ডেঙ্গু নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের রমরমা ব্যবসা ফাঁদ

রাজধানীসহ সারাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই মহামারি আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিন যেই সংখ্যক রোগী আক্রান্ত হচ্ছে তাতে পূর্বের সকল রেকর্ড ভেঙেছে। ইতোমধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন সরকারি তথ্য মতে ১৪ জন। আর সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রাণ হারিয়েছে ৬৩ জন। প্রতিদিন অনেকটাই স্রোতের মতো হাসপাতালে ছুটে আসছেন শিশুসহ সব বয়সের মানুষ। ডেঙ্গু রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল। দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতার মধ্যেও চিকিৎসা নিয়ে ব্যবসার ফাঁদ পাতার অভিযোগ উঠেছে। কিছু বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনিস্টক সেন্টার এবং ওষুধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে৷ রোগ পরীক্ষার দাম ঠিক করে দেয়ার পরেও তা মানা হচ্ছে না৷

বাংলাদেশের ইতিহাসে গত বছর ২০১৮ সালে রেকর্ডসংখ্যক ১০ হাজার ১৪৮ ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হন। চলতি বছরের এখনও পাঁচ মাস বাকি থাকতেই গতকাল (৩১ জুলাই) পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে রেকর্ডসংখ্যক ১৭ হাজার ১৮৩ রোগী ভর্তি হয়েছেন। শুধু জুলাই মাসে ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রায় ১৫ হাজার (১৪ হাজার ৯৯৬ জন) ডেঙ্গু রোগী সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু হাসতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিলো ১ হাজার ৪৭৭ জন। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ৬২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মহামারি আকার ধারণ করার ফলে হাসপাতালে ভিড়ের পাশাপাশি বেড়েছে ওষুধের চাহিদা। এই ব্যাপক চাহিদার সুযোগে ব্যবসা না করে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করার অনুরোধ করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি অনুরোধ করবো এই ডেঙ্গু নিয়ে কেউ কোনো ব্যবসা করবেন না। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোকে এবং ওষুধ কোম্পানিসহ ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করছি।

 

রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে এক ডেঙ্গু রোগীর ২২ ঘন্টার চিকিৎসায় বিল ধরা হয়েছে এক লাখ ৮৬ হাজার ৪৭৪ টাকা৷ তবে বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নেমেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর৷ ওই রোগী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবীর স্বাধীন৷ ২৬ জুলাই রাতে মারা যান তিনি৷

ডেঙ্গু পরীক্ষা ফি পাঁচশ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও মানছে না ঢাকার বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ল্যাবএইড স্পেসালাইজড হাসপাতাল, পপুলার ডায়গনিস্টিক সেন্টার ও ইবনে সিনা হাসপাতাল৷ দ্বিগুনের বেশি অর্থ আদায়ের কারণে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর৷

জানা গেছে, ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসায় হাসপাতালে সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের বেশি থাকতে হয় না৷ বেসরকারি হাসপাতালে কেবিনে সব মিলিয়ে ২০-২৫ হাজার টাকার বেশি চিকিৎসা খরচ হওয়া উচিত না৷ সরকারি হাসপতালে সাধারণ বেডে চিকিৎসা ফ্রি৷ আর কেবিনে পাঁচ দিনে সর্বোচ্চ সাত-আট হাজার টাকা লাগে৷ ডেঙ্গু চিকিৎসায় তেমন কোনো ওষুধ লাগে না৷ এখন প্রাইভেট হাসপাতালগুলো এই সুযোগে অতিরিক্ত মুনাফা করতে চাইছে৷ প্রাইভেট হাসপাতালগুলো যারা চিকিৎসা নিচ্ছে তাদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত অনেক টাকা।

এদিকে, পরীক্ষা না করেও রিপোর্ট দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে৷ এই অপরাধে উত্তরার একটি হাসপাতালকে ১৭ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। টেস্টের দাম বেশি নেয়ায় গতকাল বুধবারও পুরান ঢাকার দুটি ক্লিনিককে জরিমানা করা হয়েছে৷

এদিকে গতকাল বুধবার (৩১ জুলাই) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডেঙ্গু পরীক্ষায় বাড়তি ফি নেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে রাজধানীর পল্টন ও ফকিরাপুল এলাকার পাঁচটি হাসপাতাল-ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা করেছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান, পল্টন ও ফকিরাপুল এলাকায় ইসলামী ব্যাংক স্পেশালাইজড হাসপাতাল, আপন মেডিকেল সেন্টার, মেডিকাস ডায়াগনস্টিক সেন্টার, সোহাগ ডায়াগনস্টিক, ইসলামী স্পেশালাইজড অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালানো হয়। এসময় হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য বাড়তি ফি আদায়সহ পরীক্ষা না করে রিপোর্ট দেওয়া, রিপোর্টে ডাক্তারের জাল সই, অপারেশন থিয়েটারে মেয়াদোত্তীর্ণ সার্জিক্যাল সামগ্রী ও ওষুধ পাওয়াসহ নানা অনিয়ম দেখা গেছে। এসব অভিযোগে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে সর্বমোট ১৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও দু’টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে।

অপর দিকে ডেঙ্গু জ্বরের টেস্টের জন্য অতিরিক্ত ফি নেওয়ায় রাজধানীর ল্যাব সায়েন্স, সেন্ট্রাল হাসপাতাল, বাঁধন হাসপাতাল, ধানমন্ডি ক্লিনিক, আল আরাফাত ও গ্রিন লাইফ হাসপাতালকে জরিমানা করা হয়েছে।

এছাড়া মিটফোর্ড তামিম সার্জিক্যাল ফার্মেসি, ইছামতি ফার্মেসি ও রাতুল ফার্মেসিকে পণ্যের মোড়কে মূল্য লেখা না থাকার অপরাধেও জরিমানা করা হয়েছে। বুধবার (৩১ জুলাই) জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ও কারওয়ান বাজারে অধিদপ্তরের কার্যালয়ে শুনানির ভিত্তিতে এসব জরিমানা করা হয়।

এদিকে বেসরকারি হাসপাতালের বেড, কেবিন ভাড়া ও চিকিৎসক ফি’র ব্যাপারে কোনো নীতিমালা নেই৷ ফলে হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের ইচ্ছে আনুযায়ী বিল করলেও কোন মানা নেই। সরকার কর্তৃক যেই নির্ধারিত ফি ধরে দেয়া হয়েছে তাও মানা হচ্ছে না অনেক হাসপাতালে।

আরও পড়ুন