জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকি প্রতিরোধে ভেটেরিনারি সেবা : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ রোধে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর প্রতি বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে, যার জন্য আমাদের সকলের নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার দরকার। শরীরে প্রানীজ প্রোটিনের যোগানের লক্ষ্যে দুধ, মাংস এবং ডিমের সুরক্ষিত সরবরাহের জন্য আমরা যথাক্রমে গবাদিপশু এবং হাঁস-মুরগির উপর নির্ভর করি। ভেটেরিনারিয়ানগন নিরাপদ খাদ্যের উৎস হিসাবে ফুড এনিম্যালের স্বাস্থ্য সংরক্ষন, ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ভেটেরিনারি শিক্ষার প্রকৃতি ও এতে অন্তর্ভূক্ত বিস্তৃত বিষয়-জ্ঞান এর কারণে ভেটেরিনারিয়ানগণ বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণা, জুনোটিক রোগ প্রতিকার, পরিবেশ ও জীব নিরপত্তায় সরাসরি অংশগ্রহণ করে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করে মানব স্বাস্থ্যের উন্নতিতে বিশেষ অবদান রাখছে এবং বিশ্ব জুড়ে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২০ সালে বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবসে বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা গবেষণা থেকে শুরু করে মানব নমুনা পরীক্ষার পাশাপাশি গবেষণার রিসোর্স আদান-প্রদানসহ বিভিন্ন মানবিক সহযোগিতায় ভেটেরিনারি পেশার অবদান বিশ্বের সামনে অতি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরে। এবার ২০২১ সালে বিশ্ব ভেটেরিনারি দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে “Veterinarian response to the Covid-19 crisis”। ২০২০ সালের ১ এপ্রিল বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা দ্বারা প্রকাশিত গাইডলাইন অনুসরণ করে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহুদেশে ভেটেরিনারিয়ানগণ এই কোভিড-১৯ অতিমারি প্রতিরোধে বিভিন্ন উপায়ে অবদান রাখছে।

অতিমারির শুরুতেই প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর,বাংলাদেশ এর অধীনে বিভিন্ন উপাজেলা ভেটেরিনারি হসপিটাল প্রায় ১৬ হাজার ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (পিপিই) এবং ভেন্টিলেটরের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী দান করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভেটেরিনারিয়ানদের মতো বাংলাদেশেও তারা কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ রোধে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাজে সাহায্য করছে। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স ইউনিভার্সিটি (সিভাসু) এবং বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভেটেরিনারিয়ানগন তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজস্ব ল্যাবে কোভিড রোগীর নমুনা সংগ্রহ ও সনাক্তকরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ময়মনসিংহ এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে কোভিড-১৯ সন্দেহভাজনদের নমুনা পরীক্ষা করতে যথাক্রমে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের মাইক্রোবায়োলজি এবং হাইজিন বিভাগ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এবং সিভাসু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের কাছে রিয়েল-টাইম পিসিআর মেশিন সরবরাহ করে। শুধু তাই নয়, ভেটেরিনারি অধ্যাপকসহ বিজ্ঞানীরা হাসপাতাল ও পরীক্ষাগারগুলিতে কভিড-১৯ পরীক্ষা করতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছে। জনস্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষার্থে, ভেটেরিনারি বিজ্ঞানীরা মানবদেহে এই রোগের প্রভাব জানতে এবং পর্যবেক্ষণ করতে গবেষণায় (জাতীয় পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথভাবে সিভাসুর ভেটেরিনারি বিজ্ঞানীগণ কোভিড জীবাণুর জিন সিকোয়েন্স সনাক্তকরণ) সহায়তা করছেন, র্যাপিড একশন কিট ও টিকা উদ্ভাবনে কাজ করছেন। দুইজন ভেটেরিনারিয়ানের নাম এখানে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য- স্বল্পমূল্যে কোভিড টেস্ট কিট আবিস্কারক ভেটেরিনারিয়ান ডঃ বিজন কুমার শীল এবং ফাইজারের কোভিড টিকা আবিস্কারক টিম এর প্রধান ভেটেরিনারিয়ান ডঃ আলবার্ট বোরলা। শুধু জনস্বাস্থ্যেই নয়, জনসাধারণের প্রাণিজ খাদ্যের সম্ভাব্য ঘাটতি এড়াতে ও সরবরাহ নিশ্চিন্ত করতে গবাদি-প্রাণি ও হাঁস-মুরগী খামারিদের জীবন-জীবিকা নির্বাহের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সাবলীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রাণিচিকিৎসকগণ অসুস্থ প্রাণিদের চিকিৎসা সেবাসহ খামারিদের পরামর্শ দিয়ে অপরিহার্য ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছেন। আমি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি সেইসব ভেটেরিনারিয়ানদের যারা নিজ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছে এবং তাদের আরোগ্য কামনা করছি।

