ঘুষের ৮০ লাখ টাকা পাশের বাড়ির ছাদে ফেলে দেন পার্থর স্ত্রী

সিলেটের কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজনস) পার্থ গোপাল বণিকের ফ্ল্যাট থেকে ঘুষ-দুর্নীতির ৮০ লাখ টাকা টাকা জব্দ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একইসঙ্গে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রবিবার (২৮ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর গ্রিন রোড সংলগ্ন ভূতের গলির এলাকার বাসা থেকে পার্থ গোপাল বণিককে গ্রেফতার করতে গেলে ওই টাকা ব্যাগে ভরে পাশের বাসার ছাদে ফেলে দেন পার্থর স্ত্রী ডা. রতন মনি সাহা। এ সময় ঘুষের ৮০ লাখ টাকাসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশনের পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফ ও সহকারী পরিচালক মো. সালাহউদ্দিনের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি টিম রবিবার বিকেলে পার্থর রাজধানীর ভূতের গলির বাসায় তল্লাশি চালিয়ে ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার করে। রবিবার দুপুর ২টার দিকে পার্থ গোপাল বণিকের ফ্ল্যাটে অভিযান শুরু করে দুদক।

দুদক পরিচালক মুহাম্মদ ইউসুফ জানান, প্রায় ২ ঘণ্টা পার্থর স্ত্রী মনি সাহা নানা টালবাহানা করেন। প্রথমে মুঠোফোনে বলেন, তিনি বাসায় নেই। মিরপুরে আছেন। সেখান থেকে ফিরতে ২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে। অথচ সে সময় তিনি ফ্ল্যাটেই ছিলেন।

দুদক টিম বিকল্প পন্থায় ফ্ল্যাটে প্রবেশের কথা বললে পার্থর স্ত্রী ডা. রতন মনি সাহা নিজেই দরজা খুলে দেন। তবে ততক্ষণে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে পার্থর আয় করা ৮০ লাখ টাকা ২টি ব্যাগে ভরে পাশের বাসার ছাদে ফেলে দেন তিনি। পরে দুদকের টিমের সদস্যরা তাকে নিয়েই ওই টাকা উদ্ধার করে।

এরপর পার্থর ঘরের আলমিরা, তোশক, ওয়ারড্রোবসহ বিভিন্ন কক্ষে তল্লাশি করে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় ৮০ লাখ টাকা পায়। এই টাকা খুঁজে বের করতে কর্মকর্তাদের প্রায় ১ ঘণ্টা সময় লেগেছে। টাকা উদ্ধারের পর তা গুনতে লেগেছে আরও ১ ঘণ্টা। বালিশের কভারের ভেতরও কিছু টাকা রেখেছিলেন তিনি।

এর আগে রবিবার সকালে চট্টগ্রাম কারাগারের দুর্নীতি, ঘুষ ও অবৈধ সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে পার্থ দুদক টিমের কাছে বক্তব্য দিতে সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে হাজির হন।

অবৈধ সম্পদ, ঘুষের টাকা, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নেয়া অর্থ সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে গত বছর অক্টোবরে ঘুষের ৪৭ লাখ টাকাসহ হাতেনাতে গ্রেফতার চট্টগ্রামের জেলার সোহেল রানার দেয়া কিছু তথ্য সম্পর্কে তার কাছে জানতে চায় দুদক টিম।

সোহেল রানা গ্রেফতারের পর বলেছিলেন, তিনি পার্থ গোপাল বণিককেও ঘুষের বেশ কয়েক লাখ টাকা দিয়েছেন। সেই সূত্র ধরে পার্থর কাছে দুদকের কর্মকর্তারা জানতে চান, আপনি ঘুষের এত টাকা কী করেছেন?

দুদক কর্মকর্তারা সোহেল রানার দেয়া তথ্য ছাড়াও আরও কিছু প্রমাণ সামনে তুলে ধরে তার কাছে জবাব চান। এ সময় পার্থ নিজেকে আড়াল করে বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা করেন। জেরার একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, রাজধানীর গ্রিন রোড সংলগ্ন তার নিজের ফ্ল্যাটে ৫০ লাখ টাকা রেখেছেন।

বাসায় এত টাকা কেন রেখেছেন- এমন প্রশ্নে তিনি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলেন, এফডিআর করার জন্য রেখেছি। দুদক কর্মকর্তারা জানতে চান- এ টাকার উৎস কী? এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেন নি পার্থ। তার দেয়া তথ্যানুযায়ী দুদকের ওই অনুসন্ধান টিম তাকে নিয়ে রাজধানীর ২৭/২৮/১, নর্থ গ্রিন রোড (ভূতের গলি) তার ফ্ল্যাটে যায়।

দুদকের অভিযান টিমের প্রধান পরিচালক মোহাম্মদ ইউসুফ গণমাধ্যমকে বলেন, পার্থ গোপাল বণিককে যখন আমরা দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলাম তখন তিনি একেক সময় একেক রকম তথ্য দিয়ে আমাদের বিভ্রান্ত করেন।

ছবি: সংগৃহীত

আমাদের কাছে গোপন সূত্রে খবর ছিল, ডিআইজি পার্থ বণিক প্রতিদিনই বিভিন্ন মাধ্যম থেকে কয়েক লাখ টাকা করে ঘুষ পান। তাকে তথ্য-প্রমাণসহ এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রথমে বলেন, আমার বাসায় নগদ ২০ লাখ টাকা আছে। পরে বলেন, ৩০ লাখ টাকা আছে। আমরা তার কথা বিশ্বাস করিনি।

তাকে বলেছি, সত্যি করে বলেন, পরে তিনি বলেন, ৫০ লাখ টাকা আছে। কিন্তু আমরা সরাসরি তার ফ্ল্যাটে এসে ৮০ লাখ টাকা পেলাম। এই টাকা লুকানোর জন্য পার্থ বণিক ও তার স্ত্রী অনেক ছল-চাতুরীর আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বাসায় এত বিপুল পরিমাণ অর্থ রাখার ঘটনা নজিরবিহীন।

তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার সহযোগী কর্মকর্তাদের নামও বের করা হবে। দুদক কর্মকর্তাদের ধারণা, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জন করা এ অর্থ বাসায় রেখেছিলেন ডিআইজি প্রিজন পার্থ।

উল্লেখ্য, ডিআইজি পার্থ গোপাল বণিক ২০০২ সালের ২০ জুন জেল সুপার হিসেবে যোগদান করেন। প্রথমে তার পোস্টিং হয় রংপুর। ২০১৪ সালে ডিআইজি (প্রিজন) হিসেবে পদোন্নতি পান। পরে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর তাকে সিলেট বদলি করা হয়।

আরও পড়ুন