আন্দোলন-কর্মবিরতিতে উত্তপ্ত গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত হওয়া সহ ১০ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলন এবং শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও জুনিয়র মেডিকেল অফিসারদের কর্মবিরতিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সাভারের গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ।

 

শনিবার (২৭ জুলাই) সকাল থেকে অষ্টমদিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ-মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি তৃতীয় দিনের মতো সাভার গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে কর্মবিরতি পালন করছে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও জুনিয়র মেডিকেল অফিসাররা।

শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে যাত্রা শুরু হওয়া গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ দেশের প্রথমসারির একটি মেডিকেল কলেজ। এখন পর্যন্ত এমবিবিএসে ২৪টি এবং বিডিএসে ১৫টি ব্যাচ ভর্তি হয়েছে। যার মধ্যে বিভিন্ন ব্যাচের ১৫ শতাধিক শিক্ষার্থী এমবিবিএস, বিডিএস পড়শোনা শেষে বিএমডিসি’র রেজিস্ট্রেশন সহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছে।

পরবর্তীতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে ‘বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালা ২০১১ (সংশোধিত)’ প্রকাশ করে।

যার অনুচ্ছেদ ৭.১-এ বলা রয়েছে, ‘বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্স চালু রাখতে হলে অবশ্যই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন/অধিভুক্ত নিতে হবে।’ উক্ত নির্দেশনা উপেক্ষা করায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ৩৫ নং ধারার ক্ষমতাবলে ২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিবিএস, বিডিএস, ফিজিওথেরাপি, বিবিএ ও পরিবেশ বিজ্ঞান কোর্সের অনুমোদন নেই মর্মে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এ বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে ওই বছরের ২৯ মে গণ বিশ্ববিদ্যালয় হাইকোর্টে একটি রিটি পিটিশন দায়ের করে। ওই রিটের ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট ডিভিশন ইউজিসির দেওয়া নোটিশে স্থগিতাদেশ আরোপ করে।

সর্বশেষ গত ১৭ জুন, ২০১৯ তারিখে জাতীয় পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আবারো ‘গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা সংক্রান্ত গণ বিজ্ঞপ্তি’ শিরোনামে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। যেখানে মঞ্জুরি কমিশন উল্লেখ্য করে, ‘বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ধারা ৩৫ নং এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত/নির্দেশনা উপেক্ষা করে (1) MBBS, (2) BDS, এবং (3) Physiotherapy প্রোগ্রাম সমূহে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন থেকে বারবার নিষেধাজ্ঞা প্রদানসহ পত্রিকায় একাধিকবার সতর্কতামূলক গণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। তদপ্রেক্ষিতে গণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তপক্ষ মাননীয় আদালতে রিট (রিট পিটিশন নং-৭১৯৬/২০১৭) দায়ের করে এবং পিটিশনের উপর মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনের ০৬ মাসের স্থগিতাদেশ পায় এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কমিশনের ওয়েবসাইটে তা আপলোড করে। বর্তমানে উক্ত স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা ভ্যাকেট হয়ে যাওয়ার উপরোক্ত প্রোগ্রামসমূহ বৈধ বলে বিবেচিত হবে না।’

কিন্তু ২৪ জুন গণ বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসিকে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে জানায়, তাদের ওই বিজ্ঞপ্তি ভিত্তিহীন। কারণ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ কোর্সগুরো চালু রাখার জন্য হাইকোর্টের বর্ধিত স্থগিতাদেশ ২০১৯ সালের ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। ইউজিসিকে এ নোটিশপ্রাপ্তির দুই দিনের মধ্যে আগের বিজ্ঞপ্তি ভুল ছিল মর্মে উপরোক্ত কোর্সগুলো অনুমোদিত বলে নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অনুরোধ জানায় গণ বিশ্ববিদ্যালয়।

