বিভাজন নয়, চলচ্চিত্রের উন্নয়ন ঐক্যে

 ২৬ এপ্রিল ২০১৮ বৃহস্পতিবার  ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

২০১০ সাল থেকে বিশ্বে অ্যানালগ প্রযুক্তিতে চলচ্চিত্র নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। ডিজিটাল যুগের পূর্ণতা আসে। ১৯৯৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর, পৈতৃক ব্যবসায় যোগ দিই।

ছোটবেলা থেকেই গান, কবিতা লিখি, সিনেমা ভালোবাসি। আমি ও আমার পরিবারের কেউ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই। তবে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী।

২০১০ সালে পৈতৃক ব্যবসার পাশাপাশি নতুন ব্যবসার চিন্তা করি এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ে ছয় মাস গবেষণা করার পর লক্ষ্য করি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র একেবারে শূন্যের কোঠায়।

বিশ্বে তখন যেখানে ৩৫ এমএমের অ্যানালগ সিস্টেমের সিনেমা বন্ধ করে ডিজিটালে চলে গিয়েছিল, ঢাকার চলচ্চিত্র তখনো অ্যানালগ পদ্ধতি নিয়েই পড়ে ছিল। ফুজি ৩৫ এমএম ফিল্ম প্রডাকশন বন্ধ করে দিয়েছিল আর কোডাক কোম্পানি আগেই ঘোষণা দিয়েছিল তারা পরবর্তী এক বছরে ৩৫ এমএম ফিল্ম প্রডাকশন বন্ধ করে দেবে। তার পরও ঢাকাই চলচ্চিত্রের কেউ বা কোনো কোম্পানি অথবা সরকারিভাবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেয়নি। এতে দেশীয় চলচ্চিত্র অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়ে। মানে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখন আমি প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার আহ্বানে উজ্জীবিত হয়ে এবং চলচ্চিত্রকে ভালোবেসে ২০১১ সালে বিদেশ থেকে ডিজিটাল ক্যামেরা আমদানি করে সম্পূর্ণ নতুন ছেলেমেয়ে নিয়ে তৈরি করি বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল চলচ্চিত্র ‘ভালোবাসার রঙ’। এই ডিজিটাল সিনেমা নির্মাণ করে যখন সিনেমা হলে মুক্তি দেব তখন দেখি হলে সেই পুরনো আমলের অ্যানালগ প্রজেকশন মেশিন। আমাদের ডিজিটাল সিনেমা সেখানে টেস্ট হিসেবে চালিয়ে দেখি, অস্পষ্ট ছবি ও বাজে শব্দ। তখন আমরা ডিজিটাল প্রজেকশন সিস্টেম বসানোর চিন্তা করি, যা অত্যন্ত ব্যয়সাপেক্ষ। আমরা ভারতের প্রাসাদ ও বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে আলাপ করি, তাদের সিস্টেম বোঝার চেষ্টা করি। প্রাসাদ কোম্পানি আমাদের সঙ্গে জয়েন্ট-ভেঞ্চার করতে রাজি হয়, কিন্তু সার্ভার কন্ট্রোল তাদের কাছে রাখবে; যা আমার কাছে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। তখন আমরা বাংলাদেশের একদল তরুণ মেধাবী ছেলেকে নিয়োগ দিই এই সার্ভার ও সফটওয়্যার তৈরি করার জন্য। তারা ছয় মাস সময় নিয়ে একটি সার্ভার ও সফটওয়্যার তৈরি করে যা আন্তর্জাতিক মানের; যার নাম দিই জেএক্সডি। অতঃপর ৫০টি সার্ভার তৈরি করি, ৫০টি প্রজেক্টর আমদানি করে নিয়ে আসি ও ৫০টি স্টেরিও ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম আমদানি করি; যার মোট ব্যয় ছিল ১৫ কোটি টাকা। শুধু অর্থ ব্যয় করলে হয় না। এটি একটি বিশাল কর্মযজ্ঞও। প্রথম পর্যায়ে ২৮টি সিনেমা হল সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল করতে সক্ষম হই। এই ২৮টি হলেই ৫ অক্টোবর, ২০১২ সালে বাংলাদেশের প্রথম ডিজিটাল সিনেমা জাজ নির্মিত ‘ভালোবাসার রঙ’ মুক্তি পায়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সিনেমাজগৎ ডিজিটালে পদার্পণ করল। দর্শক দেখতে পেল প্রথম ঝকঝকে সিনেমা আর সুস্পষ্ট শব্দ। এতে দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ল সিনেমা হলে। আমরা পর্যায়ক্রমে ৫০টি হল ডিজিটাল করি। তখন প্রযোজক সমিতি জাজের সঙ্গে এই মর্মে চুক্তি করে যে, প্রজেকশন বাবদ প্রতি ছবিতে ১২ হাজার টাকা করে ভাড়া নেওয়া হবে। তখন কলকাতায় এই ভাড়ার পরিমাণ ছিল ২২ হাজার রুপি। এই সিস্টেম বসিয়ে ছয় মাস অপেক্ষা করলাম, কিন্তু কোনো ছবি নেই মুক্তি দেওয়ার। মানে চলচ্চিত্র তৈরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এ অবস্থায় জাজ সিনেমা হল ও চলচ্চিত্রশিল্প বাঁচাতে একের পর এক ডিজিটাল প্রযুক্তির ছবি নির্মাণ করতে থাকি। এতে অনেকেই উৎসাহিত হয়ে ডিজিটাল সিনেমা বানাতে শুরু করেন, আবার মৃত চলচ্চিত্র জেগে ওঠে।

