মাহাথির মোহাম্মদ এবং বাংলাদেশ

 ১৩ মে ২০১৮ রবিবার  ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। বিশ্বকে চমকে দিয়ে ৯২ বছর বয়সে মালয়েশিয়ার ফের প্রধানমন্ত্রী হলেন মাহাথির মোহাম্মদ। তবে তিনি একা নন। তার একটা জোট আছে। এই জোট নিয়ে তাকে ক্ষমতায় আসতে হয়েছে। এই জোট দুর্নীতিবিরোধী ঐক্যর। যাতে রয়েছেন একজন আনোয়ার ইব্রাহিম। মালয়েশিয়ার রাজনীতির আরেক আলোচিত নেতা। এক সময় তাকে বলা হতো, মাহাথিরের উত্তরাধিকার। আধুনিক উন্নত দেশ গঠনে তারও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব চোখে পড়ার মতো ছিল। কিন্তু সেই আনোয়ার ইব্রাহিমকে কারান্তরীণ করেছিলেন মাহাথির। অভিযোগ ছিল অনেক। সব অভিযোগের বিরুদ্ধে তিনি লড়েছেন। অবশেষে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমে মাহাথির আবার তাকে টানলেন। যার বিরুদ্ধে কাছে টানলেন সেই নাজিব রাজাকও এক সময় বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন মাহাথিরের। একসঙ্গে তারা অনেক কাজ করেছেন। কালের পরিক্রমায় নাজিব আজ দূরে সরে গেলেন। আর কাছে ফিরে এলেন আনোয়ার ইব্রাহিম। জোটের শর্ত অনুযায়ী প্রথম দুই বছর ক্ষমতায় থাকবেন মাহাথির। এরপর ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন আনোয়ার ইব্রাহিমকে। এরই নাম রাজনীতি। এই রাজনীতিতে কে আপন কে পর হবেন কেউ জানে না। দেশ দল আলদা। কিন্তু সবখানে রাজনীতির হিসাবের ধরন এক থাকে। এই ধরনটা নানামুখী স্বার্থকে ঘিরে তৈরি হয়। ভোটের সমীকরণে বদল হয় আপন-পর। সময় ও পরিবেশ অনেক কিছু বদলে দেয়।

হিসাব মেলাতে গেলে বাংলাদেশ আর মালয়েশিয়াকে এক করা যাবে না। কিন্তু টানাপড়েন ও মেরুকরণের দিকে তাকালে এখনকার অনেক কিছুর মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। দেখতে দেখতে আমাদেরও অনেক বেলা গেল। দেখা হলো রাজনীতির মাঠে অনেক কিছু। হিসাব মেলাতে গিয়ে আজ আপন, কাল পর হয়ে যান। মনে পড়ছে ’৯১ সালের কথা। বাংলাদেশের সংসদে তখন অনেক রাজনৈতিক দৃশ্যপট দেখেছিলাম। ক্ষমতাচ্যুত এরশাদ কারাগারে। আমরা রিপোর্টাররা সংসদ গ্যালারিতে বসে দেখতাম প্রাণবন্ত পার্লামেন্ট। প্রথমে স্পিকার ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস, ডেপুটি স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী। বিএনপি সরকারি দল, আওয়ামী লীগ সংসদে বিরোধী দল। সবার চোখ পতিত স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে। দুই দলের কঠিন অবস্থানের মধ্যেও এরশাদ রংপুরের পাঁচটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন। এরশাদের রংপুরের ছেড়ে দেওয়া আসনে জয়ী হয়ে সংসদে আসেন মিজানুর রহমান চৌধুরী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। সেই দুঃসময়েও কাজী জাফর আহমেদ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও বাঘা বাঘা এমপিরা সংসদে বাধাগ্রস্ত হতেন কথা বলার সময়। তারা কথা বলার চেষ্টা করলেই আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত একসঙ্গে প্রতিবাদ করত। তাদের কথা বলতে বাধা দিত। এর মধ্যেই প্রতিদিন হৈচৈ হট্টগোলে এরশাদকে প্যারোলে সংসদে আনার দাবি জানাতেন তার দলের এই নেতারা। সরকারি দল বিএনপির সঙ্গে বিরোধী দলও বলত, স্বৈরাচারকে সংসদে দেখতে চাই না। তবুও প্রবীণের প্রজ্ঞা বলে কথা। মিজান চৌধুরী সূক্ষ্মভাবে দলের রাজনীতি তুলে ধরতেন। একদিন তিনি দাঁড়ালেন কথা বলতে। সংসদে দুই নেত্রীই উপস্থিত। মিজান চৌধুরী শুরুতেই প্রশংসা করলেন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। গোটা আওয়ামী লীগ চুপ। টুঁ-শব্দ নেই। এরপর তিনি প্রশংসা করলেন, জিয়াউর রহমান, সংসদনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার। বাংলাদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দুই নেত্রীর অবদানকে সামনে নিয়ে আসেন। দু-দলই তার কথা শুনল। আসলে সংসদীয় গণতন্ত্রে কথা বলার একটা আর্ট আছে। এই কথা বলার শৈল্পিকভাব ’৭৯ এবং ’৯১ সালের সংসদে ছিল। এখন সেই সংসদ নেই। নেই নেতাদের শৈল্পিক চিন্তা ও বক্তব্য। আরেক দিনের কথা মনে আছে। সংসদে একদিন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী ঘাতক-দালালদের নিষ্ঠুরতা নিয়ে আলোচনা ছিল। সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে আবেগ নিয়ে একাত্তরে ঘাতকদের নিষ্ঠুরতার বর্ণনা দিতে থাকেন। পুরো সংসদে পিন-পতন নীরবতা। বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের এক পর্যায়ে ঢুকরে কেঁদে ওঠেন বিএনপির এমপি ফরিদা হাসান। তার স্বামী সাঈদুল হাসান সেই নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিলেন। এখন এভাবে এক দলের নেত্রীর বক্তব্যের সময় অন্য দলের কেউ কি শান্তিতে শোনেন? 

