আজাদ কাশ্মীরের চেয়ে জম্মু-কাশ্মীরে নাগরিক সুবিধা বেশি

দেশ ভাগের পর থেকে বিতর্কিত ও সংঘাতপূর্ণ এলাকা হিসেবে কাশ্মীর বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। এক কাশ্মীরের অস্তিত্ব জড়িয়ে রয়েছে তিনটি দেশে। সমগ্র কাশ্মীরের ৪৩ ভাগ এলাকা ভারতের অধীনে, যার মধ্যে রয়েছে জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা, লাদাখ এবং সিয়ানচেন হিমবাহ। পাকিস্তান দখল করে রেখেছে কাশ্মীরের ৩৭ ভাগ ভূখণ্ড যার মধ্যে রয়েছে, আজাদ কাশ্মীর এবং উত্তরাঞ্চলীয় গিলগিট ও বালতিস্তান।

অন্যদিকে চীনের দখলে রয়েছে কাশ্মীরের ২০ ভাগ এলাকা, যার নাম আকসাই চীন। তবে ১৯৪৭ সালের পর থেকে এই অঞ্চল নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে। যে কারণে বহু বছর ধরে এই কাশ্মীর ইস্যুতে উত্তপ্ত ভারত-পাকিস্তানের রাজনীতি। কিন্তু এই ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠীর নাগরিক সেবা নিশ্চিতে ভারত-পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে কতোটুকু আগ্রহী! নিজ দেশের সরকার দ্বারা সেই ভূখণ্ডের নাগরিকরা কি কি সুবিধা পাচ্ছে তা যথেষ্ট আলোচনার দাবি রাখে।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘ল অ্যান্ড সোসাইটি এলায়েন্স’- নামক এক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের দুই অংশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কেমন সেটি বিশ্লেষণ করেতে গিয়ে তারা যে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছে সেখানে এক ভয়াবহ বৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠেছে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ও গিলগিট-বালতিস্তানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক খাতে পাকিস্তান যে পরিমাণ বরাদ্দ দিচ্ছে তার চেয়ে জম্মু-কাশ্মীরে ভারতের বরাদ্দের পরিমাণ অনেক বেশি। দুই দেশের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতের পার্থক্য দেখলে যে কারো চোখ কপালে ওঠবে তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

 

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আজাদ কাশ্মীরের বাসিন্দাদের জন্য ইসলালামাবাদ যে পরিমাণ বাজেট শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে দিয়েছে তার থেকে কয়েক গুণ বেশি নাগরিক সুবিধা দিচ্ছে দিল্লি। ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে দেখা গেছে, পাকিস্তানের অধীনে আজাদ কাশ্মীরে বাজেট ধরা হয়েছে ১২ হাজার ১৫৬ কোটি পাকিস্তানি রুপি। আর জম্মু কাশ্মীরের জন্য বাজেট বরাদ্দ হয়েছে ৮৮ হাজার ৯১১ কোটি ভারতীয় রুপি যা পাকিস্তানের চেয়ে ১৬ গুণ বেশি। শিক্ষাখাতে দেখা গেছে- ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১.৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেট শিক্ষাখাতে বরাদ্দ রেখেছে দিল্লী অপরদিকে পাকিস্তান আজাদ কাশ্মীরের জন্য বরাদ্দ রেখেছে মাত্র ১৭৩ মিলিয়ন ইউএস ডলার। পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তানে শিক্ষার হার ৬০ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে মাত্র ৬টি। আর জম্মু কাশ্মীরে ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষার হার ৬৭.১৬ শতাংশ। ভারত সরকার জম্মু কাশ্মীরে ৪টি প্রিমিয়াম ইন্সটিটিউশনও গড়ে তুলেছে; আইআইটি জম্মু, আইআইএম জম্মু, এনআইটি শ্রীনগর, এনআইএফটি শ্রীনগর।

এছাড়া জম্মু কাশ্মীরের স্বাস্থ্যখাতে তহবিল দেয়া হয়েছে ৬১৮ মিলিয়ন ডলার। আর পাকিস্তান অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরে মাত্র ৬২ মিলিয়ন ডলার। জম্মু কাশ্মীরে হাসপাতাল রয়েছে ৫ হাজার ৫৩৪টি। আর পাকিস্তান অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরে হাসপাতাল রয়েছে ৭৩টি এবং গিলগিট-বালতিস্তানে মাত্র ৩৩টি! ১,৬৫৮ জন রোগীর পেছনে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে রয়েছে ১ জন ডাক্তার অপরদিকে ৪,৯১৬ জন রোগীর পেছনে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে রয়েছে ১ জন ডাক্তার। জম্মু কাশ্মীরে শিশু মৃত্যুর হার যেখানে ২৩ জন, পাকিস্তান অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরে শিশু মৃত্যুর হার ৬২ জন।

অপরদিকে গিলগিট-বালতিস্তানে মাতৃমৃত্যু হার প্রতি লাখে প্রায় ৬০০ জন যা পাকিস্তানে সর্বোচ্চ। ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা উপমহাদেশকে স্বাধীনতা দিয়ে চলে যাওয়ার সময় কাশ্মীরকে সংকটের ঘূর্ণাবর্তে ফেলে রেখে যায়। উপমহাদেশের অনেক সমস্যার মতোই কাশ্মীর সমস্যাও ইংরেজ সৃষ্ট। কাশ্মীর প্রসঙ্গে ভারত পাকিস্তান ১৯৪৭, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯ সালে ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং সিয়ানচেন হিমবাহ নিয়ে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে পারমাণবিক উত্তেজনাপূর্ণ যুদ্ধের বিভীষিকাও ছড়ায়। এছাড়া পাকিস্তান সরকারের মদদে উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠীরাও ১৯৯০ থেকে হিন্দু পণ্ডিতদের হত্যা করে, যার ফলে সমগ্র পণ্ডিত জনগোষ্ঠী কাশ্মীর ছাড়তে বাধ্য হয়। এক কথায় সাধারণ হিন্দু- মুসলমান উভয়ে নানামুখী নির্যাতনের স্বীকার হয় এই কাশ্মীরে। এই সংকট নিরসনে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেয় ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা। ৩৭০ ধারা হলো ভারতীয় সংবিধানের একটি টেম্পোরারি প্রভিশন বা অস্থায়ী বিধান। এই ধারার আওতায় জম্মু-কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা ও বিশেষ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছিল। এর ভিত্তিতেই কাশ্মীর রাজ্য ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

১৯৪৭ সালের ১৯ অক্টোবর এই ধারার খসড়া তৈরি করা হয়েছিলো। ১৯৫৪ সালে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে ধারাটি ৩৭০-এ অন্তর্ভুক্ত হয় সংবিধানে। এই ৩৭০ ধারাটির সঙ্গে ১৯৫৪ সালের সঙ্গে ৩৫-এ উপ-ধারা যুক্ত করা হয়। এই দুই ধারা বলে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতীয় সংবিধানের আওতাভুক্ত রাখা হয়। অর্থাৎ সারা ভারতে যে সংবিধান বলবৎ ছিল জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে তা ছিল ভিন্ন। জম্মু কাশ্মীরের বাসিন্দাদের দু’টি নাগরিকত্ব থাকে। জম্মু-কাশ্মীরের রাষ্ট্রীয় পতাকা আলাদা। জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভার কার্যকাল ৬ বছরের, যা অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রে ৫ বছরের হয়ে থাকে। এমনকি জম্মু-কাশ্মীরের ভেতরে ভারতের রাষ্ট্রীয় পতাকার অপমান করা অপরাধ নয়! জম্মু-কাশ্মীরের কোনো নারী ভারতের ২৯ রাজ্যের মধ্যে ২-৩টি ছাড়া বাকি রাজ্যের পুরুষের সঙ্গে বিবাহ করলে ওই নারীর জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিকত্ব সমাপ্ত হয়ে যায়। ঠিক একইভাবে ভারতের অন্য কোনো রাজ্যের কোনো নারী জম্মু-কাশ্মীরের কোনো বাসিন্দাকে বিয়ে করলে তিনি জম্মু- কাশ্মীরের নাগরিকত্ব পেয়ে যান। এমনকি পাকিস্তানি কোনো নারী জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিককে বিয়ে করলেও তার সমস্যা হয় না। সে কাশ্মীরের নাগরিকত্ব পায়।