জাজ সম্পূর্ণ নিজের অর্থায়নে পর্যায়ক্রমে ১০০টি হল ডিজিটালের আওতায় আনে। এতে সময় লাগে দুই বছর। তখন বাংলাদেশে ৪০০ সিনেমা হল ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অন্য কেউ এগিয়ে আসেনি সিনেমা হল ডিজিটালকরণে। এমনকি যারা একসময় চলচ্চিত্র থেকে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন, তারাও কেউ আসেননি এই খাতে অর্থ লগ্নি করতে। এটা যে কোনো একজনের পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার। শুধু কলকাতাতেই তিনটি কোম্পানি আছে, ইউএফও, কিউবি জ্যাস, ইএমডব্লিউ। সিনেমা হল ডিজিটালকরণে একাধিক কোম্পানির প্রয়োজন। কারণ একটি এলাকায় তিনটি সিনেমা হল হলে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানি সার্ভার বসাবে বা হল ডিজিটাল করবে। আমরা প্রতি এলাকায় একটি করে সার্ভার বসাই ও প্রজেক্টর দিই। সব সিনেমা হলে প্রজেক্টর দিইনি যাতে অন্য কেউ এসে ডিজিটাল সিস্টেম বসাতে পারেন। কিন্তু অন্য কেউ এগিয়ে না আসায়, অন্য দুটি হল বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। প্রায় চার বছর পর আমরা বাধ্য হয়ে বাকি দুটি সিনেমা হলে সার্ভার বসাই। যেমন ময়মনসিংহে তিনটি সিনেমা হল, আমরা একটিতে প্রজেকশন সিস্টেম বসিয়েছি। তাই অফশন অন্য দুটি হলে জাজ প্রজেকশন সিস্টেম বসাবে না। সেখানে অন্য কেউ বসাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, চার বছরেও অন্য দুটি হলে প্রজেকশন সিস্টেম স্থাপন করেননি কেউ। বাধ্য হয়ে জাজকেই বসাতে হয়েছে। নতুবা ওই দুটি হলও বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু ব্যবসায়িক দিক থেকে এটি জাজের জন্য ক্ষতিকর। তার পরও করেছি শুধু চলচ্চিত্রকে ভালোবাসি বলেই। এভাবেই পর্যায়ক্রমে ছয় বছরে ২৮০টি সিনেমা হলে সার্ভার বসাতে সক্ষম হয়েছি। জাজ নিজের চেষ্টা আর অর্থায়নে এ কাজগুলো করেছে। জাজের গড় ভিপিএফ চার্জ হলো ৬ হাজার ৪০ টাকা মাত্র। কিন্তু বর্তমানে কলকাতায় এই ভিপিএফ চার্জ ১৮ হাজার রুপি। অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় ২২ হাজার।

জাজ এত কম টাকা ভিপিএফ চার্জ নেওয়ার জন্য প্রতি মাসে জাজ এই খাতে ভর্তুকি দেয়। জাজ চলে গেলে এখানে ইউএফও এবং কিউব আসবে এবং তারা প্রতি হলবাবদ ২০ হাজার টাকা নেবে এবং আমাদের প্রযোজকরা এ টাকা দিতে বাধ্য হবে। জাজের পক্ষ থেকে অনেক বার হল মালিকদের বলেছি প্রজেকশন সিস্টেম কিনে নিতে। কিন্তু কেউ কিনতে আগ্রহী নয়। আবার হল মালিক ইচ্ছা করলে নিজের খরচে ডিসিপি সিস্টেম বসাতে পারেন। যেমন বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্স, যমুনা ব্লকবাস্টার বা শ্যামলী সিনেমা হল বসিয়েছে।

জাজ এ পর্যন্ত ৪০টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছে; যার মধ্যে ২৪টি সম্পূর্ণ দেশীয় সিনেমা আর ১৬টি যৌথ প্রযোজনার। এই কর্মতৎপরতায় মস্কো থেকে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের সম্মান দেশের জন্য বয়ে এনেছে চারটি জাতীয় পুরস্কার বিজয়ী সিনেমা। দেশার মতো সিনেমাও তৈরি করে জাজ। এবারও ছয়টি ক্যাটাগরিতে আমাদের ছবি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছে।

