ছাত্রলীগের চাঁদা লেনদেন, অডিও ফাঁস হওয়ায় ছাত্রকে ‘হুমকি’ জাবি প্রক্টরের

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির টাকা সাবেক ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ও জাবি ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনের মোবাইল কথোপকথন ফাঁস হয়েছে। সেই ফোনালাপ নিয়ে শুরু হয়েছে সমা’লোচনা। এর মধ্যেই আবারও একটি অডিও ফাঁস হয়েছে।

নতুন এই অডিওতে অন্তর নামের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে হুমকি দিয়ে কথা বলতে শোনা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ স ম ফিরোজ-উল-হাসানকে। ফাঁস হওয়া কথোপকথনের রেকর্ড আমাদের সময়ের হাতে এসে পৌঁছেছে। পাঠকদের জন্য ফোনালাপটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

অন্তর : স্যার। সালামালাইকুম। প্রক্টর : হ্যালো। ওয়ালাইকুম আসসালাম। অন্তর। তুমি এ রকম একটা অডিও বানাইলা ক্যান?
অন্তর : স্যার। আমি তো কিছু জানি না স্যার। প্রক্টর : তোমারই তো কথোপকথন।
অন্তর : স্যার। কথা তো হয়েছে দুই পক্ষ থেকে। আমার ফোন থেকে কিছু হয়নি স্যার এটা সিউর থাকেন।প্রক্টর : তোমার ফোনেই তো কথা হলো। তুমি তো ধরাইয়া দিলা সাদ্দামকে। আমি তো পুরাটা শুনলাম।
অন্তর : আমার ফোন থেকে কথা হয়েছে কিন্তু স্যার ওই পাশে তো রাব্বানী ভাই ছিল স্যার। এখন রেকর্ডটা কি ওপাশ থেকে হয়েছে, নাকি গোয়েন্দা সংস্থা করেছে সেটা আমি সিউর না স্যার। প্রক্টর : কবে তোমার সাথে এই কথা হয়েছে?

অন্তর : স্যার? প্রক্টর : কোনদিন এই কথা হয়েছে তোমার সঙ্গে?
অন্তর : পরশুদিন রাতে স্যার। যখন রাব্বানী ভাইদের কমিটি ভে’ঙে যাচ্ছিল তখন। প্রক্টর : আচ্ছা। তখন কথা বলছিল তোমার সঙ্গে রাব্বানী?
অন্তর : আমারে হঠাৎ করে ফোন দিছে। ফোন দেওয়ার পরে আমি হচ্ছে সাথেই ছিলাম। পরে আমি বললাম স্যার, ভাই… আমি বললাম আমি তো বেশি কিছু জানি না। আপনি সাদ্দাম ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন। পরে সাদ্দাম ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলল। পরে আমার সঙ্গে তো লাউড দেওয়া আছে, আমার ফোনে তো কিছু করার সুযোগ নাই। ফোন কাটার সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা আমার হাতে চলে আসছে। প্রক্টর : তোমার ফোন থেকেই তো কথোপকথনটা হয়েছে সাদ্দামের সাথে?

অন্তর : আমার ফোন থেকে কথোপকথন কিন্তু ওই পাশে তো রাব্বানী ভাই ছিল। প্রক্টর : আমি তোমাকে বলি, রাব্বানীর যদি এরকম রেকর্ড থাকে। তাহলে রাব্বানী এতদিন ইয়ে (প্রকাশ) করে নাই ক্যান? পরশু দিন তোমার সঙ্গে কথা বলার পর আজকে পাবলিশ করল ক্যানো? পরশু দিনই করত। বা কালকে করত। এখন নিজের অস্তি’ত্বটা নাই বলে বিশ্ববিদ্যালয়টা ন’ষ্ট করতেছে কেন ও?

অন্তর : স্যার আমি তো বেশি কিছু বলি নাই। আপনি তো শুনছেন। আমি শুধু ধরাইয়া দিছি। প্রক্টর : হ্যাঁ। তুমি ধরাইয়া দিছ কিন্তু আল্টিমেটলি ফোনটা তো তোমার।
অন্তর : আমার ফোনে ফোন দিতে পারে না স্যার? সে আমার নেতা না! প্রক্টর : না ফোন দিতেই পারে। ডেফিনেটলি পারে। কিন্তু এই যে গল্পগুলো। এই গল্পগুলো আগে বলনি কেন? যদি এই গল্পগুলো থাকে।
অন্তর : স্যার। এখন এই বিষয়টা তো টক অব দ্য টাউন। এই বিষয়টা তো অস্বীকার করার কিছুই নেই স্যার। প্রক্টর : হ্যাঁ!

