, সব গণবিরোধী অসাংবিধানিক সামরিক শাসন, সব কালাকানুন ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভাষা।

ছাত্রলীগের জন্মলগ্ন থেকে দীর্ঘ সংগ্রামের পথ ধরে যারা বিভিন্ন সময় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারাই নন, যারাই এই পথের সঙ্গে ছাত্রলীগের পতাকাতলে ভূমিকা রেখেছেন, তারাই রাজনীতি ও সমাজ জীবনে ভোগ নয়, নির্লোভ ত্যাগের মহিমায় গণমুুখী আদর্শিক চরিত্র নিয়ে আলো ছড়িয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাকে তার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ যতটা গণমানুষের কাছে নিয়ে গেছে, তার চেয়ে বেশি চিন্তা ও চেতনায় লালন করে মানুষের মধ্যে ছড়িয়েছিল ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে জাতির জীবনে জ্বলে উঠেছিল অগ্নিগর্ভ ঊনসত্তর। ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই প্রতিরোধের দুর্গ গড়েছিল স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্রলীগের নেতৃত্বেই স্বাধীনতার ইশতেহার, স্বাধীনতার পতাকা, সশস্ত্র যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল পাকিস্তানি সামরিক শাসন কবলিত বাংলাদেশে। অসংখ্য ছাত্রলীগ নেতার নাম বাদ দিলেও জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটাতে ছাত্রলীগের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে তিনি স্বাধীন দেশে বুক উঁচিয়ে বলেছিলেন, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস স্বাধীনতার ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস।’

মুক্তিযুদ্ধে মুজিববাহিনীর চার প্রধান শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ চারজনই ছাত্রলীগের নেতৃত্বে অভিষিক্ত হয়ে সেদিন গণমানুষের আস্থার জায়গা অর্জন করেছিলেন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বের মহিমায় উদ্ভাসিত মানুষের ভালোবাসায় যাদের চার খলিফা বলা হতো সেই নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আবদুল কুদ্দুস মাখন ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকই নন, ডাকসুর বিজয়ী ভিপি ও জিএস হয়েছিলেন। সেই কিংবদন্তি ছাত্রনেতাদের বিতর্কের কলঙ্ক স্পর্শ করেনি। স্বাধীনতাকামী মানুষের আস্থা ও ভালোবাসায় বীরত্বের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছিলেন।

আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুকন্যা হলেও আওয়ামী লীগে দীর্ঘ ৩৭ বছরের নেতৃত্বে সাফল্যের গৌরব অর্জন করলেও রাজনীতির হাতেখড়ি ছিল আইয়ুব জমানার প্রতিবাদী ছাত্রলীগে। একটি কলেজের ভিপিও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কারাগারে বসে সংগঠনের মহাদুর্দিনে রাজনীতির অন্ধকার সময়ে ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছাত্র রাজনীতি শেষে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হয়েও বাংলার বাণীতে সাংবাদিকতা করেছেন। সেই সময়ের সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোয়ও নিয়মিত লেখালেখি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। অসৎ পথের সন্ধান ছাত্রলীগ তাকে দেয়নি। ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, অসীম কুমার উকিলও বাংলার বাণীতে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তোফায়েল আহমেদের পর ডাকসু বিজয়ী ছাত্রলীগ সভাপতি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ ছাত্রলীগের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘদেহী ছাত্রলীগ সভাপতি ছিলেন। এক জেলা থেকে আরেক জেলা সফর করতেন বাসে চড়ে। বাসের সিটে বসলে সামনের সিটে পা লেগে যেত বলে বাসে ওঠার আগে লুঙ্গি পরে নিতেন। সেই সুলতানও নির্লোভ ত্যাগের গণমুখী চরিত্রই লালন করেছেন। লোভ-মোহ স্পর্শ করেনি।

আইয়ুব জমানার অন্ধকার শাসনামল মোনায়েম খানের আজ্ঞাবহ এনএসএফের সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধে অসীম সাহসিকতা নিয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে মোস্তফা মহসীন মন্টু, কামরুল আলম খান খসরুরা প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলে ছাত্র রাজনীতির ময়দানে নায়কের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়েছিলেন। এ দেশের রাজনীতিতে সেকালে ছাত্রলীগ নায়ক জন্ম দিয়েছে। একালে ছাত্রলীগ ভিলেন জন্ম দেয়!