এই অল্প সময়ে এত সিনেমা বানানোর কারণ হচ্ছে সিনেমা হল বাঁচিয়ে রাখতে হলে কনট্যান্ট অর্থাৎ সিনেমা লাগবে। যেহেতু অন্য কেউ ভালো বড় সিনেমা নির্মাণ করে না, তাই জাজ সিনেমা হলকে বাঁচিয়ে রাখতে, এককভাবেই বড় বাজেটের ছবি নির্মাণ করেছে। যেমন গত দুই ঈদে জাজের শিকারি, বাদশাহ, বস-২, নবাব ছবিগুলো স্মরণকালের সেরা ব্যবসা করেছে। সিনেমাগুলো যে পরিমাণ ব্যবসা করেছে, সব হল মালিকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, হলের ছয় মাসের খরচ এক সিনেমা দিয়েই উঠিয়েছে। হল বাঁচলে বাংলা চলচ্চিত্রশিল্প বেঁচে থাকবে। সিনেমা হলই যদি না থাকে, তাহলে ছবি চলবে কোথায়? আর এ কারণে জাজ নিজ দায়িত্বে ২০টি বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হল ভাড়া নিয়ে চালু করেছে নতুন করে।

দেশীয় চলচ্চিত্রের এত উন্নয়নের চেষ্টা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রের একটি মহল জাজের বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নানা অনবরত ভিত্তিহীন অভিযোগের পাহাড় গড়ে তুলছে। এসব অভিযোগ হলো— জাজ প্রজেক্টর মেশিন দিয়ে সিনেমা হল আটকে রাখে, অন্যের সিনেমা মুক্তি দিতে দেয় না। এ কথা সম্পূর্ণ মিথ্যা। যেমন ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮-তে জাজের ‘নূরজাহান’ ও শাকিব খান অভিনীত শাপলা মিডিয়া প্রযোজিত ‘আমি নেতা হব’ সিনেমাটি মুক্তি পায় একসঙ্গে। এতে জাজের নূরজাহান সিনেমা পায় ২১টি আর শাকিবের ‘আমি নেতা হব’ পায় ১১৭টি হল। এর কারণ, হল মালিকরা মনে করেছেন শাকিব খানের সিনেমা বেশি ব্যবসা করবে, তাই তারা শাকিবের সিনেমা নিয়েছেন। এখানে জাজের কিছু করার নেই।

একই অবস্থা এর আগেও হয়েছিল। এক ঈদে জাজের ছবি ‘হানিমুন’-এর সঙ্গে শাকিব খানের ‘হিরো দ্য সুপারস্টার’ মুক্তি পায়। এতে জাজ পায় ৪০টি হল আর শাকিব খানের সিনেমা পায় ১৩৭টি হল। পরের ঈদেও আমাদের অগ্নি-২ পায় ৮২টি আর শাকিবের সিনেমা পায় ১০০টির বেশি হল। অর্থাৎ যে সিনেমা বড় ও ভালো মনে করেন হল মালিকরা, তার সিনেমাই হল মালিকরা চালান। এটা নির্ভর করে হল মালিক ও সিনেমার প্রযোজকের ওপর। এতে জাজের কোনো হাত নেই।

এর পরের অভিযোগ হলো কোন ছবি কখন মুক্তি পাবে তা জাজই নির্ধারণ করে। এ কথাও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। কোন সিনেমা কত তারিখে আসবে, তা নির্ভর করে প্রযোজক সমিতির দেওয়া তারিখ অনুযায়ী। এতে জাজের বা অন্য কারও হাত নেই। এটা সমিতির প্রশাসকের এখতিয়ার।

জাজের বিরুদ্ধে একটি মহলের এসব ভিত্তিহীন অভিযোগের কারণ হলো— শুধু জাজের সিনেমা কেন দর্শক এত পছন্দ করে? কেন জাজ একের পর এক সিনেমা তৈরি করে এখনো বাংলা চলচ্চিত্রকে টিকিয়ে রেখেছে? জাজের ওপর তাদের ক্ষোভ আর ঈর্ষার এটিই একমাত্র কারণ। এজন্যই জাজের বিরুদ্ধে তাদের অযৌক্তিক যুদ্ধ ঘোষণা। আমি চাই এসব অহেতুক রেষারেষি বন্ধ করে নিয়মতান্ত্রিক পথে চলচ্চিত্রের সব মানুষ যদি দেশ ও দেশীয় চলচ্চিত্রের উন্নয়নের স্বার্থে এক কাতারে এসে দাঁড়ায় তাহলে আর কোনো দ্বিধাবিভক্তি থাকার কথা নয়। না হলে এই অহেতুক দ্বন্দ্ব আর বিভক্তিই আমাদের দেশের প্রধান গণমাধ্যম চলচ্চিত্রশিল্পকে ধ্বংস করে দেবে।

            লেখক : চলচ্চিত্র প্রযোজক।