আওয়ামী লীগের সম্মেলন অক্টোবরে

আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। অথচ তিন বছরে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সাংগঠনিক জেলায় সম্মেলন হয়েছে। ২০১৭ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজার জেলার সম্মেলন হয়। বাকি ৭৭টি সাংগঠনিক জেলা কমিটিই এখন মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব জেলায় সম্মেলনের জন্য সময় রয়েছে মাত্র পৌনে দুই মাস। এখনো পর্যন্ত সম্মেলনের তারিখই ঘোষণা করা হয়নি। তারিখ ঘোষণার আগে বর্ধিত সভা হওয়ার কথা থাকলেও অনেক জেলায় তাও হয়নি। তবে জাতীয় কাউন্সিলের আগেই জেলাগুলোর সম্মেলন হয়ে যাবে বলে সম্প্রতি জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি।

আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনের আগে ৫৮টি সাংগঠনিক জেলায় সম্মেলন হয়েছিল। ২০১৬ সালের ২২ ও ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের দুই দিনব্যাপী ২০তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই হিসেবে আগামী ২৩ অক্টোবর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হবে। আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে কয়েক দফায়— এমন ঘোষণা দিয়েছেন দলটির সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলীয় কার্যক্রম গতিশীল করে তুলতে এবং শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দলকে দাঁড় করাতে জাতীয় সম্মেলনের গুরুত্বের কথা বলেন তিনি। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দলের সর্বস্তরে সম্মেলনের আওয়াজ দেখা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সম্মেলনের দৃশ্যমান প্রস্তুতি নেই। জাতীয় সম্মেলন করার আগে জেলা সম্মেলন সম্পন্ন করা, কাউন্সিলর, ডেলিগেট নির্বাচন করা, চাঁদা পরিশোধ করা ও প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সাব-কমিটি গঠন করা এসব কিছুই করা হয়নি আওয়ামী লীগের। এসব কারণে যথাসময়ে সম্মেলন আয়োজন নিয়ে মাঠের নেতাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

রাজনীতির মাঠ এখন অনেকটাই ফাঁকা। প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি রাজনীতির মাঠে না থাকলেও ডেঙ্গু, বন্যা ও গুজব মোকাবিলা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। এসব ইস্যুতে সামাজিক অসন্তোষ যেন দেখা দিতে না পারে, সে জন্য দলীয় কর্মসূচি আপাতত স্থগিত রেখে জনগণকে দ্রুত দুর্ভোগমুক্ত করতে সরকারের পাশাপাশি আওয়ামী লীগও আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভার ১১ জন সদস্য দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন তিন জন সাংগঠনিক সম্পাদক ও এক জন যুগ্ম সাধারণ

সম্পাদক। তারা সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকায় দলের গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালনে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তাদের। এছাড়া অনেকে কেন্দ্রীয় নেতা হলেও নিজ জেলা বা সংসদীয় আসনের রাজনীতি সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছেন। সাংগঠনিক ক্ষমতা না থাকলেও নিজ জেলা ও উপজেলা কমিটিতে নিজ বলয়ে লোক বসানোর কাজে ব্যস্ত তারা। এছাড়া দায়িত্বরত নেতারা খবর রাখেন না জেলা ও উপজেলা নেতাদের।

২০তম সম্মেলনের আগে ২০১৫ ও ২০১৬ সালের মধ্যেই বেশিরভাগ জেলায় ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন হলেও শুধু সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দিয়ে কেটে যায় অন্তত দেড় বছর। গত ৫ এপ্রিল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় নির্ধারিত সময়ে দলের জাতীয় সম্মেলনের সিদ্ধান্ত হয়। তৃণমূল পর্যায় থেকে এ সম্মেলনের প্রস্তুতির জন্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে আটটি সাংগঠনিক টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। এ টিমগুলোকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সম্মেলনসহ সাংগঠনিকভাবে তৃণমূলকে প্রস্তুত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী এ টিমগুলো জেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক সফর করে। তবে জুলাইয়ে অনেক জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে এ টিমগুলোর কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। যেসব জেলা বন্যাকবলিত হয়ে পড়ে সেসব জেলায় সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। এ সময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গতদের সহযোগিতা ও ত্রাণ কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং কেন্দ্রীয় নেতারাও ত্রাণ কার্যক্রমে অংশ নেন। এরপর ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ও শোকের মাস আগস্ট শুরু হয়। শোকের মাস শেষ হয়েছে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আবার ঐ টিমগুলো তৃণমূল সফর করে সম্মেলনের প্রস্তুতির কাজ শুরু করবে বলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানান।

আওয়ামী লীগের দুই জন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জানান, আমাদের প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলায় কমিটি আছে। যেসব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, সেই জায়গা চিহ্নিত করে সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সদস্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছিল আওয়ামী লীগ। তখন শুরুতে কিছুটা উত্সাহ-উদ্দীপনা থাকলেও কিছুদিন পরই নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় সদস্য সংগ্রহ অভিযান চলে ঢিলেঢালাভাবে। ফলে তখন সে কাজ আর শেষ হয়নি। এরপর গত জুনে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের পহেলা জুলাই থেকে সারাদেশে এ কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে সে তারিখও পেছানো হয়। গত ৩০ জুন আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ২১ জুলাই থেকে সারাদেশে নতুন ভোটারদের আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম শুরু হবে। কিন্তু পরে সে তারিখও পেছানো হয়। অপরদিকে উপজেলা পরিষদের গত নির্বাচনে দলের ‘নৌকাবিরোধী’ নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও আটকে আছে। এটি নিয়ে দোটানায় পড়েছে দলটি।

আরও পড়ুন