প্রশ্ন হচ্ছে কেন গোটা রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অস্থির-অশান্ত সময় কি পচন ধরিয়েছে? সততা, আদর্শ, নির্লোভ ও ত্যাগের গণবান্ধব চরিত্র কি নির্বাসিত হতে চলেছে? স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে একেকটি ঘটনায় জাতীয় রাজনীতি থেকে ছাত্র রাজনীতি অনেক পরীক্ষিত নেতৃত্ব ছিটকে পড়েছেন। তবে কি তারুণ্যের শক্তিকে বিনাশ করতে দীর্ঘদিনের সুগভীর কোনো ষড়যন্ত্র? তবে কি জাতীয়তাবাদী শক্তির সৎ আদর্শিক মূল্যবোধের রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠিয়ে ভোগবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটিয়ে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মৃত্যু ঘটানোর গভীর কোনো ষড়যন্ত্র?

একবার খবরে দেখেছিলাম, ছাত্রলীগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হেলিকপ্টারে উড়ে সাংগঠনিক সফরে গেছেন। স্কুলজীবন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিন পর্যন্ত ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম বলে বুকের ভিতরে যে গৌরব ও অহংকার বোধ করি, সেই অহমে ধাক্কা খেয়েছিলাম।

একদিন ছাত্রলীগ সভাপতি সোহাগকে প্রশ্ন করে জানতে পারি, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু তাদের সফরের আয়োজন করেছিলেন। হেলিকপ্টারের ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি। যে ছাত্রনেতারা বাস-ট্রেনে সাংগঠনিক সফরে যেতেন, মাঠপর্যায়ের অভিভাবকতুল্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বা ছাত্রলীগ নেতাদের বাসা-বাড়িতে থাকতেন-খেতেন, তাদের উত্তরাধিকারীরা সর্বোচ্চ দেশের উন্নয়নের কারণে বিমানে চড়ে যেতে পারেন। হোটেলে থাকার আয়োজন হতে পারে। সেখানে প্রাইভেট হেলিকপ্টার ভাড়া করে ছাত্রনেতাদের সফর! এজন্য কি ছাত্রলীগ সভাপতি সোহাগ দায়ী? নাকি ঈশ্বরদীর তৃণমূল আওয়ামী লীগ করে উঠে আসা শামসুর রহমান শরীফ ডিলু দায়ী?

সামরিক শাসকদের প্রতিষ্ঠিত দলগুলোকে ভোগবাদী আদর্শহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারা প্রবর্তনের অভিযোগে বরাবর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হতো। আওয়ামী লীগকে বলা হতো ত্যাগবাদী গরিবের রাজনৈতিক দল। বলা হতো, আদর্শবাদী, নির্লোভ ও ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সংগঠিত সংগঠন। গণসংগঠনে নেতাদের দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মী অনুসরণ করতেন আইডল হিসেবে। গণসংগঠনে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে নেতাদের সেই আইডলরা আজকের আওয়ামী লীগে কোথায়?

আওয়ামী লীগের মতো দলে মরহুম আবদুর রাজ্জাকের পর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে একমাত্র ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে একমাত্র ওবায়দুল কাদেরই প্রেসিডিয়ামে আছেন। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এনামুল হক শামীম সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক যুগ্মসাধারণ সম্পাদক ও অসীম কুমার উকিল সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে আছেন। এত বছর ধরে তৈরি ছাত্রলীগের হওয়া নেতারা আওয়ামী লীগের কাঠামোতে উপেক্ষিত। এটাও কি ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে?

ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ছাত্রলীগকে নতুন মডেলে বিকশিত করা হবে। আসন্ন সম্মেলনে বয়সের নিয়মটা বহাল রাখলেই ছাত্রলীগ তার ঐতিহ্যের ধারায় উত্তরাধিকারিত্ব বহনের অহংকার নিয়ে পথ হাঁটবে সেই গ্যারান্টি কোথায়?

