কবরী কেন কানাডার নাগরিকত্ব নেননি!

২০০৭’এ কবরী ইমিগ্রেশন নিয়ে কানাডায় এসেছিলেন। তখন থাকতেন টরন্টোস্থ থ্রি ম্যাসীতে। তাঁর অফুরন্ত অবসরে প্রায় বিকেলেই আড্ডা দিতে চলে আসতেন ড্যানফোর্থের সাপ্তাহিক বাংলা রিপোর্টারের কার্যালয়ে। সেটা ছিল আমার বাসা-কাম-অফিস। আমি তখন পত্রিকাটি সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলাম। এখানে আড্ডা দিয়ে এসেছিলেন- জিয়া হায়দার, হায়াৎ মামুদ, ফজলুল আলম এবং আরো অনেকেই।

সেই সময় বৃষ্টির দিনে আমার অফিসে ইলিশ-খিচুরি, বেগুণ ভাজি-আলুভর্তা চলতো। ইকবাল হাসানের বাসায় পানাহারের আসর, কবরীর বাসায় ডিনার এভাবে বেশ কিছু দিন সুন্দর সময় কেটেছে আমাদের। যদিও তখন সারোয়ার ভাইয়ের সাথে সম্পর্কটা দিন দিন ক্রমশই অবনতির দিকে যাচ্ছিলো! আমার জন্য সময়গুলো মধুর হলেও তাঁর জন্য ছিলো তিক্তকর। দাম্পত্য জীবনের অবসানের সূত্রপাত ঢাকা থেকে ঘটলেও অসুস্থ ছোট ছেলের সুস্থ জীবনের কথা ভেবে কবরী এবং সারোয়ার এসেছিলেন কানাডায়।

প্রথমে কবি ইকবালের বাসায় কিছুদিন থাকার পর তাঁরা আলাদা বাসা নেন। সম্পর্ক অবনতি ঘটানোর পেছনে কলকাঠি নাড়ানোর নাটের গুরু ছিলো কবি ইকবাল হাসান। তিনি তার স্বভাব মোতাবেক দুই নৌকায় পা দিয়ে, দু’দিকেই তাল দিতেন এবং দু’জনের কান ভারী করতেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে কবরী আপা খুব ক্ষেপে যান।

 

একদিন কবরী পরিচালিত ‘আয়না’ ছবিটি আমরা বাংলা রিপোর্টারে দেখি। কবরী ছবি দেখতে দেখতে বললেন, নিজের লেখা বইয়ের পাঠক হওয়া আর নিজের পরিচালিত ছবি দেখা একই রকম।

পরে সেই আয়না নিয়ে একটা আলোচনা কবরী আপার প্রতিক্রিয়াসহ বাংলা রিপোর্টারে ছাপা হয়। তার কাউন্টার দেয়ার জন্য ইকবাল হাসান মুক্তিযোদ্ধা সফিউদ্দীন সারোয়ারের একটি সাক্ষাৎকার এনে ছাপার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। তা বাংলা রিপোর্টারে ছাপা হয়। কিন্তু এটা যে একটা ‘প্যাচ’ তা টের পাইনি। আর সেই সাক্ষাৎকারটি ছাপার জন্যই কবরী আপার বাসায় পার্টি দিয়েছেন সারোয়ার সাহেব এবং ইকবাল হাসান। বাজার, রান্নাবান্না হচ্ছে। কিন্তু কবরী আপাকে ঠিক মতো জানানো হয়নি। তাই তিনি প্রচণ্ড অভিমান আর অপমানে আমার অফিসে হাজির। আমি কাজ করছি। তাঁর মন খারাপ। বিষণ্ণ হয়ে বসে আছেন। তিনি পেছনের বিশাল ছাদে বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। আমি চা নিয়ে যোগ দিলাম।

তখন বললেন মনে জমে থাকা দুঃখের কথা। এক পর্যায়ে আফসোস করে বললেন, বোম্বের বিখ্যাত নায়িকা মিনা কুমারী আর বাংলা চলচিত্রের মিনা পাল অর্থাৎ দুই মিনার দুঃখ-বেদনা সমান্তরাল। মিনা কুমারী কবিতা লিখে নিজের যন্ত্রণার উপশম ঘটাতেন। আমি তো তা-ও পারিনা! আমাকে কি তার ‘চান্দ তানহা’ বা ‘মীনা কুমারী কি শায়েরি’ জুগাড় করে দিতে পারেন?
আমি বললাম, বাংলায় অনুবাদ হয়েছে কিনা জানি না। ওসব তো উর্দূতে।
-আমি উর্দূ জানি। উর্দু ভাষার ‘বাহানা’ ও সো’য়ে নদীয়া জাগে পানি’তে অভিনয় করেছি।
-হাহাহাহা।
-হাসলেন কেন?
-জানা আর পাঠ তো এক নয়। আপনি কি উর্দূ পড়তে পারেন।
-তা-ও তো কথা! আসলে তা মাথায় আসেনি। সাংবাদিকদের সাথে পারা মুশকিল।

এই সব আলাপচারিতার মধ্যে বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তীতুল্য নায়িকা, রূপকথা রাজকুমারী কবরীকে সেদিন খুব নিঃসঙ্গ মনে হলো এবং ভেজা চোখে নিঃসঙ্গতা প্রকাশ করে বললেন, একজন ভালো স্বামী পেলাম না, ভালো বন্ধু পেলাম না, ভালো মানুষ পেলাম না!

আমি তাঁকে কি শান্তনা দেবো, বুঝতে পারছিলাম না। আমি বললাম, ইমিগ্রেশনের জন্য আপনাকে তো হাজার দিন কানাডায় অবস্থা করতেই হবে। এই ফাঁকে আপনার আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা শুরু করেন।

কবরী আপা রাজি হলেন। আমি স্মৃতিচারণের অনুলিখন লিখবো। সেই সূত্রে মিনা পাল থেকে কবরী হয়ে উঠা, সৈয়দ হকের দেয়া নাম- কবরী, কবরী থেকে সাহরা বেগম, ধর্মান্তরিত জীবন, প্রথম ছবি সুতরাং, নিজের পরিচালিত ছবি আয়না, মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতার কথা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দিল্লির ছবি ‘জয় বাংলা’ ছবি নির্মাণ, পরিচালকদের আচরণ, ঢাকার ছবিতে রাজ্জাকসহ অন্যান্য নায়কদের সাথে তিক্ত মধুর সম্পর্ক, শাবানা-ববিতার অজানা গল্প জেনেছি। ইকবাল হাসান চাকরি করতেন ইত্তেফাক গ্রুপের সিনে সাপ্তাহিক পূর্বাণীতে। তিনি হাসতে হাসতে মজা করে বলতেন, ইকবাল তখন আমাকে পছন্দ করতো না। সে ফুল নিয়ে ববিতার বাসায় যেতো।

উত্তম-সুচিত্রার মতোই রাজ্জাক-কবরীর জুটি ছিলো প্রবাদতুল্য। আজ সাংবাদিক শর্বাণী দত্ত’র লেখায় পেলামঃ ‘রাজ্জাকের সঙ্গে কেমিস্ট্রি আর প্রেমের গুজব নিয়ে প্রশ্ন করায় কিছুটা বিরক্তি ই দেখিয়েছিলেন। তারপর স্বভাবজাত ঠোঁটকাটা ভঙ্গিতে বললেন, ‘হ্যাঁ, একসঙ্গে অতগুলো প্রেমের ছবি করলে অটোমেটিক দু’জনের ভেতর একটা ভালো লাগার সম্পর্ক হয়ে যায়। আমাদেরও হয়েছিল। না হওয়ার কোনো কারণ ছিল না। উনি শট দেওয়ার আগেই আমি বুঝতাম উনার অভিব্যক্তি কি হবে, আমি শুধু improvise করে যেতাম। আমাদের অসংখ্য শট ছিল, যেগুলো একবারেই নেওয়া হয়ে যেতো। এত সহজ ছিল উনার সঙ্গে কাজ করা’।

কিন্তু সেদিন কবরী আপা তাঁর জুটি রাজ্জাক সম্পর্কে খুব একটা উচ্ছ্বাস বা আগ্রহ দেখাননি। তবে শ্রদ্ধা-সন্মান দেখিয়েছেন যথেষ্ট।
অনেক অপ্রকাশিত কথা বলতেন আড্ডায়। তাঁর জীবন ছিলো বর্ণিল এবং একই সাথে বেদনায় জড়ানো। একবার একটি স্মরণীয় ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গেছেন। হোটেলের লবির এক দিকে নেতা-কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলছেন। অন্য দিকে ভীষণ ভিড়। প্রবাসী বাঙালিরা এসেছে কবরীর সাথে দেখা করতে, ছবি তুলতে, অটোগ্রাফ নিতে! সেদিন তিনি খুব বিব্রত এবং লজ্জিত হয়েছেন।
ইমিগ্রেশন না নিয়েই ২০০৭ সালেই দেশে ফিরে গেলেন। ২০০৮ সালে বইমেলায় গিয়ে যোগাযোগ করলাম। নিজ হাতে রান্না করে বনানীর লেকের পাড়ে ফ্ল্যাটে নিমন্ত্রণ করলেন। সেদিনও আবার সেই কানাডার দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে করতে বললেনঃ ‘দুলাল, শোনেন। আমি কানাডার পি আর কার্ড সারেন্ডার করে দিচ্ছি। আমি ইলেকশন করবো। নারায়ণগঞ্জ-৪ থেকে। যদিও রাজনীতি অনেক টাফ এন্ড রাফ’!

এবার বুঝলাম, তিনি কেন কানাডার ইমিগ্রেশন ছেড়ে দেন।

প্রথমতঃ সাংসদ-মন্ত্রীদের দ্বৈত নাগরিক বিধি সম্মত নয়। তাই তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
দ্বিতীয়তঃ বাংলাদেশ, দেশের মানুষ, শিল্প-সংস্কৃতির সাথে এতো নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ছিলেন যে, সেই বন্ধন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা তাঁর পক্ষে কঠিন ছিলো।
তৃতীয়তঃ বিবাহ বিচ্ছেদ, সংসারে ভাঙ্গন বিষয়টি তাঁকে অনেক কিছু থেকেই অনাগ্রহ করে তুলেছিলো।
যাই হোক। আরেক বার গুলশানে কানাডাস্থ দুতাবাসে বউ-বাচ্চাদের ভিসা আনতে গেলাম কোনো এক সকালে। হাতে ঘণ্টা খানেক সময়। কল দিলাম কবরী আপাকে। তিনি বললেন, ‘এতো কাছে! বাহ, চলে আসুন- এক সাথে নাস্তা করবো’। অপিকে নিয়ে গেলাম গুলশানের বাসায়। আবারো যথারীতি সেই আপ্যায়ন।

২০১৭ সালে বের হলো কবরীর জীবনীগ্রন্থ- স্মৃতিটুকু থাক। ১৫৬ পৃষ্ঠার বইটির ভূমিকা লিখেছেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। প্রকাশ করছে বিপিএল প্রকাশনী।
তিনি জড়িয়ে গেলেন রাজনীতিতে। নির্বাচিত সাংসদ হলেন। ছেড়ে দিলেন কানাডার অভিবসানের স্বপ্ন। ফলে আর আমার সেই অনুলিখিন লেখা হলো না!
২০২০ সালে বইমেলায় গিয়ে যোগাযোগ করি। কথা প্রসঙ্গে বলেন, ইত্তেফাকে পাঠানো ববিতাকে নিয়ে আপনার নিউজ দেখি। ইমিগ্রেশনটা সারেন্ডার না করলে আমার ছেলেও আজ কানাডিয়ান হতো!

তারপর তিনি জানতে চান আমেরিকায় শাবানার কথা, কানাডায় ববিতার কথা, চম্পার কথা, আরিফুল হকের কথা। ববিতার ছেলে অনিক পাড়াশোনা শেষ করে এখন কানাডার নাগরিক।
আমার খোঁজ-খবর নিতে গিয়ে জানলেন আমি ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ১০০ কবির ১০০ কবিতা’ সম্পাদনা করছি। তিনি বললেন, আমার একটি কবিতা আছে। নেবেন না?

আমি প্রথমে গ্রন্থিত করতে চাইনি। কিন্তু তিনি বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক, আমি বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি করি। আমাকে বাদ দিবেন কেন?
পরে সিদ্ধান্তে নতুন ভাবনা যুক্ত করি যে, যাঁরা কবি না হয়েও বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় কবিতা লিখেছেন; তাঁদের কবিতা নির্বাচিত করি। তাদের মধ্যে ‘অকবি’, গদ্যলেখক কবীর চৌধুরী, ইসমাইল মোহাম্মদ, গাজীউল হক, মাহমুদুল হক, রাহাত খান, হায়াৎ মামুদ, সন্তোষ গুপ্ত এঁদের যুক্ত করি এবং কবরীকেও। কারণ, এটা ঐতিহাসিক ব্যাপার। পরে কবরীর ‘জাতির জনক’ কবিতাটি সংকলনভূক্ত করি। কিন্তু তাঁকে সৌজন্য কপিটা আর দেয়া হয়নি। আর কোন দিন তাঁর লেখক কপি দেয়া হবে না!

লেখক: সাংবাদিক।

 

আরও পড়ুন