৩৭০ ধারার বলে ভারতের সংবিধানের কোনো ধারা জম্মু-কাশ্মীরে কার্যকর হয় না। ৩৭০ ধারার বলে পাকিস্তানের কোনো নাগরিক জম্মু-কাশ্মীরে থাকলে তিনিও ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে যান। জম্মু-কাশ্মীরে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার আইন নেই। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা আদেশ জম্মু-কাশ্মীরে প্রয়োগ হয় না। জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দারা ভারতের কোথায়ও জমি কিনতে পারেন না। জম্মু-কাশ্মীরের জন্য রয়েছে আলাদা সংবিধান। ৩৭০ ধারা অনুযায়ী প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, অর্থ এবং যোগাযোগ ছাড়া অন্য কোনও বিষয়ে জম্মু কাশ্মিরে হস্তক্ষেপের অধিকার ছিল না কেন্দ্রীয় সরকারের। এমনকি, কোনও আইন প্রণয়নের অধিকার ছিল না কেন্দ্র বা সংসদেরও। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারতের পার্লামেন্টে ৩৭০ ধারা বাতিল করে অন্যান্য রাজ্যের যে সুবিধা সেই সুবিধাকে নিশ্চিত করা হয়েছে জম্মু কাশ্মীরেও।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, অনেকেই বলছেন এই ৩৭০ ধারা বাতিল অসাংবিধানিক কিন্তু ৩৭০ ধারার মাধ্যম যে স্বায়ত্ত্বশাসন জম্মু-কাশ্মীর ভোগ করছিলো সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল এই স্বায়ত্ত্বশাসন ‘অস্থায়ী’। অর্থাৎ সাংবিধানিক নিয়ম নীতির মধ্যে থেকেই এই সংশোধনী এনেছে কেন্দ্র। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের নাগরিকরা যে সুবিধা পাবেন এক্ষেত্রে এখন থেকে জম্মু কাশ্মীরের নাগরিকরাও সমান সুবিধা পাবেন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও যে বাজেট জম্মু কাশ্মীরের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে তাদের সর্বোচ্চ নাগরিক সুবিধার বার্তাই দেয়া হয়েছে। জম্মু কাশ্মীর ও আজাদ কাশ্মীরের ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে ‘ল অ্যান্ড সোসাইটি এলায়েন্স’ যে গবেষণা ফল প্রকাশ করেছে তা ভারত-পাকিস্তান সরকারের প্রকাশিত ডাটা, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট, আন্তর্জাতিক এনজিওসহ গণমাধ্যমের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি করা হয়েছে। এই রিপোর্ট একটি বিষয়কে নিঃসন্দেহে তুলে ধরছে যে, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে দিল্লী আন্তরিক থাকলেও আজাদ কাশ্মীরের ক্ষেত্রে ইসলামাবাদ ততোটা মনযোগী নয়। ইমরান খান বা পাকিস্তান সেনাবাহিনী শুধুমাত্র মুখের বুলির ওপর আজাদ কাশ্মীরকে সুবিধা দিচ্ছেন, বাস্তবের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে শুধুমাত্র ধর্মের কথা বলে ইমরান সরকার নিজেদের অবস্থান জানান দিতে চাইছে, ধর্মীয় কার্ড পাকিস্তানের মূল অস্ত্র। আজাদ কাশ্মীরে নাগরিক সুবিধা শূন্যের কোটায় রেখে বছরের পর বছর পাকিস্তান সরকার শুধু ফাঁকা বুলিই দিয়ে যাচ্ছে। এভাবে আর কতোদিন?

লেখক : রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।

 

 

আরও পড়ুন