জীবন কখনো থেমে থাকে না

জীবন কখনো থেমে থাকে না। মানুষ কখনো পরাজিত হয় না। মানুষ পরাজিত হয় না বলেই জীবন থেমে থাকে না। জীবনের বিন্দু ছাড়িয়ে বৃত্তের দিকে তাই মানুষের মহাযাত্রায় কখনো ছেদ পড়ে না।এক টুকরো খড় কুটো আঁকড়ে ধরে হলেও মানুষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়ে যায়।

মানুষকে নিবু নিবু বাতির আলোটা জীবনের পরশমনি দিয়ে জ্বালিয়ে রাখতে লড়াইটা চালাতে হয় আমৃত্যু। কি বিচিত্র সে লড়াই। কি বিস্ময়কর সেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের সময়টুকু। যেখানে জীবন মৃত্যুর টানাটানিটা বন্ধুক যুদ্ধ হয়ে মানুষকে মধ্যরাস্তায় দাঁড় করায়। মৃত্যু এক একটা মরণঘাতী বুলেট ছুড়ে আর জীবন তা রুখে দেবার প্রাণপণ চেষ্টা করে। সে চেষ্টায় মৃত্যুর আঘাত অনেক বেশি হলেও জীবনের জয়টা ঠেকাতে পারেনা মৃত্যু। কারণ মৃত্যু থামতে জানলেও জীবন থামতে জানে না। এক একটা নতুন শিশু ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথে জন্মের সাথে পেরে না উঠে মৃত্যু ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ে।

মানুষ থেকে মানুষের জন্মের যে ধারা সে ধারার সাথে মৃত্যুর সংযোগ থাকে না। মানুষ থেকে মানুষের জন্ম হয়। এ ধারা বহমান নদীর মতো। কিন্তু মানুষের মৃত্যু থেকে মানুষের মৃত্যুর জন্ম হয় না। মৃত্যু খুব একান্ত। খুব অনিশ্চিত। মৃত্যু হয়তো একটা বেদনার আকুতি দিয়ে মানুষের হৃদয়কে ছাপিয়ে যায়। একটা দুঃসহ স্মৃতির আবেগকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিছুটা সময় কিংবা অনেকটা সময়। তারপর সময়ের গর্ভে হারিয়ে যায়। তবে এ সময়টাতে সব প্রথাগত নিয়ম যেন পাল্টে গেছে। কি অদ্ভুত এক সময় পৃথিবীতে নেমে এসেছে। সারা পৃথিবীতে মৃত্যুর বার্তা যেন নিয়ে এসেছে করোনাভাইরাস।

 

বিজ্ঞানীরা একের পর এক গবেষণা করে চলেছেন। সে গবেষণার ফলাফল কিছুটা হলেও মৃত্যুকে রুখে দিচ্ছে। কিন্তু সেটা যেন থামানোই যাচ্ছে না। তবে কি প্রকৃতির সূত্রের পরিবর্তন ঘটেছে যেখানে মৃত্যু জীবনের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। কেন এমনটা ঘটলো। বিজ্ঞানের এ নিয়ে একটা ভাবনা আছে হয়তো বা। তবে বিজ্ঞানের ভাবনার বাইরেও ভাবনার আরও অনেক দিক থাকে। কারণ বিজ্ঞান তার নিজের প্রয়োজনে তার ভাবনার বাইরে মানুষকে ভাবতে শেখায়।

সে ভাবনাটা হৃদয়ের কতটা গভীর থেকে ভাবতে হয় সেটা মানুষ হয়তো এখন ভুলে গেছে। সে ভুলে যাওয়া মানুষগুলোকে একটা জাদুর আয়না দিতে চাই। সে আয়নার ভিতর ঢুকে মানুষ তার ভিতরের মানুষটাকে বের করে আনুক। মৃত্যুর হাতছানিকে বিদায় জানিয়ে জীবনের জয় গানকে ফিরিয়ে আনুক। কারণ সময়টা এখন যেখানে সেটা অসময়, সময়টাকে যেখানে থাকা উচিত সেটাই স্বপ্ন জাগানিয়া সময়।

পৃথিবীতে প্লেগ, কলেরা, যক্ষ্মা, কুষ্ঠ, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গুটিবসন্তসহ কত মহামারী এসেছে। মানুষের জীবনে ঘূর্ণিঝড়ের মতো হানা দিয়েছে। মানুষের জীবন বিপন্ন হয়েছে। সে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত মানুষ এতটুকু  দমে যায়নি। বরং যতটা পেরেছে তার থেকে বেশি লড়েছে। তখন বিজ্ঞান এতটা অগ্রসর হয়নি। কিন্তু মানুষের সৃজনশীল চিন্তা তখনও তো মহামূল্যবান ছিল। সে চিন্তার কাছে হেরেছে সব জরা-ব্যাধি। জিতেছে মানুষ। সে সময়ের মহামারী ইউরোপের ভূমিদাস ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছিল, প্রযুক্তির উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছিল।

অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব বিলীন করেছিল। সেটা না ভালো, না মন্দ, সে প্রাচীন সময় সেটা জানে। সে সময় এখন আরও আধুনিক হয়েছে। তবে পচন ধরেছে মানুষের মনে। দেহে বাসা বেঁধেছে আগাছা। সব কিছু ঝেড়ে ফেলে সে সময়ের মনকে এ সময়ে আনতে চাই।

মানুষের বিজয়ের মিছিলে দেখতে চাই সময়কে, সেই চিরচেনা প্রকৃতিকে যারা মানুষের সাথে হাত ধরাধরি করে করোনাকে পৃথিবী থেকে নির্মূল করার দুঃসাহসিক অভিযানে এক সাথে নামবে। তখন ভি চিহ্নের অভূতপূর্ব মানুষের সম্প্রীতিতে মানুষ আবার মানুষ হয়ে উঠবে। সেই মানুষ, যে মানুষ মানুষের। যে মানুষ পৃথিবীর। যে মানুষ সময় ও প্রকৃতির।

 

আরও পড়ুন