 

এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে সার্স, সোয়াইন ফ্লু, মার্স, ইবোলা পর্যন্ত বিগত কয়েক দশকে একের পর এক জুনোটিক রোগের প্রাদুর্ভাব বিশ্বে দেখা গেছে। বাণিজ্যের বিশ্বায়ন,আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ, কৃষিকাজে আধুনিক-কৃত্রিমতার কারণে ইকোসিস্টেমের পরিবর্তন- এই সমস্ত কারণগুলি জুনোটিক প্যাথোজেনগুলির উত্থান এবং দ্রুত প্রসারণে জন্য প্রভাবশালী ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিভিন্ন মহামারীর ঘটনা একটি প্রশ্ন উত্থাপন করছে- যদি কোন ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা বিকশিত হয়, মহামারীটি কি চিরতরে চলে যাবে? উত্তরটি সোজা, তবে পরিশীলিত ও সীমিত। কারণ, প্রকৃতি এই মহামারীর সময় তার সৌন্দর্য উপভোগ করছে, হয়তোবা আবার করোনার মতো নতুন কোন এক জীবানু প্রকৃতির পক্ষে কাজ করবে-কে জানে? মহামারী পরিস্থিতি থেকে শেখা ব্যবহারিক, সমসাময়িক চিন্তাভাবনা এবং আলোচনা আমাদের একটি বিশেষ কার্যের দিকে ইঙ্গিত করছে-সেটি হচ্ছে জুনোটিক রোগের প্রাদুর্ভাবের জন্য ঝুঁকি পর্যালোচনা, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সংরক্ষণ, মহামারী প্রতিরোধের জন্য কৌশল এবং কৌশলগুলি বাস্তবায়নের জন্য মানসিক ও অর্থনৈতিক প্রস্তুতি। এ কাজটি যথাযথভাবে সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশে এখন জাতীয় নীতি-নির্ধারণে ভেটেরিনারি দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো খুব প্রয়োজন।

কাজের প্রকৃতি, বৈচিত্র্যময় ও বিস্তৃত জ্ঞানের কারণেই প্রাণী চিকৎসকগণ প্রাণিজ খাদ্যের উৎস প্রাণীদের ব্রুসিলোসিস, যক্ষ্মা, অ্যানথ্রাক্স, ক্ষুরা রোগ, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, সোয়াইন ফ্লু এবং জলাতঙ্কসহ আরও অনেক জুনোটিক ও অতিমারি রোগের প্রাদুর্ভাব ও রোগজীবাণু নিয়ন্ত্রণে সফলভাবে পরিচালনায় অভিজ্ঞ। প্রাণিচিকিৎসা ও রোগ প্রতিরোধের জন্য ভেটেরিনারিয়ানগণ এপিডেমিওলোজিক্যাল স্টাডিতে অভ্যস্ত। তাই, জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকিপূর্ণ রোগগুলির প্রতিরোধের জন্য এপিডেমিওলজিকাল মডেলিং-এ ভেটেরিনারিয়ানগণ অগ্রণি ভূমিকা পালন করতে পারে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলিতে জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত উদ্বেগ মোকাবেলায় প্রাণিচিকিৎসকরা দুর্দান্ত অবস্থানে আছেন এবং তাদের কর্মকাণ্ড প্রশংসিত। বাংলাদেশে ভেটেরিনারি জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির যথাযথ পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকি নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় নীতি পর্যায়ে ভেটেরিনারি দক্ষতার সাথে সমন্বয় হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
ইকোসিস্টেম বা পরিবেশকেকে আঘাত করে যতক্ষণ মানবতা প্রকৃতিকে একটি বৃহৎ আকারের কৃত্রিম কৃষিতে রূপান্তরিত করে রাখবে, বন্য প্রাণী এবং মানুষের মধ্যে যত যোগাযোগ বাড়বে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে তা অব্যাহত থাকবে, কোভিড ১৯-এর মতো মহামারী বিশ্বব্যাপী অর্থনীতি ও মানবজীবনের জন্য হুমকি হয়ে থাকবে।

