উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ

মোহাম্মদ রনি খাঁ, গণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে: স্বতন্ত্র কলেজ প্রতিষ্ঠা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্তিূসহ ৬দফা দাবিতে তৃতীয় দিনের মতো সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিওথেরাপি বিভাগের শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি ও ১০দফা দাবিতে নবম দিনের লাগাতার আন্দোলন, শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ।

রোববার (২৮জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে ‘রক্ত লাগলে রক্ত নে, বৈধতা এনে দে’, ‘ঢাবি ঢাবি ঢাবি চাই, গণতে আর নাই’, ‘ছয় দফা এক দাবি, ফিজিওথেরাপি কলেজ চাই’ ইত্যাদি লেখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে নানা স্লোগান দিচ্ছে ফিজিওথেরাপি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, “স্বৈরাচার নিপাক যাক, গণস্বাস্থ্য মুক্তি পাক” ইত্যাদি স্লোগানে তারাও আন্দোলন বেগবান রেখেছেন।

এক্ষেত্রে চলমান সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস, পরীক্ষা বর্জন করে অবস্থান কর্মসূচি পালন বলে জানিয়েছে তারা।

ফিজিওথেরাপি বিভাগের শিক্ষার্থীরা জানান, গণ বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন যাবত অবৈধভাবে ফিজিওথেরাপি বিভাগ পরিচালনা করে আসছে, যা কিনা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য হুমকিস্বরুপ। তাই শিক্ষার্থীদের ভবিষতের কথা বিবেচনায় নিয়ে অবিলম্বে স্বতন্ত্র ফিজিওথেরাপী কলেজ প্রতিষ্ঠা করে, সেই কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি করার দাবি জানাচ্ছি।

এমবিবিএস শিক্ষার্থীরা জানায়, ১৯৯৮ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে যাত্রা শুরু হওয়া গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ দেশের প্রথমসারির একটি মেডিকেল কলেজ। এখন পর্যন্ত এমবিবিএসে ২৪টি এবং বিডিএসে ১৫টি ব্যাচ ভর্তি হয়েছে। যার মধ্যে বিভিন্ন ব্যাচের ১৫ শতাধিক শিক্ষার্থী এমবিবিএস, বিডিএস পড়শোনা শেষে বিএমডিসি’র রেজিস্ট্রেশন সহ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছে।

ফিজিওথেরাপি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. নাসিমা ইয়াসমিন (পিটি) বলেন, ‘হুট করেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ বিষয়ে কাজ শুরু হয়েছে।’

গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ফরিদা আদিব খানম জানান, “আন্দোলন শুরুর পূর্বেই আমরা কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তর্ভুক্তির ফরম নিয়ে এসেছি আমরা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সহ অতিদ্রুত আবেদন ফর্ম জমা দিতে পারবো বলে আমরা বিশ্বাসী।”

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে “বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালা ২০১১ (সংশোধিত)” প্রকাশ করে। যার অনুচ্ছেদ ৭.১-এ বলা রয়েছে, ‘বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্স চালু রাখতে হলে অবশ্যই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন/অধিভুক্ত নিতে হবে।’ উক্ত নির্দেশনা উপেক্ষা করায় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ৩৫ নং ধারার ক্ষমতাবলে ২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিবিএস, বিডিএস, ফিজিওথেরাপি, বিবিএ ও পরিবেশ বিজ্ঞান কোর্সের অনুমোদন নেই মর্মে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এ বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে ওই বছরের ২৯ মে গণ বিশ্ববিদ্যালয় হাইকোর্টে একটি রিটি পিটিশন দায়ের করে। ওই রিটের ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট ডিভিশন ইউজিসির দেওয়া নোটিশে স্থগিতাদেশ আরোপ করে।

অন্যদিকে, ফিজিওথেরাপি কোর্স পরিচালনার ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক জারিকৃত প্রজ্ঞাপন-২০০৩ থেকে জানা যায়, “স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কোনরূপ মেডিকেল/ডেন্টাল ফ্যাকাল্টি অথবা চিকিৎসা সংক্রান্ত কোন কোর্স যেমন- ফিজিওথেরাপী পরিচালনা করা যাইবে না।” ফিজিওথেরাপিষ্টদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল’ এর আইনেও ফিজিওথেরাপি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এর অধীনে করার কথা বলা হয়েছে।

সর্বশেষ গত ১৭ জুন, ২০১৯ তারিখে জাতীয় পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আবারো ‘গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান অবস্থা সংক্রান্ত গণ বিজ্ঞপ্তি’ শিরোনামে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। যেখানে মঞ্জুরি কমিশন উল্লেখ্য করে, “বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ধারা ৩৫ নং এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত/নির্দেশনা উপেক্ষা করে (1) MBBS, (2) BDS, এবং (3) Physiotherapy প্রোগ্রাম সমূহে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন থেকে বারবার নিষেধাজ্ঞা প্রদানসহ পত্রিকায় একাধিকবার সতর্কতামূলক গণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয়। তদপ্রেক্ষিতে গণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তপক্ষ মাননীয় আদালতে রিট (রিট পিটিশন নং-৭১৯৬/২০১৭) দায়ের করে এবং পিটিশনের উপর মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনের ০৬ মাসের স্থগিতাদেশ পায় এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী কমিশনের ওয়েবসাইটে তা আপলোড করে। বর্তমানে উক্ত স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা ভ্যাকেট হয়ে যাওয়ার উপরোক্ত প্রোগ্রামসমূহ বৈধ বলে বিবেচিত হবে না।”

উপরিউক্ত পরিস্থিতে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ২০১৬-১৭ সেশন থেকে এমবিবিএস শিক্ষার্থী হিসাবে গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। পাশাপাশি দীর্ঘদিন নবীন ডাক্তারদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া বন্ধ থাকার পরে সম্প্রতি আবার রেজিস্ট্রেশন দেওয়া শুরু করেছে বিএমডিসি।

কিন্তু এ বছরের ২৪ জুন গণ বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসি’কে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে জানায়, তাদের ওই বিজ্ঞপ্তি ভিত্তিহীন। কারণ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ কোর্সগুরো চালু রাখার জন্য হাইকোর্টের বর্ধিত স্থগিতাদেশ ২০১৯ সালের ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত রয়েছে। ইউজিসি’কে এ নোটিশপ্রাপ্তির দুই দিনের মধ্যে আগের বিজ্ঞপ্তি ভুল ছিল মর্মে উপরোক্ত কোর্সগুলো অনুমোদিত বলে নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অনুরোধ জানায় গণ বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন