দিনভর ব্যাপক ভোগান্তি

 ১১ জানুয়ারি২০১৮ বৃহস্পতিবার ভিডিওসহ দেখতে ক্লিক করুন

অনলাইন ডেস্কঃ

ভারতের তাবলিগ জামাতের মুরব্বি মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্ধলভিকে নিয়ে তাবলিগ জামাতের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে গতকাল অচল হয়ে পড়েছিল রাজধানীর যানচলাচল। মাওলানা সাদের আগমন ঠেকাতে তাবলিগ জামাতের একটি গ্রুপ বিমানবন্দর এলাকার সড়ক দখলে নিয়ে সমাবেশ করলে দুর্বিষহ ভোগান্তিতে পড়েন রাজধানীবাসী। শুরুতে উত্তরা, টঙ্গী এলাকায় ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো রাজধানীতে। সবশেষ বিকাল সাড়ে চারটার দিকে তাবলিগের সদস্যরা অবস্থান ত্যাগ করলে ধীরে ধীরে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। তবে তাবলিগের একটি গ্রুপ গত রাতেও কাকরাইল জামে মসজিদ এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে র‌্যাব-পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা কাকরাইল ও ইজতেমা ময়দান এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন। জানা গেছে, টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে মাওলানা সাদের উপস্থিতি ঠেকাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গতকাল সকাল ৮টা থেকেই অবস্থান নিতে থাকে তাবলিগের একটি গ্রুপ। এতে করে শুরুতে উত্তরা ও টঙ্গী এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। কিছু সময়ের মধ্যেই এই যানজট ছড়িয়ে পড়ে মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে। ঘণ্টার পর ঘণ্টার যানজটে ভোগান্তি বাড়ে যাত্রীদের। রোগীবাহী অনেক অ্যাম্বুলেন্সও আটকা পড়ে যানজটে। রোগী ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তি ছিল অবর্ণনীয়। একই অবস্থা ছিল অফিসগামী ও বিদেশগামী যাত্রীদের। যানবাহন না পেয়ে অনেকে হেঁটে তাদের গন্তব্যে রওনা দেন। বিক্ষোভরত মুসল্লিরা বিমানবন্দর সড়কেই আসরের নামাজ পড়েন। নামাজ শেষে বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা বোর্ডের সিনিয়র সহসভাপতি মাওলানা আশরাফ আলী নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ঘোষণায় বলা হয়, মাওলানা সাদ বাংলাদেশ থেকে চলে না যাওয়া পর্যন্ত টঙ্গীর বিদেশি মেহমানদের স্থান ও কাকরাইল মসজিদের সামনে অবিরাম অবরোধ কর্মসূচি পালন চলবে। এরপর সমাবেশে আসা অনুসারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে চলে যায়। মহাখালীর উত্তর অংশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে এবং মহাখালীর দক্ষিণ অংশের মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের কাকরাইল মসজিদ এলাকায় অবস্থান নিতে বলা হয়। বিক্ষোভকারীরা মাওলানা সাদকে বিতর্কিত আখ্যা দিয়ে বলেন, যে কোনো মূল্যে তাকে দিল্লি ফেরত পাঠানো হবে। যে পর্যন্ত তাকে দিল্লি ফেরত পাঠানো না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ইজতেমা গেটে অবস্থান চলবে। বেফাকের যুগ্ম সচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেছেন, মাওলানা সাদকে দিয়ে তাবলিগ জামাতকে বিতর্কিত করতে চান গিয়াসউদ্দিনের অনুসারীরা। অন্যদিকে, তাবলিগের মুরব্বি গিয়াসউদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, হেফাজতে ইসলাম ও বেফাক মাওলানা সাদকে হেয়প্রতিপন্ন করতে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। যারা বিরোধিতা করবে তারা ইসলামের বিপক্ষে। কারণ মাওলানা সাদের কারণে তারা অবস্থান নিচ্ছেন। এরা ইসলামকে বিতর্কিত করছেন। পুলিশ জানায়, বিক্ষোভের মধ্যে দুপুর পৌনে একটার দিকে দিল্লি থেকে মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্ধলভি ঢাকায় পৌঁছান। এরপর দুপুর দুইটায় তাকে কড়া নিরাপত্তা প্রহরায় বিমানবন্দর থেকে কাকরাইল জামে মসজিদে নেওয়া হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের সুন্নি মতাবলম্বী মুসলমানদের বৃহত্তম ধর্মীয় সংঘ তাবলিগ জামাতের মূল কেন্দ্র বা মারকাজ দিল্লিতে। কেন্দ্রীয় ওই পর্ষদকে বলা হয় নেজামউদ্দিন। ১৩ জন শূরা সদস্যের মাধ্যমেই উপমহাদেশে তাবলিগ জামাত পরিচালিত হয়। এই পর্ষদের সদস্য মাওলানা মোহাম্মদ সাদ কান্ধলভি সম্প্রতি নিজেকে তাবলিগের আমির দাবি করেন। ফলে তার বাংলাদেশে আসা নিয়ে বাংলাদেশে তাবলিগের মূল দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়।