গবেষণায় উদ্ভাবিত হয়েছে, SARS-CoV, MERS-CoV কভিড ভাইরাসের মধ্যবর্তী হোস্ট হিসাবে আছে যথাক্রমে বাদুড়, পাম সিভেটস এবং ড্রোমেডারি উট এবং টার্মিনাল হোস্ট হচ্ছে মানুষ। SARS-CoV-2 এর মধ্যবর্তী হোস্ট হিসেবে চীনের উহানে অবস্থিত সিফুডের বাজারে বিক্রি হওয়া অজানা বন্য প্রাণী বলে মনে করা হচ্ছে । প্রাণী মানুষের বিভিন্ন সংক্রামক বা উদীয়মান রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসাবে কাজ করে। এ কারণেই, নিরাপদ জনস্বাস্থ্যের জন্য মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের স্বাস্থ্য একই বন্ধনে আবদ্ধ। তাই  “One Health” কনসেপ্ট অর্থাৎ “এক স্বাস্থ্য” ধারনা বিগত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে জীব বিজ্ঞান, ভেটেরিনারি মেডিসিন এবং বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তবে এটি বাংলাদেশে সাধারণ জনগণের কাছে অনেকটাই অজানা। ১৯৬০ সালে “ওয়ান হেলথ” ধারণায় বিশ্ব প্রাণী স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একমত হওয়ার পর থেকে উন্নত দেশে প্রশাসনে জুনোটিক রোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় “ওয়ান হেলথ” বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে বিবেচিত হয়। কিন্তু নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে এর প্রয়োগে বেশ সীমাবদ্ধতা পরিলক্ষিত হয়। পূর্ববর্তী মহামারী হতে লব্ধ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করা সত্ত্বেও, বাংলাদেশসহ আরও অনেক স্বল্পোন্নত দেশে জনস্বাস্থ্যের সাথে জড়িত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে “ওয়ান হেলথ” প্রসঙ্গে পশুচিকিৎসকদের অবস্থান এখনো শক্তভাবে গুরুত্ব পায়নি। কিন্তু,“ওয়ান হেলথে এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টেন্স প্রতিরোধ ছাড়াও ভেটেরিনারিয়ানদের আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। আরেকটি বিষয় গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করতে চাই। জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগের বিরুদ্ধে লড়াই, খাদ্য সুরক্ষা, দারিদ্র্য হ্রাস এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণসহ  আমরা যে সকল সংজ্ঞায়িত চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হয়েছি তার অনেকগুলি বিশ্বায়নের ফলস্বরূপ হতে পারে। তাই কোন দেশ নিজেরাই এই সমস্যাগুলি সমাধান করতে পারে না। বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক পদ্ধতি এবং নীতিগুলি অবশ্যই ক্রমবর্ধমান বৈজ্ঞানিক এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নে মানিয়ে নিতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আমাদের বৈজ্ঞানিক অঙ্গনে বিজ্ঞান কূটনীতি বা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। সুতরাং ওয়ান হেলথ কনসেপ্ট বাস্তবায়নের সাথে সাথে বহিঃবিশ্বে গড়ে উঠা বিজ্ঞান কূটনীতিতেও বাংলাদেশের ভেটেরিনারি গবেষণা ও গবেষকরা বিশেষ ভাবে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও আমি বিশ্বাস করি।

বাংলাদেশের প্রধানন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়ান হেলথ এর কো-চেয়ারপার্সন হয়েছেন ২০২০ সালে। তার প্রতি আমি বিনীতভাবে অনুরোধ জানাতে চাই, বৃহত্তর জনস্বাস্থ্য স্বার্থে চিকিৎসা, গবেষণা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড আরও প্রসারিত ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে মানুষের চিকিৎসা সেবার মতো বাংলাদেশে ভেটেরিনারি পেশাকে জরুরি সেবায় অন্তর্ভূক্ত করুন। এই সময়ে ভেটেরিনারি পেশা ও সেবাকে মূলায়্যন করা দেশের জন্যও জরুরি।

 

লেখক : ভেটেরিনারিয়ান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক
 

আরও পড়ুন