অন্তর : এই বিষয়টা তো স্যার টক অব দ্য টাউন। জাহাঙ্গীরনগর তো চলমান ইস্যু স্যার। এখন আমি কি অস্বীকার করব? রাব্বানী ভাই আমাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছে, সে আমার নেতা।
প্রক্টর : তুমি কী অস্বীকার করবা? তোমাকে কী অস্বীকার করতে বললাম! তোমাকে তো আমি কিছুই অস্বীকার করতেই বলিনি। তুমি স্বীকার করবা নাকি স্বীকার করবা না সেটা তো তোমার ইস্যু।
অন্তর : আমি হয়ত বাইরে একরকম বলব কিন্তু আমার ঘরে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে তখন তো আমি মিথ্যা কথা বলব না।
প্রক্টর : আমি তো তোমাকে সত্য-মিথ্যা’ বলতে বলছি না। আমি কি বলছি তুমি সত্য বলছো না মিথ্যা বলছো?

অন্তর : আমার ফোন থেকে কিন্তু হয় নাই। এটা সিউর থাইকেন স্যার। প্রক্টর : কিন্তু এই যে সাদ্দাম যে কথাগুলো বলছে, এই কথাগুলো কতটুকু ট্রু?
অন্তর : স্যার ট্রু বিষয়টা তো জাস্টিফিকেশনের দায়িত্ব আমার না। রাব্বানী ভাই যদি সাদ্দাম ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে, সেটাও হয়তো ফাঁস হতো।
অন্তর : এখন আমার ফোন থেকে কথা বলে সেটা ফাঁস হলে আমার যায় আসে না। জিনিসটা তো সবাই জানে স্যার। আপনিও জানেন স্যার।
প্রক্টর : ফোনটা যেহেতু তোমার, তোমাকে কিন্তু দায়টা নিতে হবে।

অন্তর : বুঝি নাই স্যার। প্রক্টর : তোমার ফোন দিয়ে কথা হয়েছে যখন, তুমি কিন্তু দায়টা এড়াইতে পারো না।অন্তর : স্যার ফোনালাপ কি ফাঁস হয় না স্যার? আপনি কি নির্বাচনের আগে দ্যাখেন নাই স্যার? প্রক্টর : হ্যাঁ হয়। ফোনালাপ ফাঁস হয়। কিন্তু তোমার ফোনে ফোন করছে তুমি কি দায়টা এড়াইতে পারো?
অন্তর : স্যার আমার কোনো দায় নাই স্যার। আমি কাজটা করি নাই স্যার। আমি কিছু করি নাই স্যার।
প্রক্টর : ঠিক আছে তুমি করো নাই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে এত বড় ষড়যন্ত্র। এই ধরো ওর অস্তিত্বে টান পড়েছে, ওর পদ চলে গেছে, তাই বলে এরকম করবে সে।

অন্তর : স্যার বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ষড়যন্ত্র। বিষয়টা ঠিক ওরকম না স্যার। ছাত্রলীগ নিয়েও তো ষড়যন্ত্র চলছে চার-পাঁচ দিন ধরে। এই টা তো স্যার…
প্রক্টর : এইটা তো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে না। ওদের বিরুদ্ধে তো গ্লোবাল ইস্যু আছে।
অন্তর : স্যার আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় না পড়লেও ছাত্রলীগ করতাম স্যার। আমার কাছে স্যার ছাত্রলীগ আগে।
প্রক্টর : সেটা তো আমি তোমাকে বলি নাই। ছাত্রলীগ কর ভালো কথা। কিন্তু এখন তো তুমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কর। তাই না?

অন্তর : জাহাঙ্গীরনগর ছাত্রলীগ তো স্যার আগে প্রতিষ্ঠা হয় নাই। এটা সেন্ট্রাল ছাত্রলীগের আন্ডারে প্রতিষ্ঠিত একটা ইউনিট। প্রক্টর : তুমি কিন্তু উল্টা দিকে কথা বলছ?
অন্তর : না স্যার। আমি লজিক্যাল কথা বলছি। আমার বাইরের লোক জিজ্ঞেস করলে আমি একটা কথা বলব, কিন্তু আমার ঘরের লোক জিজ্ঞেস করলে কি আমি উ’ল্টা-পা’ল্টা কথা বলব? আমি কি বলবো হ্যাঁ ভাই এরকম কিছু ঘ’টে নাই?
প্রক্টর : আমি… আমি তোমারে বলি। তুমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি না পড়তা, তাহলে তুমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ হিসেবে এস্টিবিলিশ হতে না। তুমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ হিসেবে তোমার পরিচয়। হ্যাঁ।

অন্তর : স্যার ক্যাম্পাসে ৪৪, ৪৫ ব্যাচ পর্যন্ত টাকা পেয়েছে স্যার। আমি এটা গোপন রাখার কে স্যার? প্রক্টর : আচ্ছা তোমাদের কে টাকা দিয়েছে, আর কে দেই নাই সে দা’য়িত্ব কি আমার?
অন্তর : স্যার আমাকেও তো টাকা সাধছে স্যার। আমি তো নেই ন্যাই স্যার।
প্রক্টর : তোমাকে কে টাকা সাধছে না সাধছে সেটা তো আমি জানি না। কে দিয়েছে সেটা জানার দা’য়িত্বও আমার না।
অন্তর : স্যার আপনি যদি চান, আমি আপনাকে প্রমাণ দেখাতে পারব স্যার। ৪৪, ৪৫ ব্যাচও টাকা পাইছে স্যার।
প্রক্টর : আরে বাবা। এটা নিয়ে তুমি কেন কথা বলছ? টাকা কে দিয়েছে নাকি সেটা তো আমি জিজ্ঞেস করছি না। ওকি বলতে পারবে, সাদ্দাম বলতে পারবে কে তাকে টাকা দিয়েছে? বলতে পারবে ও?

অন্তর : স্যার সেটা সাদ্দাম ভাইয়ের বিষয়। আমি তো কিছু বলি নাই। আমি তো দায় দায়িত্ব নেই নাই। প্রক্টর : তাহলে? এখন যদি আমাকে থার্ড পার্সন কিংবা ফোর্থ পার্সন টাকাটা দিয়ে দেয় তাহলে তার দায়টা কার ওপর আসবে?
অন্তর : স্যার আপনি ফোন কলটা খেয়াল করছেন কি না জানি না। স্যার আমি কিন্তু বেশি কথা বলি নাই।
প্রক্টর : আমি জানি। ফোনটা তুমি শুরু করাই দিছ এটাই না, সে তোমাকে ফোন করেছে, নাকি তুমি তাকে ফোন করেছে…

অন্তর : স্যার আমাকে ফোন করেছে স্যার। আমাকে ফোন করলে এক রকম কথা থাকতো, আর আমি ফোন করলে আর এক রকম কথা থাকতো। আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করেছে যে কী অবস্থা? কে দিছে এটা? কীভাবে করছে?
প্রক্টর : তখন তুমি বলেছ, আমার পাশে সাদ্দাম ভাই আছে, আপনি সাদ্দাম ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন।
অন্তর : হ্যাঁ। আমারে ফোন করছে স্যার। আমারে আমার সেক্রেটারি ফোন দিলে সে তো তখন রানিং সেক্রেটারি। এখন না হয় সাবেক।
প্রক্টর : তুমি…তুমি। আচ্ছা ওইটা না হয় ঠিক আছে। আমি ও প্রসঙ্গে আসছি না। তুমি বললা ক্যাম্পাসে ৪৪, ৪৫ টা ব্যাচ টাকা পাইছে। টাকা পাইছে কি পাইনি দ্যাটস নট মোর কোয়েশ্চনস। সাদ্দাম কি বলতে পারবে এই টাকা উপাচার্য দিয়েছে?

অন্তর : সেটা সাদ্দাম ভাই জানে স্যার। সাদ্দাম ভাই যেহেতু দা’য়িত্ব নিয়ে বলছেন, ওনি ছিলেন ওই জায়গায় সেটা ওনি… প্রক্টর : সে দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারবে টাকা দিয়েছে উপাচার্য?
অন্তর : স্যার আমি তো ছিলাম না স্যার। আমি দা’য়িত্ব নিয়ে বলতে পারবো না। প্রক্টর : ও বলবে দা’য়িত্ব নিয়ে? ঠিক আছে অন্তর।
অন্তর : স্যার? হ্যালো

অডিও:

আরও পড়ুন