রাজনীতি বড় কঠিন। মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের কোনো তুলনা হয় না। কিন্তু অনেক বাস্তবতা নিয়ে ভাবনা তৈরি হয়। ২০০১ সালের আগে এরশাদের শীর্ষ নেতারা কেউ যোগ দিলেন আওয়ামী লীগে, কেউ গেলেন বিএনপিতে, কেউ আবার আলাদা দল করলেন। এরশাদ কোনোমতে দল টিকিয়ে রাখলেন। এরশাদের নয় বছরের ক্ষমতার সাথীরা তাকে ছাড়লেন। কেন ছাড়লেন? উত্তর একটাই ক্ষমতার রাজনীতি। কিন্তু ইতিহাস এরশাদকে ছাড়ছে না। এরশাদ এখন সংসদ ও সরকারে ক্ষমতাসীনদের জোটসঙ্গী, ভোটসঙ্গী। ক্ষমতার রাজনীতির অন্দরমহলে তাকে নিয়ে সব দলেই রয়েছে আলোচনা। মন্ত্রীর মর্যাদায় পতাকা উড়িয়ে তিনি রাজনীতিতে কখনো সরকারের পক্ষে, কখনো কঠোর সমালোচনা করেন। অন্যদিকে জোটের রাজনীতিতে অনেক জটিলতার পর বিএনপি ছাড়তে পারছে না জামায়াতে ইসলামীকে। তারা এখন অনেকটা বিএনপির ছায়াসঙ্গী। ইতিহাসের পথপরিক্রমা বড় জটিল আর ইতিহাস সবসময় গতি পাল্টায়। আগামীতে এসব জোটের গতি কোন দিকে যাবে তা এখন বলা মুশকিল। মালয়েশিয়াতে আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে মাহাথিরের ঐক্য হবে এমন ভাবনা এক সময় কারও ছিল না। বাস্তবতা হলো ঐক্য হয়েছে। তারা দুর্নীতিবিরোধী ইস্যুতে নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে ভোটে জয়ীও হলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ হারলো কেন? হিসাব মেলালে দেখা যায় আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোটের ঐক্যই সর্বনাশ ডেকে আনে। এখনো দেশে ভোটের হিসাব দুটি। একদিকে আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে অ্যান্টি আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগারদের অনৈক্যই সব সময় এ দলটির সর্বনাশ ডেকে এনেছিল। আর জয়ী করেছিল অ্যান্টি আওয়ামী লীগারদের। শেখ হাসিনাকে ঘিরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মানুষদের একটা ঐক্য আছে। এই ঐক্য ধরে রাখতে হলে সবাইকে কম-বেশি ছাড় দিতে হবে। একতরফা কারও গোঁয়ার্তুমি বাড়াবাড়ি ভয়াবহতা ডেকে আনবে। কারোই কাজে লাগবে না।