এককালে আওয়ামী লীগ করতেন আইনজীবী ও শিক্ষকরা, এখন করেন ব্যবসায়ী ও ঠিকাদাররা। এককালে রাজনীতিবিদরা রাজনীতি করতেন শুভাকাঙ্ক্ষী ব্যবসায়ীরা সাহায্য করতেন। এখন ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করেন আর রাজনীতিবিদরা ব্যবসা করেন। এ এক নব্য অসুস্থ ধারা রাজনীতিতে রাজনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণ ঘটিয়েছে!

এককালে ছাত্রলীগ শিক্ষাঙ্গননির্ভর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে জড়ানো থাকত, এখন অর্থনৈতিক বাণিজ্যিকীকরণে জড়িয়ে যাচ্ছে। একসময় আদর্শবান ছাত্রের হাতে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিলে পিতা-মাতা উদ্বিগ্ন হতেন নানা বিপদের আশঙ্কায়। সেই ছাত্রনেতা সর্বমহলের সম্মান অর্জন করলেও বাবা-মা চাইতেন না ছেলে রাজনীতিতে জড়াক। একালের পিতারা সন্তানকে ছাত্রলীগের পদ-পদবি পাইয়ে দিতে আর্থিক বরাদ্দ করেন। ছেলে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের দায়িত্ব পেলে পিতার ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হবে। আদর্শিক বাবা-মায়ের আদর্শিক সন্তানেরা এই ধারা বহাল থাকলে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে নেতৃত্বে আসতে পারবে না। এটা সত্য, ছাত্রলীগের বর্তমান নেতৃত্ব যখন যেখানে যে নেতা-কর্মী বিতর্কিত ভূমিকা রেখেছেন, সেখানেই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছেন। কিন্তু গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে যদি আদর্শিক মূল্যবোধের ধারায় ফিরিয়ে আনা না যায়, গণসংগঠনের নেতা সংগঠকরা যদি অর্থ-বিত্তের মোহ থেকে ফিরে না আসেন, ছাত্রলীগসহ অন্য সহযোগী সংগঠনকেও ফিরিয়ে আনা যাবে না। ছাত্রলীগের রাজনীতিকে সব বিতর্ক ও কর্মকাণ্ডের বাইরে আদর্শিক ধারায় নতুন মডেলে বিকশিত করতে হলে, গণসংগঠনের নেতাদের তাঁবেদারি এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রশাসনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে দিতে হবে। তাদের সামনে গণসংগঠনের আইডল দাঁড় করাতে হবে। সেই সঙ্গে সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বন্ধ দুয়ার খুলে দিতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গণতন্ত্রের আন্দোলনে পথ হাঁটা সব ছাত্র সংগঠনের জন্য ক্যাম্পাসভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি করার অবাধ স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ছাত্র রাজনীতিকে আদর্শিক, গণতান্ত্রিক ও সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনলে ছাত্রলীগই সেই ধারার নেতৃত্বের মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবে। গণতন্ত্রের মূল্যবোধের ধারাই ছাত্রলীগের ঐতিহ্যের ধারা। সেই ধারার প্রত্যাবর্তনই ছাত্রলীগকে বিতর্ক ও কলঙ্কমুক্তই নয়, জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিতে প্রডাকশন হাউস বানাতে পারে। বর্তমান অবস্থায় যেমন নেতা, যেমন পিতা, তেমন ছাত্রনেতা ও বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বিদ্যমান। এই অসুস্থ ব্যবস্থা থেকে তারুণ্যের শক্তিকে আলোর পথে, সুস্থ রাজনীতির পথে ফিরিয়ে আনতে হলে, ছাত্রলীগের সম্মেলনে কাউন্সিলরদের অবাধ ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচনই নয়, নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অধিকারও ফিরিয়ে দিতে হবে। তখন ছাত্র রাজনীতির জমিন থেকে ছাত্রলীগ ভিলেন নয়, রাজনীতির ময়দানে নায়ক উপহার দিতে পারবে।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, পূর্বপশ্চিমবিডি ডটনিউজ।