অবশেষে লক্ষ্মীপুরের সেই পরী গ্রেপ্তার!

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে অবশেষে সেই ফাতেমা আক্তার পরী বেগমকে গ্রেপ্তার করেছে থানা পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির জাহানের কার্যালয় থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর তাকে লক্ষ্মীপুর জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন রামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন।

পরীর গ্রেপ্তারের খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে রামগঞ্জ উপজেলাব্যাপী ভুক্তভুগীরা স্বস্তি প্রকাশ করেছে। পরীর না জানা আরো অনেক অপকর্ম নিয়ে নিয়ে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পরীকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার বিভিন্ন অপকর্মের নানান তথ্য বের হয়ে আসবে।

জানা যায়, কখনো তানিশা আক্তার, কখনো ফারিয়া চৌধুরী, কখনো পরী, যখন যে নামে ভর করুক না কেন, যার ওপর একবার পরীর নজর পড়েছে আর্থিক-মানসিক ও শারীরিকভাবে ভয়ঙ্কর বিপদে ফেলে দেয়ার ঘটনা অনেক। হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া ও একজন চা বিক্রেতার স্ত্রী হওয়া সত্বেও গোসল করতেন বিলাসবহুল বাথটাবে। রুমভর্তি দামি দামি আসবাবপত্র ঠাসা। সমাজের উঁচু স্তরের বেশকিছু পুরুষের আনাগোনা ছিলো প্রকাশ্যে।

রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ প্রশাসন, পুলিশ ও রাজনৈতিক পরিচয়ে উপজেলার শতাধিক গরীব মানুষদেরকে সরকারি ঘর বরাদ্দ, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা এবং বিদ্যুতের মিটার দেয়ার নাম করে হাতিয়ে নিয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপে টার্গেট করা ব্যক্তিদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুললেও অবশেষে শেষ রক্ষা হলো না।

স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগী কয়েকজন নারী ও গরীব মানুষরা জানান, শুধু নামেই নয় সুন্দর চেহারার অধিকারী পরী বেগম। কখনো উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কখনো মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, আবার কখনো সমাজসেবা কর্মকর্তা সেজে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে পুরুষ, গ্রামের অবলা দরিদ্র অসহায় নারী ও কিশোরীদের ফাঁদে ফেলে নিজের ইচ্ছেমতো অর্থ আদায় করাই হলো এই পরীর কাজ।

এছাড়া উঠতি বয়সের যুবক, চাকরিজীবী, জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদসহ ব্যক্তিদের ফেসবুকে আপত্তিকর চ্যাটিং বা মোবাইল ফোনে কথা বলে ট্রাপে ফেলেও প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছে কয়েক লাখ টাকা।

অন্যদিকে, ফোনে কথা বলে রুমমেট করার ফাঁদে ফেলে ‘শিকার’ ধরতো ওই সুন্দরী পরী। কিন্তু এ ফাঁদ যে কতো ভয়ঙ্কর তা যখন টের পেতো, তখন কিছুই করার থাকতো না ভুক্তভোগীদের। তার ওইসব অপকর্মকে সেল্টার দেয়ার জন্য রয়েছে উপজেলায় রয়েছে অঘোষিত একটি সিন্ডিকেট। যার ফলশ্রুতিতে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি কখনো।

বেশ কয়েক মাস থেকে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জের এলাকায় পরী বেগমের নানান প্রতারণার খবর এখন ‘টক অব দ্যা রামগঞ্জে’ পরিণত হয়েছে।

পরীর এহেন প্রতারণার কর্মকাণ্ডের বিচারের দাবিতে ভুক্তভোগী শিরীন আক্তার নামে এক গৃহবধূ একাধিক নারীর পক্ষে বাদী হয়ে রামগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী অফিসার মুনতাসির জাহানের বরাবর একটি অভিযোগ দায়ের করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরী বেগম রামগঞ্জ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড নন্দনপুর গ্রামের উম্মেদ ভূঁইয়া বাড়ির চা দোকানি আলমগীর হোসেনের স্ত্রী।

পরী বেগম সম্প্রতি রামগঞ্জ উপজেলার চন্ডীপুর ইউনিয়নের বেচারাম বাড়ির শিরীন আক্তারসহ ২৩ জন দরিদ্র অসহায় নারীর কাছ থেকে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পরিচয় দিয়ে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃত্ব ভাতা ও সরকারি বরাদ্ধে ঘর করে দেয়ার নাম করে এক লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এছাড়াও পরী বেশ কয়েকদিন আগেও রামগঞ্জ পৌরসভার সাতারপাড়া গ্রামের মিয়াবাড়ির জেসমিন আক্তারের কাছ থেকে ৩ হাজার, সুফিয়া বেগমের কাছ থেকে ৮ হাজার, একই গ্রামের মিয়ার বাড়ির সোহাগী বেগমের কাছ থেকে ১০ হাজার, নাসরিন আক্তারের কাছ থেকে ৩০ হাজার, সুমা আক্তারের কাছ থেকে ৭ হাজার, আকলিমা আক্তারের কাছ থেকে ৭ হাজার, বাচ্চু মিয়ার কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

এ ব্যপারে পরী বেগমের স্বামী আলমগীর হোসেন বলেন, আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো মিথ্যা। শিরিন বেগম ইএনও অফিসে যে অভিযোগ করেছে তাও পুরোপুরি সত্য নয়। আমার স্ত্রী জানায়, শিরিন বেগম তাকে মাত্র ২ হাজার ৫শ’ টাকা দিয়েছে। বাকী টাকা সে আত্মসাৎ করে আমার স্ত্রীকে দোষারোপ করছে।

এ ব্যাপারে রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুনতাসির জাহান জানান, ফাতেমা আক্তার পরীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের জন্য সমাজসেবা কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে পরীর বিরুদ্ধে বিধিমোতাবেক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

রামগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা পরী বেগমের বিরুদ্ধে একটি প্রতারণার অভিযোগ পেয়ে তদন্ত করেছি। তদন্তে সত্যতা পেয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেছি। প্রতারণা ও প্রশাসনের পরিচয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায় মঙ্গলবার বিকেলে তাকে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারে প্রেরণ করেছি।

 

আরও পড়ুন