মালয়েশিয়ার ইতিহাসে ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন মাহাথির মোহাম্মদ। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি এক আধুনিক দেশ উপহার দিয়েছেন। উন্নত বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন মাহাথির। পশ্চিমাদের চোখে তার সময়ে গণতন্ত্রের অনেক বিষয় ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও মালয়েশিয়ার মানুষ অখুশি ছিল না। তারা ভালোবাসত তাদের এই প্রিয় নেতাকে। সেই প্রমাণ মালয়েশিয়ার জনগণ আবারও দিয়েছে। অন্যরকম ভালোবাসা না থাকলে এবার তারা ৯২ বছর বয়সী নেতাকে নির্বাচিত করত না। মালয়েশিয়ার মানুষের আস্থার কারণ হচ্ছে মাহাথিরের ন্যায়পরায়ণতা, আইনের শাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ অবস্থান। ক্ষমতায় থাকার সময় মাহাথির এখানে ছাড় দেননি। আইনের শাসন থাকলে মানুষের মন জয় সহজ হয়। আস্থা তৈরি হয় সর্বস্তরে। সাধারণ মানুষ উন্নয়নকে আগেই স্বাগত জানায়, যখন আইনের শাসন চোখে দেখে। আইন সবার জন্য এক হয়ে আসে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে থাকে জিরো টলারেন্স। আর্থিক খাতগুলো থাকে শৃঙ্খলায়। মাহাথির তার দেশে তা করতে পেরেছিলেন। মনে রাখা দরকার, নাজিব রাজাকও উন্নয়নমুখী ছিলেন। কিন্তু তার সরকারের অনেক কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অনেক মন্ত্রীকে নিয়ে ছিল অস্বস্তি। দুর্নীতির লাগাম টানতে পারেননি নাজিব। এ কারণে মাহাথির ৯২ বছর বয়সে মাঠে নামেন। দুর্নীতিবিরোধী তার এক বিশাল র‌্যালি একবার মালয়েশিয়াতে আমি দেখেছিলাম। মানুষের ঢল নেমেছিল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল রাস্তাঘাট। মানুষ তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। বয়স আজ হার মেনেছে মাহাথিরের কাছে। আগামী দুই বছর অতীতের শিক্ষাকে তিনি নতুনভাবে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাবেন। মালয়েশিয়াকে দেবেন নতুন গতি। তাকে ঘিরে এক নতুন স্বপ্নের হাতছানি আবারও তৈরি হয়েছে মালয়েশিয়াতে।

এ কারণে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে মালয়েশিয়ার কাছ থেকে। কারণ বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি আছে। আমাদের জিডিপি এখন এক বিশ্বচমক। বেসরকারি খাতের অবিশ্বাস্য বিকাশ বিশ্বকে অবাক করে দেয়। শতাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আছে যারা ঋণখেলাপি নয়, কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে সক্ষম যে কোনো সময়। এই উন্নতিকে এড়ানোর সুযোগ নেই। পাশাপাশি সরকার তার মতো করে অগ্রসর হচ্ছে। মহাকাশে উড়ছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। স্যাটেলাইট এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। বিদ্যুৎ খাতে আমাদের উন্নতি চোখ ধাঁধানো। সড়ক, অবকাঠামো, উড়াল সড়ক হচ্ছে। পদ্মা সেতুর দৃশ্যমান উন্নতি আশার আলো তৈরি করেছে দেশের মানুষের মাঝে। বিশেষ অর্থনৈতিক জোন আগ্রহ তৈরি করেছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হচ্ছে। বদলে যাচ্ছে সবকিছু। শেখ হাসিনার দক্ষতার কারণেই এই সাফল্য। পাশাপাশি তার দেওয়া নীতিমালার কারণে সরকারের সঙ্গে উন্নয়নে পাল্লা দিচ্ছে বেসরকারি খাত। সাফল্যের এই নতুন দিগন্তের পরও কোথাও যেন স্বস্তি নেই। মানুষ খুশি নয়। গলদটা কেউ খোঁজার চেষ্টা করেন না। সমস্যা এখানেই। গলদ আইনের শাসন নিয়ে। কিছু কিছু মানুষের বাড়াবাড়ি ভোটের বাক্সে আঘাত হানছে ক্ষমতাসীনদের। ঝামেলা তৈরি করছে। এই ঝামেলা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কঠোর হাতে দমন করতে হবে ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের। শেখ হাসিনার সাফল্য ও অর্জন কোনো ব্যক্তির কারণে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আইনের শাসন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা জরুরি। ব্যাংকগুলো কারও কাছে জিম্মি থাকতে পারে না। রাষ্ট্র পরিচালনায় সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে ও দিতে হবে। মন্ত্রীদের অতিকথন বন্ধ করতে হবে। মানুষের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে আশ্বস্ত করতে হবে, সরকারের গৃহীত কাজগুলো তাদের সুন্দর আগামীর জন্য। বঙ্গবন্ধুর পরিবার ক্ষমতার দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কোনো বিতর্কে নেই। অথচ কিছু মানুষের কারণে সরকারকে মাঝে মাঝে বিতর্কিত করার প্রয়াস মেনে নেওয়া যায় না। মানুষ এখনো মনে করে, শেখ হাসিনাই পারেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও উন্নয়নকে ধরে রাখতে।

            লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