কাকরাইলে সারারাত পুলিশের অবস্থান : কাকরাইল মসজিদে মাওলানা সাদের অবস্থান করা নিয়ে সেখানে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। তাবলিগ জামাতের একটি অংশ বিমানবন্দর এলাকায় বিক্ষোভ শেষে সরাসরি কাকরাইল মসজিদে চলে আসেন। তারা কাকরাইলের বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। তারা মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করতে চাইছেন। পরে পুলিশ তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিয়ে বেরিকেড দিয়েছে। পুলিশ বলছে, বুধবার সারারাত কাকরাইল মসজিদ এলাকায় পুলিশি নিরাপত্তা থাকবে। পুলিশের রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নাবিদ কামাল শৈবাল জানান, আমরা জানতে পেরেছি এখানে বিশৃঙ্খলা বা সংঘর্ষের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। সেজন্য সারারাত এখানে পুলিশি নিরাপত্তা থাকবে।

কাকরাইল মসজিদের খাদেম কাওসার আহম্মেদ সাংবাদিকদের জানান, মাওলানা সাদ আমাদের অতিথিখানায় নিরাপত্তায় রয়েছেন। আমরা চাই সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে দেশে ইজতেমা সম্পন্ন হোক। পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার বিপুল সংখ্যক সদস্য কাকরাইল মসজিদকে ঘিরে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করেছেন।

 

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মাওলানা সাদ বিশ্ব ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসছেন। তবে তার সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক  তৈরি হওয়ায় এবার তার ইজতেমায় অংশ গ্রহণ নিয়ে তাবলিগ জামাতের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়।

ইজতেমায় যান চলাচল ও পার্কিং নির্দেশনা : গতকাল ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী ১২-১৪ জানুয়ারি এবং ১৯-২১ জানুয়ারি রেইনবো ক্রসিং থেকে আবদুল্লাহপুর হয়ে ধউর ব্রিজ পর্যন্ত এবং রামপুরা ব্রিজ থেকে প্রগতি সরণি পর্যন্ত রাস্তা ও রাস্তার পার্শ্বে কোনো যানবাহন পার্কিং করা যাবে না। ইজতেমায় আসা চট্টগ্রাম বিভাগের গাড়ি উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টর রোডের পূর্ব প্রান্ত থেকে পশ্চিম প্রান্ত হয়ে গরিবে নেওয়াজ রোড, ঢাকা বিভাগের গাড়ি সোনারগাঁও জনপথ চৌরাস্তা থেকে দিয়াবাড়ী খালপাড় পর্যন্ত, সিলেট বিভাগের গাড়ি উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টর শাহ মখদুম এভিনিউ, খুলনা বিভাগের গাড়ি উত্তরার ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর, রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগের গাড়ি প্রত্যাশা হাউজিং, বরিশাল বিভাগের গাড়ি ধউর ব্রিজ ক্রসিং এবং ঢাকা মহানগরীর গাড়ি উত্তরার শাহজালাল এভিনিউ, নিকুঞ্জ-১ এবং নিকুঞ্জ-২ এর আশপাশের খালি জায়গায় পার্ক করতে হবে। ১৪ জানুয়ারি এবং ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাতের দিন মহাখালী ক্রসিং, হোটেল রেডিসন গ্যাপ, প্রগতি সরণি, কুড়িল ফ্লাইওভার লুপ-২, ধউর ব্রিজ, বেড়িবাঁধ সংলগ্ন উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের প্রবেশ মুখে ডাইভারশন চলবে। আখেরি মোনাজাতের দিন বিমানের অপারেশনস ও বিমান ক্রু বহনকারী যানবাহন, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স ব্যতীত সব প্রকার যাবাহনের চালকদের বিমানবন্দর সড়ক পরিহার করে বিকল্প হিসেবে মহাখালী, বিজয় সরণি হয়ে মিরপুর-গাবতলী সড়ক ব্যবহার করার জন্য বলা হয়েছে। বিদেশগামী বা বিদেশ ফেরত যাত্রীদের বিমানবন্দরে আনা-নেওয়ার জন্য ট্রাফিক উত্তর বিভাগের ব্যবস্থাপনায় চারটি মাইক্রোবাস নিকুঞ্জ-১ আবাসিক এলাকার গেটে ভোর চারটা থেকে মোতায়েন থাকবে।