উপরিউক্ত পরিস্থিতে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ২০১৬-১৭ সেশন থেকে এমবিবিএস শিক্ষার্থী হিসাবে গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। পাশাপাশি দীর্ঘদিন নবীন ডাক্তারদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বন্ধ থাকার পরে সম্প্রতি আবার রেজিস্ট্রেশন দেওয়া শুরু করেছে বিএমডিসি। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লক্ষ্যে, বাবা-মায়ের লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে নিজেদের ‘অবৈধ ডাক্তার’ ঘোষণার হাত থেকে বাঁচাতে সকল প্রকার ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ঢাবির অধিভুক্তিসহ ১০দফা দাবিতে ২০ জুলাই (শনিবার) থেকে আন্দোলনে নেমেছে প্রায় তিনশ’ শিক্ষার্থী। আন্দোলনের ষষ্ঠ দিনে শিক্ষার্থীদের দাবি সমূহের সাথে সম্মতি জানিয়ে সাভার গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে অনির্দিষ্টকালের জন্যে কর্মবিরতি ঘোষণা করে শিক্ষানবিশ চিকিৎসক ও জুনিয়র মেডিকেল অফিসাররা।

দাবি বাস্তবায়ন সম্পর্কে গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফরিদা আদিব খানম জানান, ‘আন্দোলন শুরুর পূর্বেই গণ বিশ্ববিদ্যালয় তদারকি ও উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যানের সম্মতিতে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর অধিভুক্ত হওয়ার কাজ শুরু করেছি। কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ৫ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তর্ভুক্তির ফরম নিয়ে এসেছি আমরা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ অতিদ্রুত আবেদন ফর্ম জমা দিতে পারবো বলে আমরা বিশ্বাসী।’

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, ‘অধিভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ বিষয়। আমাদের কাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্যে সে নূন্যতম সময়টুকু আমাদেরকে দিতে হবে। প্রতিষ্ঠার ২২বছর পরে একটি মেডিকেল কলেজকে ঢাবির অধিভুক্ত করার পথে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। সকল শিক্ষার্থী, শিক্ষকমন্ডলির সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা তাদের হয়েই কাজ করছি। তাদের বিপক্ষে নয়। তাই শিক্ষার্থীদের ক্লাসে এবং চিকিৎসকদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার দাবিতে নেমেছি। মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষ ঢাবিতে অধিভুক্তির কাজ শুরু করলেও ট্রাস্টি বোর্ডের উপর আমাদের ভরসা নাই। তাই আমরা ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষ থেকে ঢাবিতে অধিভুক্তির সম্মতিপত্র লিখিত নোটিশ হিসাবে চাই। অন্যথায় আমাদের আন্দোলন চলবে।’

দাবি সমূহঃ

১। দেশের প্রচলিত আইন মেনে গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করতে হবে।

২। মেডিকেল কলেজের জন্য আলাদা ভবনের ব্যবস্থা করতে হবে।

৩। বিএমডিসি ও সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের সকল নিয়ম মেনে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

৪। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি করণের কাজ কতদূর তার তথ্য শিক্ষার্থীদের অবগত করতে হবে।

৫। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসিক হলের ব্যবস্থা করতে হবে।

৬। অভিজ্ঞ ও যোগ্যতা সসম্পূর্ণ শিক্ষক দিয়ে পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

৭। গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী ব্যতিত কাউকে ইন্টার্ণ করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

৮। যোগ্যতা সম্পূর্ণ ডাক্তার সৃষ্টির লক্ষে উন্নত প্রযুক্তি সম্পূর্ণ যন্ত্রাংশ ব্যবহারে দক্ষ করে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে।

৯। মেডিকেল কলেজের জন্য আলাদা লোগোর ব্যবস্থা করতে হবে।

১০। মেডিকেল কলেজের ওয়েবসাইট আরো উন্নত করতে হবে এবং নিয়মিত হালনাগাদের ব্যবস্থা করতে হবে।

আরও পড়ুন